প্রকাশ: ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
গাজা উপত্যকা—দুই বছরের দীর্ঘ ও বিধ্বংসী যুদ্ধের পর যেখানে চারদিকে কেবল ধ্বংসস্তুপ, সেখানে জীবনের স্বাভাবিক ছন্দে ফেরার আকাঙ্ক্ষা এখনো থেমে নেই। ইসরাইলি অবরোধ, বোমাবর্ষণ, ক্ষুধা, বাস্তুচ্যুতি—সবকিছুর মাঝেও গাজার মানুষ বাঁচতে চায়, ভালোবাসতে চায়, নতুন জীবন শুরু করতে চায়। তাদের সেই অদম্য জীবনীশক্তিরই এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ ঘটল মঙ্গলবার, যখন ধ্বংসস্তূপের শহরে আয়োজন করা হলো এক বিরল গণবিয়ের। আন্তর্জাতিক মাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ডের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই মানবিক আবেগের গল্প।
গণবিয়েতে অংশ নিয়েছেন ৫৪ দম্পতি। তাদের মধ্যে ছিলেন ২৭ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি যুবতী ইমান হাসান লাওয়া ও তার স্বামী হিকমত লাওয়া। ইমান পরেছিলেন ঐতিহ্যবাহী ফিলিস্তিনি প্রিন্টের বর্ণিল পোশাক। হিকমত ছিলেন স্যুট পরিহিত। গাজার দক্ষিণাঞ্চলের এক ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবনের পাশ দিয়ে হাত ধরে হাঁটার সময় তাদের চোখে ছিল একইসঙ্গে বেদনা ও আশার মিশ্র ছাপ। তাদের মতো একই পোশাক পরে আরও অনেক নবদম্পতি দাঁড়িয়ে ছিলেন দীর্ঘ লাইনে, যেন ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও জীবনের প্রতি সামূহিক অঙ্গীকারের প্রতীক।
ইমান বলছিলেন, “যা কিছু ঘটে গেছে, তাকে পেছনে ফেলে আমরা এক নতুন জীবন শুরু করব। আল্লাহর ইচ্ছায়, এটাই হবে যুদ্ধের সমাপ্তি।” তার এই প্রত্যয় শুধু ব্যক্তিগত অনুভূতি নয়; বরং গাজার লাখো মানুষের বুকের ভেতর লুকিয়ে থাকা এক সমষ্টিগত প্রার্থনা।
ইসরাইলি হামলার তীব্রতার কারণে দীর্ঘদিন গাজায় বিয়ে অনুষ্ঠান ছিল প্রায় অসম্ভব। প্রতিদিনের বিমান হামলা, গুলিবর্ষণ ও আর্টিলারি আক্রমণের মধ্যে কোনো ধরনের উৎসব আয়োজন করা ছিল অচিন্তনীয়। ইমান ও হিকমতসহ গাজার প্রায় ২০ লাখ বাসিন্দার বেশিরভাগই নিজের ঘরবাড়ি হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। অনেকে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন অস্থায়ী ক্যাম্প, স্কুল কিংবা ভেঙে পড়া সরকারি ভবনে। এই দম্পতিদের অনেকের পরিবার ছিন্নমূল, অনেকে হারিয়েছেন বাবা-মা, ভাই-বোন, সন্তান বা ঘনিষ্ঠজনকে।
এরপরও মানুষ বেঁচে থাকে, মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসা থাকে, আর সেই ভালোবাসার হাত ধরেই তারা খুঁজে নেয় বেঁচে থাকার নতুন কারণ।
গাজার এই গণবিয়ে তারই প্রমাণ।
