প্রকাশ: ০২ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ প্রতিনিধি দল দীর্ঘ ছয় বছর পর আবার মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ দুটি দেশ—সিরিয়া ও লেবাননে সফর শুরু করতে যাচ্ছে। স্লোভেনিয়ার জাতিসংঘ দূত স্যামুয়েল জ্বোগার নিশ্চিত করেছেন যে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে শুরু হওয়া এই সফরটি হবে তাদের সভাপতিত্ব গ্রহণের পর প্রথম বড় কূটনৈতিক উদ্যোগ। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সিরিয়ার বাশার আল-আসাদ সরকারের পতন এবং নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার পর এটি সিরিয়ায় নিরাপত্তা পরিষদের প্রথম সফর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
জ্বোগার বলেছেন যে বছরখানেক আগে সমাপ্ত হওয়া দীর্ঘ ২৫ বছরের আসাদ শাসনের পতন ছিল সিরিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী দৃশ্যপট। ১৯৬৩ সাল থেকে টানা ক্ষমতায় থাকা বাথ পার্টির শাসনের অবসান এবং পরবর্তীতে রাশিয়ায় পালিয়ে যাওয়া বাশার আল-আসাদ দেশটির রাজনৈতিক চিত্র পাল্টে দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব নতুন করে সংজ্ঞায়িত হয়েছে, বিশেষ করে এমন এক সময়ে যখন সিরিয়ার জনগণ গত ১৪ বছরের সামরিক সংকট, মানবিক বিপর্যয় এবং আন্তর্জাতিক উদাসীনতার দুঃসহ অভিজ্ঞতা নিয়ে বেঁচে আছে।
সিরিয়া সফরকে শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখছেন না স্লোভেনিয়ার এই কূটনীতিক। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, দীর্ঘদিন ধরে সিরিয়ার সাধারণ মানুষ মনে করে এসেছে যে জাতিসংঘ তাদের দুর্দশা ও সংকটে পর্যাপ্ত সহায়তা দিতে সক্ষম হয়নি। সেই আস্থাহীনতা কাটিয়ে ওঠা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। জ্বোগার বিশ্বাস করছেন, এই সফর সেই আস্থা পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং সিরিয়ার নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে নিরাপত্তা পরিষদের ভবিষ্যৎ সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করবে।
তিনি বলেন, সিরিয়ার নতুন অন্তর্বর্তী প্রশাসনের প্রতি আন্তর্জাতিক প্রত্যাশা অনেক। বিশেষত অংশগ্রহণমূলক শাসনব্যবস্থা, সুশাসন, গণতান্ত্রিক সংস্কার, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি পরিষদের আলোচনায় প্রধানভাবে উঠে আসবে। সিরিয়ার ভেতরকার সংকট মোকাবিলা এবং দেশ পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘের কার্যকর ভূমিকা হবে এই সফরের মূল লক্ষ্য।
অঞ্চলে বাড়তে থাকা উত্তেজনার বিষয়েও পরিষদের সদস্যরা উদ্বিগ্ন। দক্ষিণ সিরিয়ায় ইসরাইলি হামলা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে জ্বোগার জানান, সীমান্ত পরিস্থিতি ইতোমধ্যে জটিল রূপ নিয়েছে। তিনি বলেন, সিরিয়া–ইসরাইল, সিরিয়া–লেবানন এবং এর আশপাশের প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সংলাপ জোরদার করা এখন অপরিহার্য। মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি উত্তেজনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রভাব ফেলছে, বিশেষ করে লেবানন সীমান্তে হিজবুল্লাহ–ইসরাইল সংঘাত এবং গাজায় অব্যাহত মানবিক বিপর্যয়ের কারণে পুরো অঞ্চল অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। এই বাস্তবতায় পরিষদের সদস্যরা একযোগে সংলাপ, স্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার গুরুত্ব তুলে ধরতে চান।
