একদিনেই পেঁয়াজে ৩০ টাকা লাফ, আমদানি বন্ধে বাজারে অস্থিরতা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৫৬ বার
পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধি

প্রকাশ: ০৫ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের বাজারে আবারও পেঁয়াজের দাম লাফিয়ে বাড়তে শুরু করেছে। মাত্র একদিনের ব্যবধানে কেজিপ্রতি পেঁয়াজের দাম ২০ থেকে ৩০ টাকা বৃদ্ধি পাওয়ায় সাধারণ ক্রেতারা হতভম্ব হয়ে পড়েছেন। রাজধানী ঢাকার পাইকারি ও খুচরা মণ্ডি ঘুরে দেখা গেছে, গত সপ্তাহেও যেখানে ৯৫ থেকে ১১০ টাকায় পেঁয়াজ কেনা যেত, সেখানে গতকাল দাম দাঁড়িয়েছে ১৩০ থেকে ১৫০ টাকায়। এমনকি পাইকারি বাজারেও পাঁচ কেজির পাল্লা এখন ৭০০ টাকায় বেচাকেনা হচ্ছে, যা বাজারে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরবরাহ কমে যাওয়ার কারণে এই অস্বাভাবিক দামবৃদ্ধি। তাদের দাবি, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পেঁয়াজের সরবরাহ কমছে, কৃষকদের পুরোনো পেঁয়াজের ভাণ্ডারও দ্রুত শেষ হয়ে আসছে, ফলে বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। আবার অপর এক পক্ষ বলছে, সরবরাহ সংকট নয়, বরং কৃত্রিম সংকট এবং আমদানি বন্ধের সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু চক্র বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে, যারা ইচ্ছেমতো দাম বাড়িয়ে জনগণের ভোগান্তি বাড়াচ্ছে।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারে গতকাল সরাসরি দেখা যায়, বেশ কয়েকটি হাটে পেঁয়াজের গর্ত প্রায় খালি। যেসব ব্যবসায়ী সাধারণত ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত লরি ভর্তি পেঁয়াজ নামান, তারা অভিযোগ করছেন—আড়তে পেঁয়াজ আসছে অল্প, আর যেটুকু আসছে তার দাম ঘণ্টায় ঘণ্টায় বদলে যাচ্ছে। খুচরা ব্যবসায়ী আবদুল কাদের বলছিলেন, “মঙ্গলবার পর্যন্ত পেঁয়াজের দাম বাড়তে বাড়তে ১২০–১২৫ টাকায় পৌঁছেছিল। কিন্তু বুধবার ও বৃহস্পতিবার দুইদিনে পাইকারি বাজারেই ৩০ টাকার মতো বেড়ে গেছে। আড়তে পেঁয়াজই নেই। যে যেভাবে দাম চাইছে, সে ভাবেই আমরা নিতে বাধ্য হচ্ছি।”

একই বাজারের আরেক ব্যবসায়ী মাহফুজুর রহমান জানান, “দাম বাড়ছে হু হু করে। আড়তদাররা বলছেন সরবরাহ নেই, তাই দাম চড়া। এভাবে চলতে থাকলে এই সপ্তাহেই ১৮০–২০০ টাকায় পৌঁছতে পারে।” শ্যামবাজার, বৌবাজার ও হাতিরপুলের পাইকারি ব্যবসায়ীরাও একই চিত্র তুলে ধরেছেন।

তবে আমদানিকারকদের অভিযোগ আরও তীব্র। হিলি স্থলবন্দর আমদানি-রপ্তানিকারক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক বলেন, “কৃষকের স্বার্থের কথা বলে বাণিজ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয় আমদানির অনুমতি দিচ্ছে না। অথচ কৃষকের হাতে থাকা পেঁয়াজের পরিমাণ খুবই সীমিত। আমদানির অনুমতি না দিয়ে সিন্ডিকেটকে সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। আমদানি খুললে মাত্র একদিনেই দাম ৪০ থেকে ৫০ টাকায় নেমে আসবে।”

তার মতে, এই ‘দাম খেলা’তে জড়িত সরকারি কিছু কর্মকর্তা। তাদের গোপন আঁতাতের কারণে সাধারণ মানুষ ১৪০ থেকে ১৫০ টাকায় পেঁয়াজ কিনতে বাধ্য হচ্ছে। ভোগান্তির শিকার হচ্ছে স্বল্প আয়ের মানুষ, যারা এক কেজি পেঁয়াজ কিনতেই আজ তিন গুণ দাম দিচ্ছে।

