প্রকাশ: ০৫ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পাকিস্তানের রাজনীতিতে অভ্যুত্থান যেন এক পুনরাবৃত্ত গল্প। কিন্তু এবার যে দৃশ্যপট তৈরি হয়েছে, তা প্রচলিত সামরিক শাসনের বাইরে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা বলেই বিশ্লেষকদের মত। ১৯৯৯ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর দেশটিতে যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে সামরিক শাসন আর দেখা যায়নি, তবুও অদৃশ্য ক্ষমতার রশি সব সময়ই ছিল জেনারেলদের হাতে। এবার দৃশ্যপটটি পাল্টেছে। সেনাবাহিনী আর আড়ালে নেই, প্রকাশ্যেই নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে। পাকিস্তানের সুশীল সমাজ ও রাজনৈতিক মহলে এই নতুন শাসন-ব্যবস্থা এখন পরিচিত— ‘মুনির মডেল’ নামে।
ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির, পাকিস্তানের বর্তমান সেনাপ্রধান। দেশের বেসামরিক সরকারের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ হলেও বাস্তবতায় ক্ষমতার ভারসাম্য অনেক আগেই বদলে গেছে। এ বছরের সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে গাজা যুদ্ধ বন্ধে তাঁর ২০ দফা পরিকল্পনা ঘোষণা করেন, তখন দুইবার থেমে তিনি যে দুই নেতার নাম উল্লেখ করেছিলেন— একজন ছিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ, আরেকজন সেনাপ্রধান আসিম মুনির।
সামান্য সময়ের সেই মুহূর্তই যেন পাকিস্তানের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতীক। বেসামরিক প্রধানমন্ত্রী ও সামরিক শীর্ষপদধারীকে ট্রাম্প একই সমতলে স্থাপন করেছেন। বার্তাটি ছিল স্পষ্ট— পাকিস্তানের প্রকৃত ক্ষমতা এখন সেনাবাহিনীর প্রধানের হাতেই।

পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই দেশটি সামরিক ও অসামরিক শাসনের দোলাচলে থেকেছে। ১৯৭৭, ১৯৯৯— সামরিক হস্তক্ষেপের ধারাবাহিকতা দেশটিতে গণতন্ত্রের ভিত্তিকে দুর্বল করেছে। তবে ২০০৮ সালে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা ফিরে আসে, এবং এক দশকেরও বেশি সময় নির্বাচিত সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করে। কিন্তু সব সময়ই সামরিক প্রভাব ছিল তীব্র। পার্লামেন্ট, আমলাতন্ত্র, আদালত— সব ক্ষেত্রেই সেনাবাহিনীর নির্দেশনা ছিল দৃশ্যমান বা অদৃশ্য।
২০১৮ সালে ইমরান খান ক্ষমতায় আসার সময়ও বলা হয়েছিল, তিনি সেনাবাহিনীর সমর্থনে সুবিধাপ্রাপ্ত রাজনীতিক। কিন্তু ২০২২ সালে অনাস্থা ভোটে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হলে স্পষ্ট হয়ে যায়, সেনাবাহিনী চাইলে যেকোনো রাজনৈতিক বিন্যাস মুহূর্তেই বদলে ফেলতে পারে। এরপর থেকেই ‘হাইব্রিড সিস্টেম’ শব্দটি সামনে আসে। বেসামরিক সরকারের মুখোশের আড়ালে কার্যত রাষ্ট্র পরিচালনা করছে সামরিক নেতৃত্ব। সাম্প্রতিক আইন সংশোধনের মাধ্যমে সেই অবস্থান এখন আরও সাংবিধানিক বৈধতা পেয়েছে। পার্লামেন্টে পাস হওয়া আইন অনুযায়ী আসিম মুনির এখন সব সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান, যার পদমর্যাদা ও ক্ষমতা আগের যেকোনো সেনাপ্রধানের চেয়ে বহুগুণ বেশি। এমনকি ভবিষ্যতে তাঁর মেয়াদ আরও দীর্ঘায়িত করার সুযোগও তৈরি হয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানের অর্থনীতি ভয়াবহ চাপে পড়ে। বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি, মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট— রাজনৈতিক অস্থিরতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। এমন অবস্থায় দেখা যায়, কঠিন আর্থিক সিদ্ধান্তগুলো বেসামরিক সরকার নয়, নিচ্ছেন সেনাবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্ব।
