প্রকাশ: ০১ ডিসেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে মুশফিকুর রহিম ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ—এই দুই নাম শুধু পরিসংখ্যানের অঙ্ক নয়, দুই যুগের আবেগ, প্রেরণা এবং সংকটমুহূর্তে আস্থার প্রতীক। দেশের ক্রিকেটে দুই অভিজ্ঞতম তারকার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বদলে গেল বিপিএল নিলামের আইন—যা শুধু নিয়মের সংশোধন নয়, বরং দুই সিনিয়র ক্রিকেটারের দীর্ঘদিনের অবদানের প্রতি এক ধরনের সম্মাননা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। এমন অভূতপূর্ব ঘটনায় বিস্মিত হয়েছে নিলাম ঘরের সবাই, কিন্তু সিদ্ধান্তটিকে অভিনন্দন জানাচ্ছে দেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা।
ঢাকার একটি পাঁচতারকা হোটেলের বলরুমে সোমবার সকাল থেকে চলছিল বিপিএল ২০২৫-এর নিলাম। তারকার মেলা, দল মালিকদের উত্তেজনা, বিশ্লেষকদের ব্যস্ততা—সব মিলিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে চলছে নিলাম। কিন্তু প্রথম রাউন্ডের ডাকের সময়ই ঘটে অপ্রত্যাশিত ঘটনা। ক্যাটাগরি ‘বি’-তে থাকা মুশফিক ও মাহমুদউল্লাহ দুজনেই অবিক্রিত থেকে যান। ঢাক,ঢোলের মতো শক্তিশালী ক্যাটাগরির দুই ক্রিকেটার অবিক্রিত থাকা বিষয়টি নিলাম ঘরে যেমন বিস্ময় নিয়ে আসে, তেমনি প্রশ্নও জাগায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
বিপিএলের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ক্যাটাগরি থেকে অবিক্রিত হলে পরবর্তী রাউন্ডে তার ক্যাটাগরি অবনমিত হয়। অর্থাৎ ক্যাটাগরি ‘বি’ থেকে তারা নেমে যাওয়ার কথা ছিল ‘সি’-তে, যার ভিত্তিমূল্য ২২ লাখ টাকা। সেই নিয়ম অনুযায়ী দ্বিতীয় রাউন্ডে দুজনকেই কম মূল্যেই নিলামে ওঠার কথা। কিন্তু ঠিক সেই সময় নিলাম ঘরে দাঁড়িয়ে মানবিক এক প্রস্তাব রাখেন রংপুর রাইডার্সের কর্ণধার ইশতিয়াক সাদেক। তাঁর প্রস্তাব শুধু নিয়ম বদলেই নয়, বদলে দিয়েছে পুরো নিলাম ঘরের পরিবেশ।
ইশতিয়াক সাদেক বলেন, “মুশফিকুর রহিম এবং মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের দুই সমুজ্জ্বল অধ্যায়। যারা দেশের জার্সি গায়ে নিয়ে নিজেদের সেরাটা দিয়েছেন বছরের পর বছর। তাঁদের সম্মানের জায়গা থেকে আমি প্রস্তাব করছি—তাদের ক্যাটাগরি অবনমিত না করে ক্যাটাগরি ‘বি’-র মূল ৩৫ লাখ টাকাতেই দ্বিতীয় রাউন্ডে পুনরায় নিলামে তোলা হোক। আশা করি সবাই এই প্রস্তাবে সম্মতি দেবেন।”
মুহূর্তের মধ্যেই পুরো বলরুমে নীরবতা নেমে আসে। তারপর একে একে সব ফ্রাঞ্চাইজির প্রতিনিধিরা জানান সম্মতি। ঢাকায় বসা নিলামে তাই প্রথমবারের মতো নিয়ম পরিবর্তন হয় মানবিক কারণে, সম্মানের কারণে। সেই আবেগঘন মুহূর্তের মধ্যেই নতুন করে ডাক ওঠে দুই সিনিয়রের। আর দ্বিতীয় দফার ডাকে তাঁরা আর ফেরেননি কোনো দ্বিধায়। মুশফিককে কিনেছে রাজশাহী ওয়ারিয়র্স, আর মাহমুদউল্লাহকে দলে টেনেছে রংপুর রাইডার্স—দুই জনকেই ক্যাটাগরির মূল মূল্য ৩৫ লাখ টাকায়।
বাংলাদেশের ক্রিকেটে এমন সম্মানজনক ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যায়নি। কারণ মুশফিক ও মাহমুদউল্লাহ দুজনই দেশের ক্রিকেটের কঠিন সময়, সোনালি সময়—সব কিছুরই স্বাক্ষী। একসময় জাতীয় দলের মধ্যমাঠের স্তম্ভ ছিলেন তাঁরা। বিপিএল ও ঘরোয়া টি-টোয়েন্টিতে দীর্ঘদিন ধরে হয়ে উঠেছেন দলগুলোর আস্থার কেন্দ্র। কিন্তু নতুন প্রজন্মের আগমন, দ্রুতগতির ফরম্যাটে তরুণ খেলোয়াড়দের প্রতি বাড়তি ঝোঁক—এসবের কারণে স্বাভাবিকভাবেই কমেছে তাঁদের চাহিদা। তবুও তাঁদের অবদান এতটাই গভীর যে, নিয়ম শিথিল করে হলেও সম্মান জানাতে কেউ কার্পণ্য করেনি।
