সেচ নালার ক্ষয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক, ধান চাষ অনিশ্চয়

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৭০ বার
সেচ নালার ক্ষয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক, ধান চাষ অনিশ্চয়

প্রকাশ: ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদায় সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের পর সেচব্যবস্থায় যে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে এসেছে, তা এখন অঞ্চলের কৃষকদের জীবনে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। ঢাকায় ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হলেও এর প্রভাব সারা দেশের মতো দামুড়হুদা অঞ্চলেও মারাত্মকভাবে পড়ে। ভূমিকম্পের ধাক্কায় দামুড়হুদা-সুবলপুর সড়কের হাউলি মোড় এলাকায় পাকা সেচনালা ভেঙে দেবে যায়, যা এলাকাটির কৃষি কার্যক্রমে স্থবিরতা সৃষ্টি করেছে। মাথাভাঙ্গা নদী থেকে পানি তুলে যে ১ নম্বর সেচ পাম্পের আওতায় প্রায় ২০০ বিঘা জমিতে পানি সরবরাহ করা হতো, সেই সেচনালা অচল হয়ে পড়ায় কয়েক দিনের মধ্যেই মাঠের ফসল পানির অভাবে শুকিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।

কৃষকরা জানিয়েছেন, ভূমিকম্পের পর দিন পার হতে না হতেই ভুট্টা, গম, মাল্টা, ড্রাগন ফলসহ নানা জাতের চাষের জমিতে মাটি ফেটে যাওয়ার চিত্র স্পষ্ট হতে থাকে। পানি না পাওয়ায় ফসলের কচি শাখা শুকিয়ে ঝরে পড়ছে। অনেক কৃষক বহু দিনের পরিশ্রমে গড়া মাঠের সামনে দাঁড়িয়ে হতাশায় মাথা হাত দিয়ে কাঁদছেন। তাঁদের চোখে-মুখে আতঙ্ক—বছরের একমাত্র নির্ভরযোগ্য মৌসুমী আয়ের পথটিও যেন অচল হয়ে পড়ছে সেচ সংকটের কারণে।

সেচ পাম্প পরিচালনা কমিটির সম্পাদক আজিজুর রহমান জানান, ভূমিকম্পে প্রধান পাকা নালা দেবে যাওয়ার ফলে সেখানে পানি প্রবাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, নালাটি পুনর্নির্মাণ বা সংস্কারে বড় অংকের টাকা প্রয়োজন, যা স্থানীয় কৃষকদের পক্ষে বহন করা অসম্ভব। ফলে নালা মেরামত বিলম্বিত হলে মাঠের অধিকাংশ ফসলই ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তাঁর মতে, জরুরি ভিত্তিতে সরকারি উদ্যোগ ছাড়া পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক করা সম্ভব নয়।

এদিকে সামনে রবি মৌসুমের বোরো উফশী এবং বোরো হাইব্রিড ধান চাষের প্রস্তুতিও থমকে গেছে। সাধারণত এই সময়ে কৃষকরা চারা রোপণ শুরু করেন, কিন্তু সেচ না থাকায় সেটিও স্থগিত হয়ে আছে। যে বীজতলা থেকে ধান চারা তুলে জমিতে রোপণ করার কথা, সেগুলোও শুকিয়ে নষ্ট হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন অনেক কৃষক। চারা শুকিয়ে গেলে কৃষকদের নতুন করে বীজতলা তৈরি করতে হবে, যা সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল। এতে পুরো মৌসুম শুরুর আগেই ধান উৎপাদনে বড় ধরনের ঘাটতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

দামুড়হুদার একাধিক কৃষক জানান, তাঁরা সারা বছরের সংসার চালানোর জন্য ভরসা রাখেন বোরো ধানের উপর। ভুট্টা, গম, ড্রাগন ফল ও মাল্টা থেকে কিছু আয় হয় ঠিকই, কিন্তু ধানই তাঁদের পুরোদস্তুর খাদ্য এবং আয়ের প্রধান উৎস। এই ধান মৌসুম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ায় তাঁদের সামনে এক অন্ধকার ভবিষ্যতের চিত্র ফুটে উঠছে। কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, “মাঠে পানি না থাকলে আমরা কিছুই করতে পারব না। ভুট্টা তো শেষ, ধানও রোপণ করতে পারছি না। ঘরে চাল থাকবে তো? বাচ্চাদের খাবার কিভাবে জোগাড় করব?”

একজন প্রবীণ কৃষক আক্ষেপ করে বলেন, তাঁর ৫০ বছরের কৃষিজীবনে এরকম পরিস্থিতি তিনি কখনো দেখেননি। “ভূমিকম্প হলো এক মুহূর্তের জন্য, কিন্তু এর ধাক্কা যে কত দিনের ক্ষতি করবে তা এখন অনুভব করছি,” বলেন তিনি। তাঁর কথায় উঠে আসে মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে কৃষকদের অসহায়ত্ব—যেখানে ফসল পানির অভাবে ঝিমিয়ে পড়ছে, আর তারা তাকিয়ে দেখছেন কেবল ধ্বংসের পূর্বাভাস।

স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে তাঁরা ওপর মহলে রিপোর্ট পাঠিয়েছেন এবং সেচনালা দ্রুত মেরামতের জন্য জরুরি তহবিল বরাদ্দের আবেদন করেছেন। তবে বরাদ্দ পাওয়া পর্যন্ত মাঠের ফসলকে বাঁচিয়ে রাখা অনেকটাই কঠিন হয়ে পড়বে। কৃষি বিভাগের মতে, ক্ষতিগ্রস্ত ২০০ বিঘা জমির ফসলের বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা হতে পারে, যা পুরো অঞ্চলের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা দেবে।

এলাকাবাসীর দাবি, সরকার দ্রুত সেচনালা মেরামত করলে অন্তত ধান মৌসুমটিকে বাঁচানো যেতে পারে। নালা সংস্কারে দেরি হলে কৃষকরা শুধু চলতি মৌসুমই নয়, পরবর্তী মৌসুমেও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বেন। সেই সঙ্গে তাঁরা ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে সেচব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন।

মানবিক সংকটের মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় এলাকাজুড়ে এখন একটাই দাবি—অবিলম্বে নালা মেরামত করে সেচ কার্যক্রম চালু করতে হবে। এলাকাবাসী বলছেন, যদি দ্রুত মেরামত না হয়, তাহলে এই মৌসুমে ধান চাষ শুধু অনিশ্চিতই নয়, পুরো অঞ্চলে খাদ্য সংকটও দেখা দিতে পারে। কৃষকের এক বছরের পরিশ্রম মাঠেই নষ্ট হয়ে যাবে, আর পরিবারগুলোকে পড়তে হবে দারিদ্র্যের নতুন চক্রে। এই বাস্তবতায় দামে বৃদ্ধি, খাদ্যনিরাপত্তা সংকট এবং কৃষি উৎপাদনে সামগ্রিক অস্থিরতা পুরো এলাকাকে প্রভাবিত করবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

দামুড়হুদায় ভূমিকম্পের পর সেচনালার এই ভাঙন শুধু একটি অবকাঠামো ক্ষতির ঘটনা নয়; এটি কৃষিপ্রধান একটি অঞ্চলের পুরো জীবনধারা, অর্থনীতি ও মানবিক বাস্তবতাকে নাড়িয়ে দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, দ্রুত সরকারি সহায়তা ও কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে কৃষকদের এই সংকট থেকে কত দ্রুত উদ্ধার করা যায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত