প্রকাশ: ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশ নারী ফুটবলের সামনে এশিয়ান কাপে অভিষেক—যা দেশের ফুটবল ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়। আগামী মার্চে অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠেয় এশিয়ান নারী ফুটবলের ২১তম আসরে প্রথমবারের মতো চূড়ান্ত পর্বে খেলতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। মিয়ানমারে অনুষ্ঠিত বাছাই পর্বে অপরাজিত থেকে ঋতুপর্ণা, আফঈদাদের এই কীর্তি দেশের ফুটবলকে নতুন আলোয় তুলে ধরেছে। কিন্তু সেই উজ্জ্বল সম্ভাবনার সামনে দাঁড়িয়ে আজ বড় একটি প্রশ্ন—এশিয়ান কাপে ঐতিহাসিক অংশগ্রহণের আগে রক্ষণভাগের দুর্বলতা কি বাধা হয়ে দাঁড়াবে?
বাছাই পর্বের সাফল্যের পর বাফুফে পরিকল্পনা করেছে দীর্ঘমেয়াদি ও অধিক প্রতিযোগিতামূলক প্রস্তুতির। এশিয়া এবং এর বাইরের শক্তিশালী দলগুলোর বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ আয়োজনের লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিক ফুটবলের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে মেয়েদের পরিচয় করানো। এ উদ্দেশ্যেই ফিফা উইন্ডোতে র্যাংকিংয়ে অনেক এগিয়ে থাকা থাইল্যান্ডের বিপক্ষে দুটি ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ। যদিও ফলাফল এসেছে বিপরীত ধারায়—৩-০ ও ৫-১ গোলে পাকিস্ত শক্তিশালী প্রতিপক্ষের কাছে ধারাবাহিক পরাজয়।
এরপর ঘরের মাঠে ইউরোপের দল আজারবাইজান ও মালয়েশিয়ার বিপক্ষে ত্রিদেশীয় সিরিজেও সাফল্য ধরা দেয়নি। মালয়েশিয়ার কাছে ১-০ গোলের হার আর আজারবাইজানের বিপক্ষে তেমন কার্যকর ফুটবল দেখাতে না পারা আবারও সামনে এনেছে একই প্রশ্ন—নারী দলের রক্ষণভাগ কি যথেষ্ট শক্তিশালী?
চার ম্যাচের প্রতিটিতেই হারের পেছনে আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন ইংলিশ কোচ জেমস পিটার বাটলার। তার প্রয়োগ করা ‘হাই লাইন ডিফেন্স’ কৌশলকেই দায়ী করছেন অনেকেই। আধুনিক ফুটবলে এই কৌশলের আবেদন ক্রমশ বাড়ছে, কারণ এটি প্রতিপক্ষকে চাপে রেখে দ্রুত আক্রমণ সাজানোর সুযোগ দেয়। কিন্তু এর ঝুঁকিও সমান—পাল্টা-আক্রমণে পিছনের খালি জায়গা কাজে লাগিয়ে প্রতিপক্ষ যে কোনো সময় গোল তুলে নিতে পারে। থাইল্যান্ডের বিপক্ষে দুই ম্যাচে আট গোল হজম, মালয়েশিয়া ও আজারবাইজানের বিপক্ষে রক্ষণে ছিন্নভিন্ন অবস্থা—সব মিলিয়েই কোচের কৌশল নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।
এত সমালোচনার মধ্যেও নিজ সিদ্ধান্তে অনড় বাটলার দাবি করেছেন, তার খেলোয়াড়রা পুরো শক্তি দিয়ে লড়াই করছে। আজারবাইজানের বিপক্ষে ম্যাচ শেষে সন্তুষ্ট বাটলার বলেছেন, প্রতিপক্ষের বিপক্ষে প্রতিদিন পেশাদার স্তরে খেলা সম্ভব না হলেও তার দল প্রচেষ্টার দিক দিয়ে দশে দশ পাওয়ার যোগ্য।