যদিও এই অভিযোগকে সাফ অস্বীকার করেছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের অতিরিক্ত পরিচালক ড. জামাল উদ্দীন। তিনি বলেন, “বাজারে সরবরাহ সংকট নেই। সিন্ডিকেট কৃত্রিমভাবে সংকট তৈরি করছে। আমাদের হাতে এখনো এক লাখ টনেরও বেশি পুরোনো পেঁয়াজ আছে, নতুন পেঁয়াজও বাজারে আসতে শুরু করেছে। আমদানির প্রয়োজন নেই।” তিনি আরও বলেন, আমদানিকারকদের অভিযোগ প্রমাণ করার সাহস থাকলে তারা যেন প্রকাশ্যে তা তুলে ধরেন।

অন্যদিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানিয়েছে, দাম ১৫০ টাকা ছাড়ালে আমদানি খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত আগেই নেওয়া আছে। ফলে খুব শিগগিরই সীমিত আকারে হলেও আমদানির অনুমতি দেওয়া হতে পারে। সরকারের এই সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত বাজারে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকের ধারণা, প্রায়শই যেভাবে পেঁয়াজ আমদানি ও দাম বৃদ্ধির খেলা চলে, এবারও হয়তো একই পথে এগোচ্ছে বাজার।

পাশাপাশি বাজারে শীতের সবজির সরবরাহ বাড়লেও দাম কমছে না। ক্রেতাদের অভিযোগ, উৎপাদন বাড়লেও কোনো পণ্যের দামই আগের মতো কম হচ্ছে না। কাঁচামরিচের দাম কিছুটা কমে গেলেও অন্য সবজির দাম ৫০ থেকে ১০০ টাকার নিচে নামছে না। বরবটি, বেগুন, পটোল, ঢেঁড়শের দাম গত সপ্তাহের তুলনায় বেশি। টমেটো এখনো কেজিতে ১০০ থেকে ১৪০ টাকার মতো বিক্রি হচ্ছে।

এদিকে মিল মালিকরা সরকারকে না জানিয়েই লিটারপ্রতি আট টাকা বাড়িয়েছে ভোজ্যতেলের দাম। বাজারে এর প্রভাব পড়েছে সঙ্গে সঙ্গেই। পরিবার-পরিজনের দৈনিক রান্নার খরচ বেড়ে যাচ্ছে, অথচ কোনো দিক থেকেই স্বস্তির বার্তা মিলছে না।

নতুন ও পুরোনো আলুর দামেও চরম অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। নতুন আলু কিছুটা কম দামে পাওয়া গেলেও পুরোনো আলুর দাম বেড়েছে। করলা, লাউ, শিমসহ প্রায় সব ধরনের সবজির দামই সাধারণ মানুষের জন্য চরম কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, অনেকেই প্রয়োজনের কম পণ্য নিয়ে ফিরছেন। মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একটি পরিবারের মাসিক বাজার খরচ এখন আগের তুলনায় প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বেশি। পেঁয়াজের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় উপকরণের দাম অস্বাভাবিক বাড়লে রান্না থেকে শুরু করে প্রতিটি পরিবারের আর্থিক পরিকল্পনা ভেঙে পড়ে।

প্রতিটি বাজারেই একই অভিযোগ—সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ। তবে অন্য পক্ষ বলছে, কৃত্রিম সংকট না তৈরি হলে দাম এতটা বাড়ত না। বাজারের এই অসঙ্গতি দূর করতে জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।

বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রধান প্রশ্ন হচ্ছে—সরকার কি দ্রুত আমদানি খুলে দেবে, নাকি বাজারে নতুন পেঁয়াজ আসার অপেক্ষা করবে? তার ওপরই নির্ভর করছে আগামী সপ্তাহে পেঁয়াজের দাম কোনদিকে যাবে।

জনগণের আকাঙ্ক্ষা একটাই—বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসুক। নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে আসুক। কৃষক, ব্যবসায়ী, আমদানিকারক ও সরকারের মধ্যে স্বচ্ছতা এবং সমন্বয় না থাকলে এই সংকট চলতেই থাকবে। পেঁয়াজের মতো প্রতিটি ঘরে ব্যবহৃত নিত্য উপকরণের দাম এভাবে বাড়তে থাকলে দেশের মানুষের ভোগান্তি অসহনীয় হয়ে উঠবে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। দেশের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজারে আজ যে চিত্র দেখা যাচ্ছে তা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির অস্থিরতারও প্রতিচ্ছবি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত