ভোরে ঢাকায় ৪.১ মাত্রার মৃদু ভূমিকম্প, আতঙ্কে নগরবাসী

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৭৫ বার
ভোরের নিস্তব্ধতা ভেঙে রাজধানীতে আবারও ভূমিকম্প

প্রকাশ: ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানী ঢাকায় আবারও ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। বৃহস্পতিবার ভোর ৬টা ১৪ মিনিটে ঘুমন্ত নগরবাসী হঠাৎ একটি মৃদু কম্পনে কেঁপে ওঠে। রিখটার স্কেলে কম্পনের মাত্রা ছিল ৪.১। ইউরোপিয়ান মেডিটেরিয়ান সিসমোলজিক্যাল সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পটির কেন্দ্রস্থল ছিল নরসিংদী জেলার উত্তরে এবং টঙ্গী থেকে প্রায় ৩৩ কিলোমিটার পূর্ব-উত্তরপূর্বে। কম্পনের গভীরতা ছিল প্রায় ৩০ কিলোমিটার। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মাত্রার ভূমিকম্পকে সাধারণত মৃদু ধরা হলেও, ঘনবসতিপূর্ণ রাজধানীতে এমন কম্পন মানুষের মানসিক অস্বস্তি বাড়িয়ে দেয়।

ভোরের শান্ত পরিবেশে আকস্মিক কম্পন হওয়ায় অনেকেই বিছানা ছেড়ে উঠে আতঙ্কিত হয়ে চারদিকে তাকান। অনেক এলাকার বাসিন্দারা জানান, কম্পনের স্থায়িত্ব খুব কম হলেও, আসবাবপত্র সামান্য দুলে ওঠায় তারা বিষয়টি স্পষ্টভাবে টের পেয়েছেন। কেউ কেউ বাড়ির বাইরে বের হয়ে আসে, আবার কেউ দ্রুত মোবাইল ফোনে কাছের আত্মীয়দের খোঁজ নিতে থাকেন। তবে স্বস্তির বিষয় হচ্ছে, এই ভূমিকম্পের পর তাৎক্ষণিক কোনো ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

তবে রাজধানীতে সাম্প্রতিক সময়ের ধারাবাহিক ভূমিকম্প মানুষের উদ্বেগ বাড়িয়ে দিচ্ছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে নরসিংদী, গাজীপুর, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় ভূমিকম্প অনুভূত হচ্ছে। বিশেষ করে ২১ নভেম্বরের ৫.৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর থেকে দেশে ছোট-বড় কয়েকটি কম্পন অনুভূত হয়েছে। ওই দিনের ভূমিকম্পে রাজধানীর উঁচু ভবনগুলোতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, অনেকেই বাসা থেকে বের হয়ে আসেন এবং বিভিন্ন অফিসের কর্মীরা কাজ বন্ধ করে নিরাপদ স্থানে অবস্থান নেন। এরপর ২২ ও ২৩ নভেম্বর এবং ২৭ নভেম্বরের কয়েকটি মৃদু আফটারশক মানুষের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দেয়।

দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলেও ভূমিকম্পের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে কয়েক দিন আগে মধ্যরাতে ৪.৯ মাত্রার একটি মৃদু কম্পন অনুভূত হয়, যার উৎপত্তিস্থল ছিল প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারে। এই ধরনের দূরবর্তী উৎসের ভূমিকম্পও বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে প্রায়ই অনুভূত হয়, কারণ অঞ্চলটি ভূমিকম্প-সক্রিয় অঞ্চলের কাছাকাছি অবস্থিত।

সমগ্র ভূমিকম্প পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিকভাবে সক্রিয় তিনটি প্রধান ফল্ট লাইনের আশপাশে অবস্থিত। বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন যে, দুর্বল নির্মাণ কাঠামো ও ঘনবসতিপূর্ণ নগরায়ণের কারণে দেশটি উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকাকে ভূমিকম্পপ্রবণ নগরীর তালিকায় উচ্চ স্থানে রাখা হয়। ফলে অতি মৃদু কম্পন হলেও সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্ক তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।

ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সাম্প্রতিক ধারাবাহিক ভূমিকম্পগুলো একটি স্বাভাবিক ভূ-তাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার অংশ। বড় কম্পনের পর বেশ কিছুদিন ছোট-বড় আফটারশক হওয়াকে স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে তা সত্ত্বেও কর্তৃপক্ষ ও সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। কারণ ছোট কম্পন ভবনের দুর্বলতা পরীক্ষা করার মতো কাজ করে, এবং কোন স্থাপনা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে তা বুঝতে সাহায্য করে। এজন্য ভবনের নিরাপত্তা পরিদর্শন ও ভবন নির্মাণ বিধিমালা কঠোরভাবে অনুসরণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষেত্রে আগাম সতর্কতার কোনো সুযোগ নেই। তবে প্রস্তুতি থাকলে ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব। রাজধানীর ঘনবসতিপূর্ণ ও উঁচু ভবনসমৃদ্ধ এলাকা হওয়ায় এখানে ভূমিকম্পের প্রভাব ভয়াবহ হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করেছেন যে, দুর্বল ভবন, সংকীর্ণ রাস্তা, যথাযথ জরুরি সেবা ব্যবস্থার অভাব—এসবই ঝুঁকি বাড়ায়। গত কয়েক বছরের গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকা মহানগরীর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভবন ভূমিকম্প সহনীয় মানে নির্মিত হয়নি। এ কারণে মাঝারি মাত্রার কোনো কম্পনও বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

এদিকে, যেসব এলাকায় বৃহস্পতিবার ভোরে কম্পন বেশি অনুভূত হয়েছে, সেসব এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন যে, তারা ঘুমন্ত অবস্থায় হঠাৎ এক ধরনের দুলুনি অনুভব করেন। কেউ কেউ ভেবেছিলেন হয়তো বড় কোনো গাড়ি পাশ দিয়ে গেছে, আবার কেউ মনে করেছিলেন বাতাসে জানালা কেঁপেছে। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ লিখতে শুরু করলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায় যে, এটি আসলে ভূমিকম্প ছিল। অনেক জায়গায় স্থানীয়রা নিজেদের বিল্ডিংয়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

ভূমিকম্পের সময় কী করা উচিত, তা নিয়ে সচেতনতা এখনো পর্যাপ্ত নয়। এ অবস্থায় বিশেষজ্ঞরা সবাইকে পরামর্শ দিচ্ছেন—ভূমিকম্প অনুভূত হলে প্রথমে শান্ত থাকতে হবে, আতঙ্কে দৌড়ে বের হওয়ার চেষ্টা না করে নিরাপদ স্থানে অবস্থান করতে হবে। ভবনের ভেতর হলে টেবিল বা মজবুত কোনো আসবাবের নিচে আশ্রয় নেওয়া, মাথা ও ঘাড় রক্ষা করা, লিফট ব্যবহার না করা—এসব বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর বাইরে থাকলে খোলা জায়গায় অবস্থান করা উচিত।

রাজধানীতে ভোরের মৃদু ভূমিকম্প যদিও বড় কোনো ক্ষতির কারণ হয়নি, তবুও এটি চলমান ভূ-অস্তর অস্থিরতার একটি ইঙ্গিত। ফলে কর্তৃপক্ষ ও সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকতে হবে। ভূমিকম্প কখন, কোথায়, কী মাত্রায় ঘটবে তা আগে বলা না গেলেও, সঠিক প্রস্তুতি এবং সচেতনতা বড় ধরনের ক্ষতি কমাতে পারে। ভবন নির্মাণে নিয়ম-কানুন কঠোরভাবে মানা, জরুরি উদ্ধার টিমকে প্রস্তুত রাখা, সাধারণ মানুষকে প্রশিক্ষণ দেওয়া—এসব ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে জীবন ও সম্পদ রক্ষার জন্য অপরিহার্য।

দেশের মানুষ ভূমিকম্পকে ঘিরে আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আজকের কম্পনকে কেন্দ্র করে নানা আলোচনা চলছে। অনেকেই লিখছেন যে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোর ধারাবাহিক ভূমিকম্পে তারা উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে নরসিংদী ও গাজীপুর অঞ্চলের মানুষ মনে করছেন তাদের এলাকায় ভূ-অঞ্চলটি অস্বাভাবিকভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। বৈজ্ঞানিকভাবে তা নিশ্চিত না হলেও স্থানীয়দের উদ্বেগ অমূলক নয়। কারণ ধারাবাহিক ছোট ভূমিকম্প ভূ-অন্তস্তরের চাপ সঞ্চয় বা নির্গমন—যে কোনো দিকেই ইঙ্গিত দিতে পারে।

রাজধানীতে ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ার প্রতিটি ঘটনাই আমাদের মনে করিয়ে দেয়—বাংলাদেশ একটি দুর্যোগ-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। তাই প্রতিটি নাগরিকের, প্রতিটি পরিবারের, প্রতিটি ভবনের, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের উচিত ভূমিকম্প 대비 কার্যক্রমকে গুরুত্ব দেওয়া। সচেতনতার মাধ্যমে একটি বড় বিপর্যয়ের ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত