প্রকাশ: ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে পরিচিত দীর্ঘদিনের কারাবন্দি নেতা মারওয়ান বারঘুতির মুক্তি চেয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ২০০–এরও বেশি শিল্পী, অভিনেতা, সংগীত তারকা, লেখক ও জননন্দিত ব্যক্তিত্ব একযোগে আওয়াজ তুলেছেন। একটি খোলা চিঠিতে তারা বারঘুতির দীর্ঘ কারাবাস, শারীরিক নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলের সামনে তুলে ধরেছেন এবং জাতিসংঘের প্রতি তার অবিলম্বে মুক্তির আহ্বান জানিয়েছেন। বৈশ্বিক তারকাদের এমন ঐক্যবদ্ধ অবস্থান সাম্প্রতিক সময়ে ফিলিস্তিন ইস্যুতে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে।
চিঠিতে নাম রয়েছে চলচ্চিত্র জগতের খ্যাতিমান অভিনেতা বেনেডিক্ট কাম্বারব্যাচ, টিলডা সুইনটন, মার্ক রাফালো, সংগীত জগতের প্রভাবশালী শিল্পী পল সিমন, ব্রায়ান এনো, লেখক ও অভিনেতা স্টিফেন ফ্রাই, সাবেক ইংলিশ ফুটবলার গ্যারি লিনেকার এবং বিশ্ববিখ্যাত উদ্যোক্তা রিচার্ড ব্র্যানসনের মতো নাম। তাদের প্রত্যেকেই বারঘুতির প্রতি অবিচার, তার মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং তার ওপর চলা নির্যাতনের বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলের কাছে জোরালোভাবে উপস্থাপন করেছেন।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে কঠোর কারাগারে বন্দি বারঘুতি শুধু একজন রাজনৈতিক বন্দি নন; তিনি ফিলিস্তিনিদের আত্মপরিচয়, জাতিগত সংগ্রাম এবং মুক্তির স্বপ্নের প্রতীক। বারবার তার আইনগত অধিকার খর্ব করা হয়েছে, সাক্ষাৎ সীমিত করা হয়েছে, পর্যাপ্ত চিকিৎসা সুযোগ দেওয়া হয়নি এবং অনেক সময় তার ওপর নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। আন্তর্জাতিক তারকারা এ সবকিছুর তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, এমন একজন নেতাকে বন্দি রেখে একটি জাতির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে কখনো স্তব্ধ করা যাবে না।
মারওয়ান বারঘুতি ফিলিস্তিনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে একটি ঐক্যবদ্ধতার প্রতীক। তিনি ফাতাহ আন্দোলনের তরুণ নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং ইন্তিফাদার সময় জনগণের আন্দোলনকে সংগঠিত করার জন্য তার জনপ্রিয়তা আরও বৃদ্ধি পায়। ইসরায়েল তাকে ২০০২ সালে গ্রেপ্তার করে এবং পরবর্তীতে পাঁচটি যাবজ্জীবনসহ মোট ৪০ বছরেরও বেশি কারাদণ্ড দেয়। তবে তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, তার ওপর আরোপিত অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
ফিলিস্তিনের সাধারণ মানুষের বহুদিনের দাবি, বারঘুতি মুক্ত হলে ফিলিস্তিনের রাজনৈতিক বিভাজন দূর হবে এবং একটি ঐক্যবদ্ধ নেতৃত্ব গড়ে উঠবে। তার জনপ্রিয়তার কারণে তাকে প্রায়ই ফিলিস্তিনের “নেলসন ম্যান্ডেলা” বলা হয়ে থাকে—একজন নেতা যিনি বন্দি অবস্থাতেই সংগ্রামের প্রতীক হয়ে উঠেছেন এবং যার মুক্তির প্রশ্নটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
খোলা চিঠির স্বাক্ষরকারীরা জানিয়েছেন যে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে সাম্প্রতিক বন্দি বিনিময়ের আলোচনায় বারঘুতির নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে গোপনে এবং কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই তার নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক মহলের মধ্যে প্রশ্ন ও হতাশা সৃষ্টি করেছে। অনেকেই মনে করছেন, বারঘুতিকে মুক্তি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক কৌশলের অংশ, যা ফিলিস্তিনের সম্ভাব্য ঐক্যবদ্ধ নেতৃত্বকে দুর্বল রাখার প্রচেষ্টা প্রতিফলিত করে।
চিঠিতে বলা হয়েছে যে একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে বারঘুতি ফিলিস্তিনের যে শান্তি ও সমাধানের পথ দেখান, তা ইসরায়েল–ফিলিস্তিন সংকটের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ সমাধানেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তার মুক্তির মাধ্যমে একটি নতুন আলোচনার পরিবেশ তৈরি হতে পারে, যেখানে দুটি জাতির শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের সম্ভাবনা আরও সুসংহত হবে। চিঠিতে স্বাক্ষরকারীরা যুক্তি তুলে ধরেছেন যে, কোনো ব্যক্তি বা নেতৃত্বকে নিপীড়িত রেখে কখনোই স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। বরং ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা ও সংঘাতের মূল কারণগুলো সমাধান করেই শান্তির পথ বের করা উচিত।
আন্তর্জাতিক তারকাদের এই চিঠি বিশ্বমঞ্চে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন, একাডেমিক মহল এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন যে, বারঘুতিকে মুক্তি দেওয়া হলে এটি হবে দীর্ঘদিন ধরে দমনে থাকা ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য একটি নৈতিক বিজয়। একই সঙ্গে বিশ্বকে দেখানো যাবে যে মানবাধিকার, ন্যায়বিচার ও জাতিগত স্বায়ত্তশাসনের নীতি আজও সম্মানিত হতে পারে।
এদিকে ইসরায়েল সরকার এ বিষয়ে এখনো কোনো মন্তব্য করেনি। তবে দেশটির নিরাপত্তাবিষয়ক বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন যে, আন্তর্জাতিক মহলের চাপ এবং জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বদের যুক্ত হওয়ায় বিষয়টি তেল আবিবের ওপর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে নতুন চাপ তৈরি করতে পারে। বিভিন্ন দেশের সংসদ সদস্যরাও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু করেছেন, এবং অনেকেই জাতিসংঘে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব তোলার কথা বিবেচনা করছেন।
ফিলিস্তিনে এ খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন আশা ও আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। বারঘুতির স্ত্রী ফাদওয়া বারঘুতি জানিয়েছেন যে, এই আন্তর্জাতিক সমর্থন শুধু তার পরিবারের জন্য নয়, বরং ফিলিস্তিনের প্রতিটি মানুষের সংগ্রামের স্বীকৃতি। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন যে বারঘুতির মুক্তি ফিলিস্তিনের মুক্তি আন্দোলনকে নতুন প্রেরণা দেবে।
মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে বারঘুতির মুক্তি প্রশ্নটি বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক আলোচনায় রয়েছে। কিন্তু এত বড় পরিসরে আন্তর্জাতিক সেলিব্রিটিদের ঐক্যবদ্ধ আহ্বান বিরল ঘটনা। এটি নিঃসন্দেহে ফিলিস্তিন ইস্যুকে আবারও বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে এবং অঞ্চলটির মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
ফিলিস্তিনের দীর্ঘ সংগ্রামের প্রতীক এই নেতা নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন, এবং অনেকের প্রত্যাশা—এই প্রকাশ্য সমর্থন হয়তো তার মুক্তির পথ আরও এগিয়ে দেবে। মানবাধিকার, ন্যায়বিচার ও সমতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা বিশ্বব্যবস্থার দাবি থেকেই এসেছে এই সম্মিলিত আহ্বান।