তবে সাবেক ফুটবলাররা বিষয়টিকে অন্য চোখে দেখছেন। অভিজ্ঞ নারী ফুটবলার অংম্রা চিং মারমা সরাসরি বলেছেন, বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় হাইলাইন ডিফেন্স ঝুঁকিপূর্ণ। তার ভাষায়, আধুনিক ফুটবলে এই কৌশল যুক্তিসঙ্গত হলেও বাংলাদেশের মেয়েরা এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি। আন্তর্জাতিক বড় দলগুলোর বিরুদ্ধে গতি, রক্ষণদক্ষতা ও শারীরিক সক্ষমতার ঘাটতি থাকা অবস্থায় এ ধরনের কৌশল বরং বিপদ ডেকে আনে। তিনি স্পষ্ট বলেছেন, “হাইলাইন ডিফেন্সে সাফের মাত্রার দলগুলোর বিপক্ষে খেলা যায়, কিন্তু বড় দলের বিপক্ষে এ কৌশলে গেলে গোল খেতেই হবে।”
তার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সাম্প্রতিক চার ম্যাচেই বাংলাদেশ গোল হজম করেছে মূলত কাউন্টার অ্যাটাক থেকে। এই দুর্বলতা ঠিক করতে হলে রক্ষণভাগে নতুন পরিকল্পনা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তিনি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। তার মতে, বাংলাদেশ দলকে এশিয়ান কাপে প্রতিযোগিতামূলক হতে হলে রক্ষণে আরও শক্ত ভিত্তি তৈরি করতে হবে। গোলরক্ষক রুপনা চাকমা, সাইডব্যাক মারিয়া মান্দা ও মনিকা চাকমা ভালো খেললেও ডিফেন্স লাইনে উচ্চতা ও শারীরিক সক্ষমতার ঘাটতি স্পষ্ট। আঁখি খাতুন ও মাসুরা পারভীনকে রক্ষণে আরও বেশি ব্যবহার করার পরামর্শ দিচ্ছেন তিনি।
এদিকে সাবেক ফুটবলার ও কোচ রেহেনা পারভীনের মতে, সিনিয়র খেলোয়াড়দের না থাকা দলকে কিছুটা ভুগিয়েছে। সাবিনা খাতুন ও কৃষ্ণা রানীর অভিজ্ঞতা হারানোর ফলে আক্রমণে ধার কমেছে, যা আজারবাইজানের বিপক্ষে বেশ চোখে পড়েছে। রেহেনার মন্তব্য স্পষ্ট—দলের শক্তিমত্তায় ঘাটতি রয়েছে, এবং অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের দলে অন্তর্ভুক্তি প্রয়োজন ছিল।
সাবিনাদের অভাব নিয়েও মন্তব্য করেছেন অংম্রা চিং মারমা। তিনি বলেন, “জুনিয়ররা ভালো খেলেছে, কিন্তু সিনিয়ররা থাকলে দল আরও বেশি আত্মবিশ্বাস পেত। বিশেষ করে আক্রমণে সাবিনা ও কৃষ্ণার অভিজ্ঞতা অনেক বড় ভূমিকা রাখতে পারত।”
বাংলাদেশ নারী দলের সামনে এখন মালয়েশিয়ায় প্রশিক্ষণ ক্যাম্প—এশিয়ান কাপের আগে শেষ প্রস্তুতি। সেখানে কয়েকটি প্রীতি ম্যাচ খেলে নিজেদের ঘাটতিগুলো কাটিয়ে ওঠার সুযোগ থাকবে। তবে রক্ষণভাগের দুর্বলতা কাটানো ছাড়া এশিয়ান কাপে প্রতিযোগিতামূলক হওয়ার অন্য কোনো পথ নেই। বাটলার তার কৌশলে অটল থাকলেও দেশের সাবেক ফুটবলাররা পরিষ্কার করে বলছেন, বাস্তবতা বিবেচনায় কৌশলে পরিবর্তন আনা জরুরি।
এশিয়ান কাপের মতো বড় মঞ্চে বাংলাদেশের এমন ভুলের সুযোগ প্রতিপক্ষরা কখনোই ছাড় দেবে না। স্বপ্নের এশিয়ান কাপে বাংলাদেশের মেয়েরা কতটা উজ্জ্বল হয়ে উঠতে পারবে—তা অনেকটাই নির্ভর করবে রক্ষণভাগ কত দ্রুত নিজেদের ঝাঁকুনি থেকে বের করে আনতে পারে তার ওপর।