প্রকাশ: ২৮ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতৃত্বে পরিবর্তন আনতে বিদেশ থেকে একটি অগণতান্ত্রিক তৎপরতা চলছে বলে দাবি করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়। বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক বিস্তৃত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে পরিবর্তন করে দুই দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে বিদেশি প্রভাবের মাধ্যমে পুনর্গঠন করার একটি পরিকল্পনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তাঁর মতে, এই প্রক্রিয়া গণতান্ত্রিক নয় এবং জনগণের মতামতকে উপেক্ষা করে চাপিয়ে দেওয়া ব্যবস্থার অংশ।
জয় বলেন, আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপি—উভয় দলই বাংলাদেশের মূলধারার রাজনীতিতে সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই দুটি দলেরই নির্দিষ্ট ভোটব্যাংক রয়েছে, যা অন্য কোনো দলের নেই। তাই এ দলের নেতৃত্ব জনগণই নির্ধারণ করবে। তিনি জানান, বিদেশি শক্তি বা কোনো গোষ্ঠীর পছন্দনির্ভর নেতৃত্ব আরোপ করার যেকোনো উদ্যোগকে আওয়ামী লীগ মানে না। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের রাজনীতিতে বাইরে থেকে পরিচালিত কোনো ‘খেলা’ জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন নয়।
সাক্ষাৎকারে সজীব ওয়াজেদ পরিষ্কার করে বলেন, শেখ হাসিনার পরে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে তাদের পরিবারের কেউ আসবে এমন ধারণা ভুল। তিনি নিজে সরাসরি রাজনীতিতে আসতে চান না, আর তাঁর বোন সায়মা ওয়াজেদ পুতুলেরও রাজনীতিতে আগ্রহ নেই। পরিবারের অন্য সদস্যরাও দীর্ঘদিন বিদেশে থাকায় তাদের রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। তিনি জানান, পরিবারের মধ্যে যাঁরা রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছেন, তা সম্পূর্ণ তাঁদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। উদাহরণ হিসেবে তিনি টিউলিপ সিদ্দিকীর কথা উল্লেখ করেন, যিনি যুক্তরাজ্যে রাজনীতি করছেন, বাংলাদেশে নয়।
সাম্প্রতিক আদালতের রায় নিয়ে জয় বলেন, তাঁর পরিবারকে রাজনৈতিকভাবে টার্গেট করা হচ্ছে। তিনটি মামলায় শেখ হাসিনাকে ২১ বছর এবং তাঁকে ও তাঁর বোনকে পাঁচ বছর করে দণ্ড দেওয়াকে তিনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন। তাঁর ভাষায়, এসব মামলার উদ্দেশ্য হলো তাঁদের নির্বাচনে অযোগ্য করে দেওয়া এবং নেতৃত্বের সম্ভাবনা নষ্ট করা।
আগস্ট-পরবর্তী সময় থেকে দেশের রাজনীতিতে যে ‘রিফাইন্ড’ বা ‘পরিশুদ্ধ’ আওয়ামী লীগের কথা উঠে আসছে, সেটি নিয়েও নিজের অবস্থান জানান জয়। তিনি বলেন, ওয়ান-ইলেভেনের সময়ের মতোই এখনো বাইরে থেকে একটি নতুন আওয়ামী লীগ তৈরির চিন্তা করা হচ্ছে। তিনি এটিকে ষড়যন্ত্র বলে মনে করেন। তাঁর মতে, বিদেশি কিছু দেশ ও দেশের অভ্যন্তরের কিছু গোষ্ঠী মিলেই নেতৃত্ব পুনর্বিন্যাসের এ ধরনের তৎপরতায় যুক্ত হয়েছে। কিন্তু এসব প্রক্রিয়া গণতান্ত্রিক নয় এবং জনগণের সিদ্ধান্তকে অগ্রাহ্য করে এমন উদ্যোগ সফল হওয়া উচিত নয়।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ কখনো নেতৃত্ব চাপিয়ে দেয় না। দলের কাউন্সিলের মাধ্যমে ব্যালটে সভাপতি নির্বাচিত হয় এবং ভবিষ্যতেও সেভাবেই নেতৃত্ব নির্ধারণ করা উচিত। শেখ হাসিনা তাঁকে একাধিকবার বিবেচনা করতে বলেছেন, তবে তিনি মনে করেন নেতৃত্ব নির্ধারণ হবে দলের কাউন্সিল ও ভোটের মাধ্যমে। তাঁর মতে, আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো নেতৃত্বের প্রশ্নে কোনো আগাম ঘোষণা না দেওয়া এবং কাউন্সিলের মাধ্যমে সবার সমর্থনে নেতৃত্ব নির্বাচন করা।
জুলাই আন্দোলনের সময় সহিংসতা নিয়ে করা প্রশ্নে জয় বলেন, ভুল হয়েছিল এবং তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, শেখ হাসিনা তখনই একটি বিচার বিভাগীয় কমিশন করেছিলেন যাতে সব হত্যাকাণ্ডের তদন্ত হয়। তাঁর দাবি, আন্দোলনের সময় পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী নিহত হওয়ার ঘটনাও তদন্তের আওতায় থাকা উচিত। কিন্তু ৫ আগস্টের পর যেসব সহিংসতা হয়েছে, সেগুলো বর্তমান সরকারের দেওয়া ইনডেমনিটির কারণে বিচারের বাইরে চলে গেছে। তাঁর মতে, এক পক্ষকে দায়ী করে অন্য পক্ষকে দায়মুক্ত করা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ যে বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকটে পড়েছে, সেটিও তিনি স্বীকার করেন। তাঁর দাবি, এ সংকট পরিকল্পিত। অধিকাংশ নেতা কারাগারে, অনেকে বিদেশে আত্মগোপনে, ফলে দলীয় কার্যক্রম স্থবির। তবুও তিনি বলেন, নেতৃত্ব এখনো অটুট এবং শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করেই দল ঐক্যবদ্ধ রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, নেতাকর্মীরা বিচ্ছিন্ন থাকলেও দল ভেতরে ভেতরে ঐক্যবদ্ধ এবং নেতৃত্বের বিষয়ে কেউ বিভক্ত নয়।
জয় বলেন, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের প্রশ্ন এখনো সামনে আনা হয়নি, কারণ দল এখনো শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করেই ঐক্যবদ্ধ। তিনি মনে করেন, সময় এলে দলই সিদ্ধান্ত নেবে, কে সভাপতি হবেন বা কে নেতৃত্বে আসবেন। তাঁর মতে, নেতৃত্ব চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা গণতন্ত্রের পরিপন্থী এবং স্বাধীন রাজনৈতিক প্রক্রিয়া বজায় রাখতে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।