অনুষ্ঠানের আয়োজক আল ফারেস আল শাহিম সংগঠন জানায়, যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের মানসিক চাপ লাঘব করতে, তাদের মনে নতুন স্বপ্ন জাগাতে এমন আয়োজন অত্যন্ত জরুরি। সংগঠনটি শুধু অনুষ্ঠান আয়োজনই নয়; বরং দম্পতিদের হাতে তুলে দিয়েছে কিছু অর্থ, বাসার জন্য প্রয়োজনীয় সামান্য সরঞ্জাম এবং নতুন জীবন শুরু করার সাহস। গাজার মতো সংকটাপন্ন অঞ্চলে যেখানে প্রতিদিনই খাবার, পানি, চিকিৎসা কিংবা আশ্রয়ের জন্য মানুষ লড়াই করছে, সেখানে নতুন ঘর বাঁধা অত্যন্ত কঠিন। তাই সংগঠনের এই সহায়তা নবদম্পতিদের জন্য হয়ে উঠেছে বিশেষ আশীর্বাদ।
অবরোধপূর্ণ এই উপত্যকায় যুদ্ধের বেসামাল পরিস্থিতিতে মানুষের মনে কিছুটা হলেও স্বস্তির বাতাস বইয়ে দিয়েছে এই আয়োজন। সময়টা ছিল এমন, যেখানে প্রতিটি মুহূর্তেই মানুষ ভাবছে—পরবর্তী বোমাটি কোথায় পড়বে। সেখানে বিয়ের গানের সুর, নবদম্পতির হাসি, পরিবারের চোখের জল, মানুষের আনন্দ—সব মিলিয়ে কিছুক্ষণের জন্য হলেও যুদ্ধ ভুলে ছিল গাজা। ধ্বংসস্তুপের মাঝেও গাজাবাসী যেন স্মরণ করিয়ে দিল: জীবনের চেয়ে বড় কিছু নেই।
গণবিয়ে নিয়ে স্থানীয় মানুষের প্রতিক্রিয়াও ছিল আবেগময়। অনেকেই বলছিলেন, দীর্ঘদিন পর তারা দেখতে পেলেন কিছুটা রঙিন পোশাক, হাসিমুখ, খুশির ধ্বনি। শিশুরা উচ্ছ্বসিত, মহিলারা আবেগে আপ্লুত—যুদ্ধের চাপে ক্লান্ত জনপদে যেন নতুন আলো ফিরে এলো।
এ আয়োজন শুধু গাজার নয়; পুরো বিশ্বের সামনে একটি বার্তা হাজির করে—যে বার্তা যুদ্ধের ভয়াবহতার চেয়েও শক্তিশালী। আর তা হলো মানবিকতা, ভালোবাসা ও জীবনকে আঁকড়ে ধরে রাখার ইচ্ছা।
গাজার এই অনুষ্ঠান এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যখন মানবাধিকার সংগঠনগুলো সতর্ক করে বলছে, যুদ্ধের কারণে গাজায় মানবিক বিপর্যয় ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। খাদ্য স্বল্পতা, পানীয় জলের সংকট, চিকিৎসা সুবিধার অভাব—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। ঘন ঘন বোমাবর্ষণে বহু এলাকা বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। হাজারো পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ভাঙা ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ও ধ্বংসপ্রাপ্ত সরকারি ভবনে।
এই বাস্তবতার মধ্যেই ৫৪ দম্পতির হাতে হাত রেখে নতুন জীবনে পা বাড়ানো যেন আশা, জীবন এবং মানবিকতার বিজয় ঘোষণা করে। ক্রমাগত মৃত্যু ও ধ্বংসের দৃশ্যে ভারাক্রান্ত গাজার মানুষকে এই মুহূর্তগুলো দিয়েছে সামান্য হলেও শ্বাস নেওয়ার সুযোগ।
যুদ্ধের নির্মমতায় বিবাহের মতো সামাজিক অনুষ্ঠান অনেক সময় বিলাসী বলে মনে হয়। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো—এই ধরনের অনুষ্ঠানই মানুষকে মনে করিয়ে দেয় যে তারা এখনো মানুষ, তারা এখনো স্বপ্ন দেখে, তারা এখনো স্বাভাবিক জীবনের খোঁজে ছুটে চলে।
গাজার এই গণবিয়ে শুধু আনন্দের অনুষ্ঠান নয়; এটি ছিল প্রতিরোধ, এটি ছিল প্রার্থনা, এটি ছিল সভ্যতার প্রতি আস্থা রাখার এক উদাহরণ। ধ্বংসস্তূপের শহরে নবদম্পতিদের হাত ধরে হাঁটা যেন ঘোষণা করে—যুদ্ধ বিয়োগান্তক হতে পারে, কিন্তু তা কখনোই মানুষের স্বপ্নকে হত্যা করতে পারে না।