প্রকাশ: ০১ ডিসেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
স্প্যানিশ লা লিগায় যতই সময় গড়াচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে—এ মৌসুমটি অন্য সব মৌসুমের চেয়ে আলাদা হতে চলেছে। ম্যাচের পর ম্যাচ বদলে যাচ্ছে পয়েন্ট টেবিলের চিত্র, আর শীর্ষে উঠতে–নামতে হচ্ছে বার্সেলোনা ও রিয়াল মাদ্রিদকে। সেই উত্তেজনাপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতারই সাম্প্রতিকতম অধ্যায় রোববার রিয়ালের জিরোনার মাঠে পয়েন্ট হারানো। ছোট দল হলেও মরিয়া লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত রিয়ালের মতো জায়ান্টকে থামিয়ে দিয়েছে জিরোনা, যা লা লিগার শিরোপা যুদ্ধে নতুন মাত্রা এনে দিয়েছে।
জিরোনার মাঠে রিয়াল মাদ্রিদ শেষ পর্যন্ত ১-১ গোলে ড্র করে মাঠ ছাড়ে। ম্যাচের আগে অনেকেই ভেবেছিল রিয়াল খুব বেশি সমস্যায় পড়বে না, কারণ পয়েন্ট টেবিলে তারা অনেক এগিয়ে এবং শক্তির বিচারে দুই দলের লড়াই তুলনামূলক অসম। কিন্তু ফুটবল কখনোই কাগজে–কলমে শক্তিমত্তা মানে না। এখানেই বড় দলগুলোকে বারবার জটিলতার মুখে পড়তে হয়। রোববারও তেমনটাই হয়েছে। আর সেই ব্যর্থতার সুযোগ নিয়ে বার্সেলোনা শীর্ষে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করেছে।
রিয়াল মাদ্রিদের জন্য ম্যাচটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আগের দিনই বার্সেলোনা নিজেদের ম্যাচ জিতে পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে ওঠে। রিয়ালের সামনে সুযোগ ছিল সহজ জয় তুলে নিয়ে আবারও নাম্বার ওয়ানে ফেরার। কিন্তু তিন ম্যাচ ধরে জয়হীন রিয়ালের আত্মবিশ্বাসে যে চিড় ধরেছে, তা জিরোনার বিপক্ষে আবারও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মাঠে নামার পর থেকেই রিয়ালকে যেন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। খেলোয়াড়দের গতি, তীক্ষ্ণতা, তৈরি করা চাপ—কোনো দিকই ছিল না আগের মতো স্বাভাবিক।
প্রথমার্ধে জিরোনার খেলোয়াড়রা ছিল আরও দৃঢ়সংকল্প, আরও আগ্রাসী, আরও সংগঠিত। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও কিলিয়ান এমবাপ্পের ফুটওয়ার্ক এক–দুইবার ঝলকে উঠলেও জিরোনার গোলরক্ষক পাওলো গাজ্জানিগা ছিলেন একদম নিখুঁত। তার সেভগুলো শুধু রিয়ালের আক্রমণগুলো ভেঙে দিয়েছে তা নয়, বরং তার প্রতিটি প্রতিরোধে জিরোনার খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস আরও বেড়েছে। বিশেষ করে মিলিতাওয়ের যেই দূরপাল্লার শটটা তিনি ফিরিয়ে দিলেন, সেটি ম্যাচের মোমেন্ট হিসেবে বিবেচনা করলেও ভুল হবে না।
দলটি যখন সংগঠিতভাবে খেলছিল, সেই সঙ্গে রিয়াল যখন বারবার সুযোগ হাতছাড়া করছিল—তখনই আসে প্রথমার্ধের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্ত। বিরতির ঠিক আগমুহূর্তে আজেদিন উনাহির নেওয়া গোলটি ছিল নিখুঁত, শক্তিশালী এবং দৃষ্টিনন্দন। বাঁ দিক থেকে বল পেয়ে তিনি এতটাই গতিময় শট নেন যে রিয়ালের গোলরক্ষক থিবো কোর্তোয়া তা ঠেকানোর কোনো সুযোগই পাননি। মুহূর্তেই দর্শকরা স্তব্ধ হয়ে যান, আর জিরোনার খেলোয়াড়রা যেন নতুন শ্বাস পেয়ে যায়। বড় দলের বিপক্ষে লিড নেওয়া মানে শুধু একটা গোল নয়, মনের ভিতরে বিশাল শক্তির জাগরণ।