২০২৩ সালে গঠিত হয় স্পেশাল ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কাউন্সিল (এসআইএফসি), যার নেতৃত্ব মূলত সামরিক বাহিনীর হাতে। বিদেশি বিনিয়োগ, কৃষি, খনিজ, জ্বালানি— সব খাতে দ্রুত চুক্তি স্বাক্ষরে এই কাউন্সিল এখন কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছে। প্রধানমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে চেয়ারম্যান হলেও চূড়ান্ত ক্ষমতা ও প্রভাব সেনাপ্রধানের হাতে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত— সব দেশের সঙ্গেই নতুন অর্থনৈতিক আলোচনায় সামরিক নেতৃত্বই প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত থাকছেন।
এ বছরের মাঝামাঝিতে যখন কাশ্মীর সীমান্তে আবারও উত্তেজনা দেখা দেয়, কয়েক দিনের সামরিক সংঘর্ষে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়ে। সেই সময় যুক্তরাষ্ট্র যে সরাসরি জেনারেল আসিম মুনিরের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি শান্ত করে, সেটিই প্রমাণ করে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতির নিয়ন্ত্রণ কোথায় চলে গেছে।
ইমরান খানকে কারাগারে পাঠানোর পর পাকিস্তানের জনগণের একটি বড় অংশ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ২০২৩ সালে তাঁর সমর্থকদের সামরিক স্থাপনায় হামলার ঘটনাও সেনাবাহিনীকে নতুন বাস্তবতায় ঠেলে দেয়। তারা বুঝতে পারে, আড়ালে থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা আর সম্ভব নয়। তাই এবার প্রকাশ্যেই দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছে তারা। বেসামরিক সরকারকে সামনে রেখে সেনাবাহিনী এখন সকল সিদ্ধান্তের পেছনে দৃশ্যমান শক্তি।
২০২৪ সালের নির্বাচনে ইমরান খানের দল প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রতীক পায়নি, প্রার্থীরা স্বতন্ত্র হিসেবে লড়লেও সবচেয়ে বেশি আসন পায় তারা। কিন্তু সেনাবাহিনীর প্রস্তুত করা রাজনৈতিক সমীকরণে তাদের শাসনে ফেরার কোনো সুযোগ ছিল না। শেহবাজ শরিফের জোট সরকার গঠন হয়, আর সেনাবাহিনীর অবস্থান হয় আরও অনড়।
এ অবস্থায় ইমরান খানের ভবিষ্যৎ নিয়েও তৈরি হয়েছে এক ধোঁয়াশা। তাঁকে মুক্তি দিলে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় অস্থিরতা তৈরি হতে পারে— এমন আশঙ্কা রয়েছে। আর দীর্ঘদিন আটক রাখলে সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিও আছে। ফলে খান এখন পাকিস্তানের রাজনীতির এক অমীমাংসিত কেন্দ্রবিন্দু।

দশকের পর দশক ছায়ায় থেকে শাসন করা পাকিস্তানের সামরিক প্রতিষ্ঠানের স্বভাব। তাদের ব্যর্থতার দায় নিত বেসামরিক নেতৃত্ব। কিন্তু ‘মুনির মডেল’-এ সেই সুযোগ আর নেই। এখন জনগণের চোখ সরাসরি সেনাবাহিনীর দিকে। অর্থনীতি সংকটে পড়লে, কর্মসংস্থান না বাড়লে, সন্ত্রাসবাদ ফিরে এলে— দায় চাপবে সরাসরি সামরিক নেতৃত্বের ওপর।
ইসলামাবাদের অভিজ্ঞ কূটনীতিকরা বলছেন, মঞ্চের আলো যত উজ্জ্বল হবে, ঝুঁকিও তত বাড়বে। বেসামরিক আমলাতন্ত্রকে দুর্বল করে শক্তিশালী সামরিক ব্যুহ নির্মাণ হয়তো দ্রুত সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করবে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা ক্ষুণ্ণ করতে পারে।
সব মিলিয়ে পাকিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতি কোনো প্রচলিত সামরিক অভ্যুত্থানের ছবি নয়। এখানে ট্যাংক রাস্তায় নামেনি, সংবিধান স্থগিত হয়নি। বরং গণতন্ত্রের কাঠামোর ভেতরেই সামরিক আধিপত্যকে আইনগত স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। বেসামরিক মুখোশের আড়ালে শক্ত হাতে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে সেনাবাহিনী। রাজনীতিবিদরা হাসিমুখে ক্যামেরায় উপস্থিত হচ্ছেন, অথচ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নেই তাদের।
পাকিস্তানের এই নতুন শাসনব্যবস্থা তাই এক নীরব অভ্যুত্থানের প্রতিকৃতি, যেখানে সেনাবাহিনী ক্ষমতায় এসেছে ভোট ছাড়াই, বিরোধিতা ছাড়াই এবং— সবচেয়ে বড় কথা— প্রকাশ্য দিবালোকে।