২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর আসাদ সরকারের পতনের ঠিক এক বছর পূর্ণ হবে। এই বিশেষ বার্ষিকীর প্রাক্কালে সফরটি হওয়ায় এর তাৎপর্য আরও গভীর। এ সময়ে সিরিয়ায় ক্ষমতাসীন শরাআর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী প্রশাসন নতুন রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে চেষ্টা করছে। দেশটির জনগণ দীর্ঘ যুদ্ধের ক্লান্তি নিয়ে নতুন সম্ভাবনার দিকে তাকিয়ে আছে, যদিও দেশের অর্থনীতি, অবকাঠামো ও মানবিক পরিস্থিতি এখনও ভয়াবহ অবস্থায় রয়েছে। জাতিসংঘের এই সফর তাদের প্রতি একটি আন্তর্জাতিক বার্তা—বিশ্ব এখন নতুন সিরিয়াকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে এবং পাশে দাঁড়াতে প্রস্তুত।
জ্বোগার আরও জানান যে স্লোভেনিয়ার সভাপতিত্বে ডিসেম্বরজুড়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক এবং বিতর্ক অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে “লিডারশিপ অব পিস” শীর্ষক উন্মুক্ত আলোচনাটি বিশেষ গুরুত্ব পাবে, যেখানে আন্তর্জাতিক নেতৃত্বের ভূমিকা, শান্তি স্থাপন এবং বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলার পথ নিয়ে আলোচনা হবে। মানবাধিকার দিবসে আফগানিস্তান ইস্যুতে একটি বিশেষ অধিবেশনও অনুষ্ঠিত হবে, যা বর্তমান বিশ্ব মানবাধিকার পরিস্থিতির আলোচনাকে আরও বিস্তৃত করবে। পাশাপাশি ডিসেম্বর মাসে ফিলিস্তিন ও ইউক্রেন পরিস্থিতি নিরাপত্তা পরিষদের আলোচনায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে—দুটি ইস্যুই বৈশ্বিক বিবেককে নাড়া দিচ্ছে।
লেবানন সফর নিয়েও সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে। দেশটি অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা, শরণার্থী চাপ এবং ইসরাইলি সীমান্ত উত্তেজনার তীব্র চাপে রয়েছে। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী ইউনিফিল সেখানে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে এবং নতুন বাস্তবতায় তাদের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। লেবাননের রাজনৈতিক অচলাবস্থা, অর্থনৈতিক ধস এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার অবনতির বিষয়গুলো পরিষদ সদস্যদের আলোচনায় উঠে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই সফর নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি জোরালো হচ্ছে। তবে বিভিন্ন দেশ মনে করছে, শুধু সফর নয়—সিরিয়ার পুনর্গঠন, শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমনে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ এখন অপরিহার্য। বহু বছর ধরে যুদ্ধবিধ্বস্ত এই দেশটিতে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া এখনো জটিল। তথাপি জাতিসংঘের এই সফর নতুন করে আলোচনার দ্বার খুলতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক দৃশ্যপট এখন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং সেই পরিবর্তন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় প্রভাব ফেলছে। এই প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সিরিয়া–লেবানন সফর নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রযাত্রা। সিরিয়ার নতুন নেতৃত্ব, লেবাননের সংকট, ইসরাইল ও প্রতিবেশী দেশসমূহের উত্তেজনা—সব মিলিয়ে এই সফর মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক রূপরেখার ওপরও একটি বড় প্রভাব ফেলতে পারে। দেশটির জনগণের দীর্ঘদিনের ক্ষত–বিক্ষত জীবন, শরণার্থী সংকট এবং মানবিক বিপর্যয়ের প্রতি বৈশ্বিক মনোযোগ আবারও বাড়ানোর সুযোগও তৈরি হচ্ছে।
বিশ্ব এখন অপেক্ষা করছে, নিরাপত্তা পরিষদের এই উচ্চপর্যায়ের সফর সিরিয়া ও লেবাননের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে কীভাবে প্রভাবিত করে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য কূটনৈতিক মঞ্চে কী নতুন পথ উন্মোচিত হয়।