প্রকাশ: ০৫ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
লাতিন আমেরিকার ভূরাজনীতি নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক অবস্থান ও মাদকবিরোধী অভিযানের প্রসঙ্গ ঘিরে। বিশেষ করে কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের অভিযোগ, হুমকি এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও তীব্র করেছে। এই প্রেক্ষাপটে কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো এক আবেগমথিত কিন্তু দৃঢ় অবস্থান ঘোষণা করেছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, দেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো রকম আপস করা হবে না, প্রয়োজন হলে জীবন দিতেও প্রস্তুত কলম্বিয়ার জনগণ।
পেত্রো বলেন, কলম্বিয়াকে মাদক উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে চিহ্নিত করে যুক্তরাষ্ট্র যে বক্তব্য দিয়েছে, তা ভিত্তিহীন এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, তিনি নাকি শুনেছেন কলম্বিয়া কোকেন উৎপাদন করছে এবং তা যুক্তরাষ্ট্রে পাচার করছে। তার ভাষায়, যে দেশ এই কাজ করবে তাকে সামরিকভাবে আক্রমণ করা হবে। এমন মন্তব্য শুধু একটি স্বাধীন দেশের মর্যাদাকেই ক্ষুণ্ন করেনি, বরং দুই দেশের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক সম্পর্ককে বিপজ্জনক মোড়ে নিয়ে গেছে।
এই মন্তব্যের প্রত্যুত্তরে প্রেসিডেন্ট পেত্রো বলেন, কলম্বিয়া বহু দশক ধরে মাদকবিরোধী যুদ্ধে সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে। হাজারো মানুষ জীবন হারিয়েছে, অসংখ্য পরিবার ভেঙে গেছে, অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তবুও তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে সামরিক হুমকি দেওয়া অন্যায় এবং অগ্রহণযোগ্য। তিনি বলেন, সমালোচকরা দাবি করছেন কলম্বিয়া নাকি মাদকবিরোধী লড়াইয়ে যথেষ্ট কাজ করছে না। কিন্তু বাস্তবে কলম্বিয়ার জনগণ যে ত্যাগ স্বীকার করেছে, তা অন্য কোনো দেশের সঙ্গে তুলনা করা যায় না। মাদকবিরোধী যুদ্ধে তারা বছরের পর বছর রক্ত, ঘাম আর অশ্রু দিয়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
পেত্রো স্পষ্ট ভাষায় বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি হুমকি বাস্তবায়ন করতে চায়, তবে তা কলম্বিয়ার জনগণের আত্মমর্যাদায় আঘাত হানবে। তিনি সামরিক বাহিনীর উদ্দেশে বলেন, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে হলে প্রয়োজন হলে জীবন দিতে হবে। কলম্বিয়াকে হুমকি দেওয়া যায় না। যে কেউ যদি এই হুমকি কার্যকর করতে চায়, তবে সে কলম্বিয়ান জনগণের মধ্যে ঘুমন্ত জাগুয়ারকে জাগিয়ে তুলবে। পেত্রোর এই বক্তব্য দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। একদিকে জনগণ সমর্থন জানাচ্ছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মহল উদ্বেগ প্রকাশ করছে।
পেত্রো যুক্তরাষ্ট্রের সেই ক্যারিবীয় অঞ্চলে পরিচালিত সামরিক অভিযানেরও সমালোচনা করেন, যেখানে মাদকবিরোধী অভিযান নামের আড়ালে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ, ড্রোন, বোমারু বিমান ও সাবমেরিন মোতায়েন করা হয়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই মোতায়েন আরও বেড়েছে, যা লাতিন আমেরিকাজুড়ে অস্থিরতা বাড়াচ্ছে। পেত্রো বলেন, মার্কিন সামরিক উপস্থিতি শুধু কলম্বিয়াই নয়, গোটা অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি তৈরি করছে। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র মাদকবিরোধী অভিযানকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে।
প্রেসিডেন্ট পেত্রো উল্লেখ করেন, তার সরকার মাদক উৎপাদনকারী ল্যাব ধ্বংসে কঠোর অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। এমনকি তিনি ট্রাম্পকে আমন্ত্রণ জানান এসব অভিযান সরাসরি দেখতে আসার জন্য। পেত্রো বলেন, বাস্তব পরিস্থিতি না দেখে, তদন্ত না করে বা কলম্বিয়া সরকারের সঙ্গে আলোচনা না করেই যুক্তরাষ্ট্রের এমন মন্তব্য দায়িত্বজ্ঞানহীন। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আহ্বান জানান দুই দেশের সম্পর্ক রক্ষায় শান্তিপূর্ণ ও কূটনৈতিক সমাধানের পথ অনুসরণ করতে।
জাতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, কলম্বিয়া-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক বহু দশক ধরে সহযোগিতা, সামরিক অংশীদারিত্ব এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। বিশেষ করে মাদকবিরোধী যুদ্ধের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে কলম্বিয়াকে সহায়তা দিয়ে আসছে। কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান ও পেত্রোর বক্তব্য দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে কূটনৈতিক উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তবে লাতিন আমেরিকায় এক অনিশ্চিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।
স্থানীয় পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, পেত্রোর বক্তব্য শুধু ক্ষোভের প্রতিক্রিয়া নয়, বরং দেশের সার্বভৌমত্বের ব্যাপারে একটি স্পষ্ট বার্তা। কলম্বিয়ার জনগণ মাদকবিরোধী যুদ্ধের ভুক্তভোগী হওয়া সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক রাজনীতির জটিল খেলায় তাদের ওপর দায় চাপানো অন্যায়। প্রেসিডেন্ট পেত্রো সম্ভবত সেই ক্ষোভের ভাষাই প্রকাশ করেছেন।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, কলম্বিয়া বহু বছর ধরে মাদকবিরোধী অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা পেলেও দুই দেশের লক্ষ্য ও কৌশলে প্রায়ই মতভেদ দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তির ওপর জোর দিলেও কলম্বিয়া চেয়েছে সামাজিক ও অর্থনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে সমস্যা সমাধান করতে। পেত্রোর সরকার মাদক উৎপাদনকারী এলাকার কৃষকদের বিকল্প আয়ের পথ তৈরি, পুনর্বাসন কর্মসূচি এবং অপরাধচক্র ভাঙার ওপর জোর দিচ্ছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নীতি অনেক সময় এই প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
কলম্বিয়ার গণমাধ্যমে পেত্রোর বক্তব্য ব্যাপকভাবে প্রচারিত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ দেখাচ্ছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কেউ কেউ পেত্রোর দৃঢ় অবস্থানকে প্রশংসা করছে, বলছে তিনি জনগণের কণ্ঠস্বর তুলে ধরেছেন। আবার কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা কলম্বিয়ার অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—কলম্বিয়া আর আগের মতো নিরব পর্যবেক্ষক হয়ে থাকতে চায় না। দেশের সার্বভৌমত্ব, জনগণের সম্মান এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান রক্ষায় তারা এখন আরও স্পষ্ট ও আত্মবিশ্বাসী। প্রেসিডেন্ট পেত্রোর বক্তব্য সেই আত্মবিশ্বাসেরই প্রতিফলন, যা আগামী দিনগুলোতে লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক দৃশ্যপটে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।