বিরতির পরপরই রিয়াল কিছুটা পরিণত পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামে। কোচ জাবি আলোনসো আক্রমণ বাড়ানোর নির্দেশ দেন, আর সেটি কার্যকর করার জন্য ভিনিসিয়ুসকে আরও সামনে ঠেলে দেওয়া হয়। এমবাপ্পের সঙ্গে তার সমন্বয়ের দিকে তাকিয়ে ছিলেন সবাই। কোনোভাবে সমতায় ফিরতে পারলেই ম্যাচ ঘুরে দাঁড়াতে পারত রিয়াল। কিন্তু প্রতি আক্রমণেই জিরোনার রক্ষণভাগ ছিল পাহাড়সম। তাদের প্রতিটি ট্যাকল, প্রতিটি বল ক্লিয়ারিং যেন প্রমাণ করছিল তারা লড়াইটা শেষ পর্যন্ত নিয়ে যেতে চায়।
ম্যাচের গতি যখন ধীরে ধীরে রিয়ালের দিকে আসছিল, তখনই আসে ৬৭তম মিনিটের নাটকীয় ঘটনা। বাঁ দিক থেকে ভিনিসিয়ুস দুর্দান্ত ড্রিবলিং করে এগোতেই জিরোনার ডি–বক্সে তাকে ফেলে দেন প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডার। রেফারি দেরি না করে সঙ্গে সঙ্গে পেনাল্টির বাঁশি বাজান। পুরো স্টেডিয়াম নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে। রিয়ালের জন্য মুহূর্তটি ছিল বাঁচা–মরার লড়াই। আর সেই মুহূর্তে এগিয়ে আসেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। তিনি ঠাণ্ডা মাথায় যে শটটি নেন, তা ছিল নিখুঁত এবং সোজা বাম দিকের নিচের কোনায় বল জড়িয়ে যায়। গোলের সঙ্গে সঙ্গে রিয়াল বেঞ্চে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেরে।
কিন্তু সমতায় ফিরলেও রিয়াল ম্যাচে আধিপত্য দেখাতে পারেনি। বরং জিরোনাই কয়েকবার পাল্টা আক্রমণে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করে। তাদের প্রতিটি চেষ্টায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—তারা শুধু ড্র নয়, বরং জয়ের দিকেও তাকিয়ে ছিল। শেষ মুহূর্তে রিয়াল মরিয়া হয়ে গোলের চেষ্টা করলেও জিরোনা তাদের রক্ষণভাগ দিয়ে সেই প্রতিটি চেষ্টা ব্যর্থ করে দেয়। শেষ পর্যন্ত ১-১ গোলে ম্যাচ শেষ হয়।
এই ফলাফল রিয়াল মাদ্রিদের জন্য বড় ধাক্কা। টানা তিন ম্যাচ ড্র করে এখন দলের ভেতরে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—এমবাপ্পে–ভিনিসিয়ুস যুগলবন্দী কি সত্যিই প্রত্যাশামতো কাজ করছে? মৌসুমের শুরুতে যেই অপ্রতিরোধ্য গতিতে তারা এগিয়ে যাচ্ছিল, এখন সেটি আর নেই। এমন হোঁচট তাদের শিরোপা সম্ভাবনাকে জটিল অবস্থায় ফেলে দিচ্ছে।
অন্যদিকে শীর্ষে থেকে বার্সেলোনা এখন আরও আত্মবিশ্বাসী, আরও স্থির, আরও আক্রমণাত্মক মানসিকতায় এগোতে পারবে। রিয়ালের ভুলগুলোকে তারা সুযোগ হিসেবে দেখছে। মাত্র এক পয়েন্টের ব্যবধান হলেও প্রতিটি ম্যাচ এখন শিরোপা লড়াইয়ের জন্য নির্ণায়ক হয়ে উঠেছে। রিয়াল যদি দ্রুত ছন্দে না ফিরতে পারে, তবে বার্সেলোনা আরও ব্যবধান গড়ে ফেলবে—এতে সন্দেহ নেই।
জিরোনার জন্য এই ড্র একটি বিশাল সাফল্য। তারা অবনমন অঞ্চলে থাকলেও বড় দলের বিরুদ্ধে লড়াই করে এক পয়েন্ট তুলে নেওয়া তাদের মানসিক শক্তিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। এমন ফলাফল তাদের পরবর্তী ম্যাচগুলোতেও আত্মবিশ্বাস ছড়াবে।
লা লিগার এই পর্যায়ে এসে বলা যায়, বার্সেলোনা ও রিয়াল মাদ্রিদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন আরও তীব্র হবে। প্রতিটি ম্যাচই হয়ে উঠবে গল্পে ভরা নতুন এক অধ্যায়। আর ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এই লড়াই বয়ে আনবে নতুন নাটকীয়তা, নতুন উত্তেজনা এবং নতুন প্রতীক্ষা। সামনে লিগে অনেক পথ বাকি, কিন্তু রিয়ালের এই হোঁচট মৌসুমে নতুন ভারসাম্য তৈরি করেছে—যা শিরোপা লড়াইকে আরও রোমাঞ্চকর করে তুলবে।










