প্রকাশ: ০৫ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীর পূর্বাচলে আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবক দিবসকে কেন্দ্র করে আয়োজিত বিশেষ অনুষ্ঠানে দেশের স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রমে নতুন দিগন্ত উন্মোচনের ঘোষণা দিল সরকার। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের ভলান্টিয়ারদের প্রশিক্ষণের মান উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং স্বেচ্ছাসেবকদের জন্য বিশেষ সুবিধা প্রবর্তনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী (অব.)। তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য একটি বিস্তৃত কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে দেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় স্বেচ্ছাসেবকদের সক্ষমতা আরও সুদৃঢ় করা।
রাজধানীর পূর্বাচলে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স ট্রেনিং গ্রাউন্ডে ‘ইন্টারন্যাশনাল ভলান্টিয়ার্স ডে’ উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জানান, স্বেচ্ছাসেবকদের জন্য মানসম্মত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। তিনি বলেন, ফায়ার সার্ভিস সারা দেশে ৬২ হাজার ভলান্টিয়ার তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে, যার মধ্যে ৫৫ হাজারের বেশি ইতোমধ্যে প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছেন। এই বিশাল মানবসম্পদ শুধু দুর্যোগ মোকাবিলায় নয়, মানবিক সেবা ও জননিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
তিনি বলেন, প্রশিক্ষণ একটি ব্যক্তিকে দক্ষ করে তোলে, আত্মবিশ্বাসী করে তোলে এবং সঙ্কট মুহূর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম করে। বিশেষ করে ভূমিকম্প, বড় অগ্নিকাণ্ড বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় স্বেচ্ছাসেবকদের প্রস্তুতি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি বাহিনীর পক্ষে এককভাবে এসব দুর্যোগ মোকাবিলা করা কঠিন, তাই ভলান্টিয়ারদের প্রশিক্ষণ আরও বিস্তৃত এবং শক্তিশালী করতে হবে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত স্বেচ্ছাসেবকদের উদ্দেশে উপদেষ্টা বলেন, আপনারা দেশের সম্পদ। দুর্যোগের সময় সবচেয়ে আগে মানুষের পাশে দাঁড়াতে আপনারাই এগিয়ে যান। আপনাদের প্রশিক্ষণ যেমন জনগণকে রক্ষা করে, তেমনি ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের জনবল সংকটও অনেকাংশে কমিয়ে দেয়। এ কারণেই সরকার তাদের আরও সহায়তা দেওয়ার চিন্তা করছে। প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ভলান্টিয়ারদের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি, প্রয়োজনীয় সুবিধা ও সরঞ্জাম প্রদানের উদ্যোগও প্রক্রিয়াধীন বলে তিনি জানান।
এ সময় তিনি পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেন, আইন প্রণয়ন করা হয় জনগণের স্বার্থে। পুলিশ কমিশনও জনগণ ও পুলিশের জন্য কল্যাণকর সুপারিশ করবে, যা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিবেচনায় নিয়ে বাস্তবায়ন করবে। তিনি বলেন, কমিশন রাজনীতিমুক্তভাবে কাজ করবে এবং তার লক্ষ্য হবে জনগণকে সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করা।
অনুষ্ঠানে ফায়ার সার্ভিসের ভলান্টিয়াররা বিভিন্ন মহড়া প্রদর্শন করেন। আগুন নেভানো, উদ্ধার অভিযান ও দুর্যোগ মোকাবিলার নানা কৌশল现场ে প্রদর্শন করে তারা উপস্থিত অতিথিদের মুগ্ধ করেন। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা এই মহড়া পর্যবেক্ষণ করে স্বেচ্ছাসেবকদের দক্ষতা ও দায়িত্বশীলতার প্রশংসা করেন।
দেশে যেকোনো দুর্যোগে ফায়ার সার্ভিসের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবকরা প্রাণপণ লড়ে যান মানুষের জীবন রক্ষার জন্য। ভবন ধসে পড়ার ঘটনা থেকে বড় অগ্নিকাণ্ড কিংবা বন্যা—সব দুর্যোগেই তাদের অবদান অস্বীকার করা যায় না। বহু সময় তারা নিজেদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে অন্যকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। দেশের এই নীরব নায়করা এখন সরকারের পরিকল্পনায় আরও শক্তিশালী সহযোদ্ধা হিসেবে উঠে আসছেন।
দুর্যোগপ্রবণ দেশে স্বেচ্ছাসেবকদের এমন প্রস্তুতি অত্যন্ত মূল্যবান। ফায়ার সার্ভিস অধিদপ্তর বলছে, ভবিষ্যতে আরও উন্নত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, আধুনিক সরঞ্জাম এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষক নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে দেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা আরও উন্নত হবে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা আরও দ্রুত হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যদি ভলান্টিয়ারদের উন্নত প্রশিক্ষণ, মানসম্মত সরঞ্জাম এবং যথাযথ স্বীকৃতি দেয়া যায়, তবে দেশের যেকোনো দুর্যোগে মানবিক সেবার মান আরও বাড়বে এবং প্রাণহানিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। তাছাড়া বিপুল সংখ্যক তরুণ সমাজকেও এই মানবিক কাজে যুক্ত করা গেলে দেশের সামগ্রিক দুর্যোগ প্রস্তুতি আরও শক্তিশালী হবে।
অনুষ্ঠানস্থলে অনেক স্বেচ্ছাসেবক জানান, দেশের মানুষকে সাহায্য করার সুযোগ তাদের কাছে গৌরবের। তবে তারা চান আরও নিয়মিত প্রশিক্ষণ, সুরক্ষা সরঞ্জাম ও সরকারের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি। এমন প্রতিক্রিয়াও জানানো হয় যে, ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে কাজ করা তাদের জীবনে মানবিক মূল্যবোধ ও সাহসিকতার গুরুত্ব আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করিয়েছে।
সব মিলিয়ে সরকারের এই ঘোষণা ফায়ার সার্ভিস ভলান্টিয়ারদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা তৈরি করেছে। দুর্যোগ মোকাবিলা কাঠামোর উন্নয়ন ও মানবিক সেবার মান বাড়াতে এটি একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। ভলান্টিয়ারদের প্রশিক্ষণ ও সুবিধা বাড়ানোর এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও উদ্ধার কার্যক্রম আরও এগিয়ে যাবে বলেই আশা করা হচ্ছে।