মুশফিকুর রহিম ২০২২ সালে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি থেকে অবসর নেন। তিনি ২৮৮ ম্যাচে করেছেন ৬০০৪ রান। বিপিএলে তিনি তামিম ইকবালের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক—১৪০ ম্যাচে ৩৪৪৬ রান, যেখানে গড় ৩৫.৪৬ এবং স্ট্রাইক রেট ১৩১.৫২। বিপিএলের ইতিহাস গড়ে তোলা ব্যাটসম্যানদের কথা বললে মুশফিকের নাম না উঠে আসে, এমন হতে পারে না। উইকেটকিপিং, নেতৃত্ব, ব্যাটিং—সব ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন দায়িত্বশীলতার প্রতীক।
অন্যদিকে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, যিনি ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে ইতি টানেন, খেলেছেন ৩৪৮ ম্যাচে ৬২৭৭ রান। বিপিএলে তিনি চতুর্থ সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক—১৩৩ ম্যাচে ২৭৭৬ রান, গড় ২৪.৫৬ এবং স্ট্রাইক রেট ১১৯.৬৫। তাঁর শান্ত স্বভাব, মাঝের ওভারে ম্যাচ ধরে রাখার দক্ষতা এবং শেষ দিকে ছক্কা হাঁকানোর সামর্থ্য তাঁকে বিপিএলের ইতিহাসে অন্যতম নির্ভরযোগ্য ক্রিকেটার বানিয়েছে।
নিলামের এই বিশেষ সিদ্ধান্ত ক্রিকেটবিশ্বে আলোচনা তৈরি করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভক্তরা লিখছেন, বয়স বাড়লেও অবদান কখনো কমে যায় না; সম্মান হলো দীর্ঘ ক্যারিয়ারের প্রকৃত পুরস্কার। অনেকেই বলছেন, এভাবে অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের মূল্যায়ন করা হলে তরুণদের মধ্যেও জাতীয় দায়িত্ব নিয়ে খেলার প্রতি শ্রদ্ধা বাড়বে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে বয়স ও ফিটনেস গুরুত্বপূর্ণ হলেও অভিজ্ঞতা কখনোই অপ্রয়োজনীয় নয়। বরং দলের ড্রেসিংরুমের পরিবেশ তৈরি, সিদ্ধান্ত নেওয়ার মুহূর্তে ঠান্ডা মাথা, আর চাপ সামলানোর সক্ষমতা—এই জায়গায় সিনিয়রদের উপস্থিতি অবিশ্বাস্য শক্তি এনে দেয়। সেই বিবেচনায়ও মুশফিক-মাহমুদউল্লাহকে একই ভিত্তিমূল্যে দলে নেওয়া যৌক্তিক সিদ্ধান্ত বলেই মনে করছেন অনেকে।
অনেকেই মনে করছেন, অতীতে বিশ্বের অন্যান্য টি-টোয়েন্টি লিগে এমন সম্মানজনক সিদ্ধান্ত বিরল। বিশেষ করে যখন নতুন খেলোয়াড়দের বন্যা, বাজারভিত্তিক দল নির্বাচন এবং বয়স-ফিটনেস বিশ্লেষণের যুগ চলছে, তখন অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন করে নিয়ম পরিবর্তন করা এক বিরল দৃষ্টান্ত। এর ফলে বিপিএল শুধু প্রতিযোগিতামূলক নয়, মানবিক মূল্যবোধেও সমৃদ্ধ এক লিগ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।
নিলাম শেষে মুশফিক ও মাহমুদউল্লাহ দুজনেই সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। যদিও তারা খুব বেশি কথা বলেননি, তবে কাছে থাকা একজন কর্মকর্তা জানান, “ওরা দুজনই আবেগতাড়িত ছিলেন। এত বছর খেলার পর মানুষ তাঁদের শুধু পারফরম্যান্স নয়, সম্মানও দিয়েছে। এটা ওদের কাছে বড় অর্জন।”
বিপিএল ২০২৫ শুরু হবে আগামী মাসে। নতুন মৌসুমে দুই অভিজ্ঞ ক্রিকেটারের মাঠে দেখা পাওয়া ভক্তদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ হবে। আর আজকের নিলামঘর প্রমাণ করল—ক্রিকেট শুধু পরিসংখ্যানের খেলা নয়; সম্মান, সম্পর্ক আর ইতিহাসও এই খেলার বড় সম্পদ।
এই নিলাম শুধু একজন বা দুজন ক্রিকেটারের সীমাবদ্ধ গল্প নয়। এটি বাংলাদেশের ক্রিকেট সংস্কৃতি, শ্রদ্ধাবোধ এবং মানবিকতার গল্প। ভবিষ্যতে এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটলেও এটি থাকবে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে—যেখানে মূল্য ছিল শুধু বাজারমূল্য নয়, বরং সম্মান, অতীত অর্জন এবং অবদানের স্বীকৃতি।
মুশফিক-মাহমুদউল্লাহর প্রতি এই সম্মান দেখিয়ে বাংলাদেশ প্রমাণ করল—নিয়ম মান্য করা জরুরি হলেও, মানুষের অবদানকে মূল্য দেওয়া আরও জরুরি।










