প্রকাশ: ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বয়স ও স্বাস্থ্যক্ষমতা নিয়ে বিতর্ক তার রাজনৈতিক জীবনের প্রায় পুরো সময়জুড়েই ছিল। তবে সম্প্রতি এ বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে যখন নিজের ‘আগের চেয়ে বেশি চনমনে’ হওয়ার দাবি তোলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্পকে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রিসভা বৈঠকে বারবার তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় দেখা যায়। নিউইয়র্ক টাইমস তার স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে যে সমালোচনামূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল, তা প্রত্যাখ্যান করে তিনি জোর গলায় দাবি করেন যে তিনি এখন “২৫ বছর আগের চেয়ে বেশি সতেজ ও সক্রিয়”। কিন্তু তার ওই বক্তব্যের পরপরই ঘটতে থাকা এই ঘুমঘুম মুহূর্তগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত নিউইয়র্ক টাইমসের একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনের পর, যেখানে দাবি করা হয় যে দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর ট্রাম্প আগের তুলনায় মন্থর এবং শারীরিকভাবে কিছুটা ক্লান্ত ও ধীর হয়ে পড়েছেন। এর জবাবে ট্রাম্প এক প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “ট্রাম্প এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি চটপটে, কিন্তু নিউইয়র্ক টাইমস সেভাবে চটপটে নেই।” শুধু তাই নয়, তার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার জন্য তিনি গণমাধ্যমকে একহাত নেন এবং দাবি করেন যে তার মানসিক সতর্কতা ও কর্মক্ষমতা সর্বোচ্চ অবস্থায় রয়েছে।
কিন্তু এরপর যে ঘটনা ঘটল, তা ট্রাম্পের আত্মবিশ্বাসী বক্তব্যের সঙ্গে যেন কিছুতেই সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া যায় না। সিএনএন এবং অন্যান্য যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গণমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রায় ২ ঘণ্টা ১৭ মিনিট দীর্ঘ উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ট্রাম্প একাধিকবার তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। প্রতিবেদনে বলা হয়, দুপুরের ‘পাওয়ার ন্যাপ’ না পেয়ে যেন প্রেসিডেন্ট নিজেই ক্লান্তির সঙ্গে যুদ্ধ করছিলেন। মন্ত্রিসভার সদস্যদের বক্তব্যের সময়, এমনকি যখন তার নিজের নীতিমালার প্রশংসা করা হচ্ছিল, তখনও তাকে চোখ বুজে বসে থাকতে দেখা যায়। কিছু মুহূর্তে তাকে মাথা দুলিয়ে সামলে নিতে হয়, যা বৈঠকে উপস্থিত কর্মকর্তাদের নজর এড়ায়নি।
এমনকি বৈঠকের অন্যতম আলোচিত মুহূর্ত ছিল যখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও তার তথাকথিত ‘পরিবর্তনধর্মী’ বৈদেশিক নীতির প্রশংসা করছিলেন। রুবিও যখন তার বক্তব্যে ফুটবল নিয়ে হালকা রসিকতা করেন, তখন উপস্থিতরা হাসলেও প্রেসিডেন্টের প্রতিক্রিয়া ছিল নিস্তেজ ও মন্থর। প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্প যেন কথাগুলো শুনছেনই না এমন ভঙ্গিতে পাশের চেয়ারে ঢলে পড়েছিলেন।
বৈঠকে উপস্থিত কয়েকজন কর্মকর্তা সিএনএনকে জানান, প্রেসিডেন্টের মনোযোগ কমে যাওয়ার ঘটনাটি একাধিকবার চোখে পড়ে। বৈঠক পরিচালনার কাঠামো এমন ছিল যেখানে প্রতিটি মন্ত্রণালয় তাদের কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা উপস্থাপন করছিল। শিক্ষা, শ্রম, স্বাস্থ্য, বাণিজ্য, পরিবেশ—প্রতিটি দপ্তরের বক্তব্য চলাকালে ট্রাম্পকে প্রায়ই চোখ কুঁচকে রাখতে, চেয়ারে হেলে পড়তে কিংবা মুখ ঢেকে হাই তুলতে দেখা যায়। এমনকি এক পর্যায়ে তার সহকারী কর্মকর্তাদের তাকে নথি দেখিয়ে বিষয়গুলো মনে করিয়ে দিতে হয়।
যদিও এসব ঘটনার পর গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে, হোয়াইট হাউস অভিযোগগুলোকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর বলে দাবি করেছে। প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিট এক লিখিত বিবৃতিতে বলেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মনোযোগ দিয়ে সকল বক্তব্য শুনেছেন এবং পুরো বৈঠকটি দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করেছেন। তার স্বাস্থ্য নিয়ে যে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।” তিনি আরও বলেন, কিছু সংবাদমাধ্যম ইচ্ছাকৃতভাবে বিকৃত তথ্য প্রচার করছে যাতে প্রেসিডেন্টের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়।
প্রেসিডেন্টের বয়স ও স্বাস্থ্যকে ঘিরে এই বিতর্ক সাধারণ জনগণ, বিশেষ করে ডেমোক্র্যাট সমর্থকদের মধ্যে আরও আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বিরোধী শিবির দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছে যে ট্রাম্প বয়সের কারণে আগের মতো সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা বজায় রাখতে পারছেন না। তবে ট্রাম্পের সমর্থকরা দাবি করেন যে তার বয়স একটি ‘মিথ্যা ইস্যু’, বরং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তাকে দুর্বল দেখাতে ইচ্ছাকৃত প্রচারণা চালাচ্ছে।
তবে সত্য যাই হোক, সাম্প্রতিক ঘটনাটি প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বদানের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব শুধু অভ্যন্তরীণ নীতি নয়, বৈশ্বিক রাজনীতিকেও প্রভাবিত করে। তাই একজন প্রেসিডেন্টের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেও তাৎপর্যপূর্ণ। তার ‘চনমনে’ দাবি এবং পরক্ষণেই প্রকাশ্যে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়া—এই বৈপরীত্য যুক্তরাষ্ট্রের শাসন কাঠামোতে স্থিরতা ও দূরদর্শিতার অভাবের ইঙ্গিত দেয় কিনা, সেই আলোচনাও এখন গুরুত্ব পাচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বয়সজনিত সীমাবদ্ধতা নিয়ে সমালোচনা এড়াতে ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে শক্তিশালী ও কর্মক্ষম প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু বাস্তবে দীর্ঘ সময় ধরে ভারী বৈঠক, সংকট মোকাবিলা বা নীতিনির্ধারণী আলোচনায় মনোযোগ ধরে রাখা যেকোনো রাষ্ট্রনেতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা আরও কঠিন হয়ে ওঠে। ফলে এসব মুহূর্ত গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলে তা সাধারণ মানুষের চোখে স্বাভাবিকভাবেই নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
তবে ট্রাম্প শিবির পরিষ্কার জানিয়ে দিচ্ছে যে প্রেসিডেন্ট ফিট, সুস্থ এবং পরবর্তী চার বছর দেশ পরিচালনার জন্য সম্পূর্ণ সক্ষম। এদিকে গণমাধ্যম বলছে, ট্রাম্পের ঘোষিত চনমনে ভাব এবং বাস্তবে তার আচরণের মধ্যে যে বৈপরীত্য দেখা গেছে, সেটি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আগামী দিনগুলোতে বড় আলোচনার জন্ম দেবে।