প্রকাশ: ০৫ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
উত্তর আমেরিকার দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যকার প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও ঘনিষ্ঠ রূপ নিতে চলেছে। বৃহস্পতিবার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, কানাডার কাছে ২.৬৮ বিলিয়ন ডলারের উন্নতমানের বোমা বিক্রির আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দীর্ঘদিন ধরেই প্রতিরক্ষা খাতে সক্ষমতা বৃদ্ধির চেষ্টা করছে অটোয়া, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে ওঠার প্রেক্ষাপটে। তাই মার্কিন অস্ত্রভান্ডারের এই বিশাল প্যাকেজ দেশটির সামরিক বাজেট ও ভূরাজনৈতিক পরিকল্পনায় নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে বিশ্লেষকদের মত।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানায়, অনুমোদিত অস্ত্র প্যাকেজের অন্যতম প্রধান উপাদান হচ্ছে ৩,৪১৪টি বিএলইউ-১১১ বোমা—প্রতিটির ওজন প্রায় ৫০০ পাউন্ড বা ২২৬ কেজি। স্থলবাহিনীর ঘন বিন্যাসে আঘাত হানতে সক্ষম এই বোমাগুলো আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ ছাড়া প্যাকেজে রয়েছে ৩,১০৮টি জিবিইউ-৩৯ বোমা, যা স্থির লক্ষ্যবস্তুতে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে আঘাত হানার জন্য বিশ্বের অন্যতম কার্যকর স্মার্ট বোমা হিসেবে পরিচিত। সাধারণ অপ্রতিভ বোমাকে নির্ভুল নির্দেশনা-সক্ষম অস্ত্রে রূপান্তর করতে ব্যবহৃত ৫,০০০-এর বেশি জেডিএএম কিটও প্যাকেজের অংশ।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর কংগ্রেসে পাঠানো নোটিফিকেশনে বলেছে, এই বিক্রির মাধ্যমে কানাডার প্রতিরক্ষা সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে এবং মিত্র দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অপারেশনাল সামঞ্জস্য আরও জোরদার হবে। তারা বলেছে, এই অস্ত্র চুক্তি আঞ্চলিক আগ্রাসন মোকাবিলায় সহায়তা করার পাশাপাশি সামষ্টিক মহাদেশীয় প্রতিরক্ষায় কানাডার অবদানকেও আরও শক্তিশালী করবে। যদিও মার্কিন অস্ত্র বিক্রি সবসময়ই বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে নানা ব্যাখ্যার জন্ম দেয়, তবে ন্যাটো জোটের দীর্ঘদিনের মিত্র কানাডার ক্ষেত্রে এই বিক্রিকে যুক্তরাষ্ট্রে ইতিবাচক হিসাবে দেখানো হচ্ছে।
এ বছরের আগস্টে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ঘোষণা করেন, দেশটি প্রতিরক্ষা ব্যয় জিডিপির ২ শতাংশে উন্নীত করবে, যা ন্যাটোর নির্ধারিত লক্ষ্য। দীর্ঘদিন ধরেই ন্যাটো মিত্র দেশগুলোর ওপর চাপ বাড়াচ্ছিল যুক্তরাষ্ট্র—বিশেষত ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট থাকাকালে—যে মিত্ররা নিজেদের প্রয়োজনীয় দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করছে না, বরং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভর করছে। কানাডাও এই সমালোচনার বাইরে ছিল না। প্রধানমন্ত্রী কার্নি ক্ষমতায় আসার পরই প্রতিরক্ষা বাজেট পুনর্বিন্যাস ও আর্কটিক অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধিকে প্রাধান্য দেন।
কানাডার জন্য যুক্তরাষ্ট্র-নির্ভর নিরাপত্তা দীর্ঘদিনের বাস্তবতা হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই নিশ্চয়তা নিয়ে দেশটিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক বিভাজন এবং ট্রাম্পের ন্যাটোর প্রতি কঠোর অবস্থান কানাডার কূটনীতিকদের উদ্বিগ্ন করে তোলে। ট্রাম্প বহুবার কানাডার প্রতিরক্ষা ব্যয়কে ব্যঙ্গ করেছেন এবং দেশটি যেন যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্যে পরিণত হয়—এমন মন্তব্যও করেছেন। যদিও এসব মন্তব্য রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে বিবেচিত হয়, বাস্তবে তা কানাডার প্রতিরক্ষা নীতিতে চাপ সৃষ্টি করেছে।
অন্যদিকে, আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়ার কার্যক্রমও কানাডার জন্য নতুন নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বরফ গলে নতুন বাণিজ্য ও সামুদ্রিক রুট খুলে যাচ্ছে। এতে আর্কটিকে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা বাড়ছে। রাশিয়া বরাবরই আর্কটিক অঞ্চলে তাদের সামরিক উপস্থিতি জোরদার করছে, যা কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের জন্যই উদ্বেগের কারণ। উন্নত প্রতিরক্ষা-সক্ষমতা ছাড়া কানাডার পক্ষে এ অঞ্চলে নিজস্ব স্বার্থ রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।
বিদেশি অস্ত্র কেনার বিষয়টি সবসময়ই কানাডায় রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি করে। সমালোচকরা বলছেন, সামাজিক খাতের ওপর চাপ বাড়িয়ে সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি দেশটির মানবিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ব্যাহত করতে পারে। তবে ভৌগোলিক ও কৌশলগত সীমাবদ্ধতার পরিপ্রেক্ষিতে উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়া কানাডার জন্য টিকে থাকা কঠিন হতে পারে। এ কারণেই কানাডার সামরিক বাজেট ও অস্ত্র ভান্ডার বাড়ানোর পদক্ষেপ বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞই যৌক্তিক বলে মনে করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কানাডার সামরিক সহযোগিতা গভীর হলেও অস্ত্র বিক্রির এই বড় প্যাকেজ দেশটির আন্তর্জাতিক অবস্থানকে আরও সুসংহত করবে। যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটোর আওতায় কানাডাকে দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তা ছাতা দিয়ে আসছে। যদিও রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ভবিষ্যতে কী রূপ নেবে তা অনিশ্চিত, কিন্তু দুই দেশের সামরিক সহযোগিতা এখনও অত্যন্ত শক্তিশালী। কানাডার এই নতুন অস্ত্র প্যাকেজ মূলত সেই সম্পর্ককে নতুন করে সংহত করার ইঙ্গিতই দেয়।
সামগ্রিকভাবে, মার্কিন বোমা ও অস্ত্রসামগ্রী কেনার এই বিশাল চুক্তি কানাডার প্রতিরক্ষা নীতি ও সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এই চুক্তি ন্যাটোর ভূরাজনীতিতে নতুন শক্তির ভারসাম্য তৈরি করবে, পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা সম্পর্কের ভবিষ্যত গতিপথকেও আরও দৃঢ় করবে বলে মনে করা হচ্ছে।