প্রকাশ: ০৫ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ক্যারিবিয়ান সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের পরিচালিত এক সামরিক অভিযানের ভিডিও প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। ভিডিওতে দেখা গেছে, একটি সন্দেহভাজন মাদকবাহী নৌকা ধ্বংসের পর ধ্বংসাবশেষে ভর করে থাকা দুই জীবিত, নিরস্ত্র ও পোশাকহীন ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে পুনরায় হামলা চালানো হয়। এই হামলায় তারা নিহত হন। যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ‘মাদকবিরোধী যুদ্ধ’-এর অংশ হিসেবে পরিচালিত এই অভিযানের বৈধতা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
ঘটনাটি ঘটে ২ সেপ্টেম্বর। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের নির্দেশে পরিচালিত ছয় সপ্তাহব্যাপী অভিযানের প্রথম প্রাণঘাতী অভিযানে আকাশ থেকে বিস্ফোরক নিক্ষেপ করে মাদকবাহী নৌকাটি ধ্বংস করা হয়। নৌকাটিতে মোট ১১ জন ছিলেন; প্রথম হামলায় ৯ জন নিহত হন। দুই জীবিত ব্যক্তি নৌকার ভগ্নাংশ আঁকড়ে ধরে বাঁচার চেষ্টা করছিলেন। ভিডিওতে দেখা যায়, তারা প্রায় এক ঘণ্টা ধরে নৌকার অংশ উল্টে বাঁচার চেষ্টা করছেন, কিন্তু সফল হচ্ছেন না। তাদের কাছে কোনো অস্ত্র বা যোগাযোগ সরঞ্জামও ছিল না।
অভিযান পরিচালনাকারী অ্যাডমিরাল ফ্র্যাঙ্ক ব্র্যাডলি দাবি করেন, নৌকায় থাকা বিপুল পরিমাণ কোকেনের কারণে ধ্বংসাবশেষ ভেসে থাকতে পারে, ফলে কার্টেল পুনরায় মাদক উদ্ধার করতে পারে। “মিশনের সম্পূর্ণতা” নিশ্চিত করতে তিনি দ্বিতীয় দফায় হামলার অনুমোদন দেন। ভিডিওতে দেখা যায়, তিনবার পরপর গোলা নিক্ষেপ করা হলে জীবিত থাকা দুই ব্যক্তিই নিহত হন।
উল্লিখিত ভিডিওটি কংগ্রেসের একটি গোপন বৈঠকে প্রদর্শন করা হলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। ডেমোক্র্যাট সদস্যরা ভিডিও দেখে প্রকাশ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। একজন জ্যেষ্ঠ ডেমোক্র্যাট বলেন, “এটি আমার দেখা সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঘটনার একটি।” অপরদিকে রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারা এই হামলা সমর্থন করে যুক্তি দেন, জীবিত দুই ব্যক্তি ধ্বংসাবশেষ উল্টে নৌকা চালু করতে পারলে তারা পুনরায় যুক্তরাষ্ট্রমুখী মাদকপাচারে যুক্ত হতে পারতেন।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের যুদ্ধ আইন অনুযায়ী, জাহাজডুবি হওয়া বা যুদ্ধক্ষমতা হারানো এবং লড়াইয়ে অংশ না নেওয়া ব্যক্তির ওপর হামলা “স্পষ্টতই বেআইনি।” মানবাধিকার বিশ্লেষকরা বলছেন, ভিডিওতে দেখা বেসামরিক অবস্থা ও নিরস্ত্র অবস্থার কারণে এই হামলা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তবে মার্কিন প্রশাসন দাবি করছে, এটি সশস্ত্র মাদক কার্টেলের বিরুদ্ধে “যুদ্ধ,” এবং মাদক পাচারকে দেশের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গত ছয় সপ্তাহে এমন অন্তত ২২টি হামলা চালানো হয়েছে, যাতে মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৭। পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে সম্প্রতি চালানো আরেকটি হামলায়ও প্রাণহানি ঘটেছে। সামরিক বাহিনী বলছে, মাদক পাচার রোধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।
এই ঘটনার পর ভিডিও ও নথিপত্র প্রকাশ এবং নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক জলসীমায় এমন হামলা আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র এই অভিযানের বৈধতা নিয়ে জোরালো যুক্তি দেখালেও, মানবাধিকারকর্মীদের মতে, এটি ভবিষ্যতে আরও বড় নৈতিক ও কূটনৈতিক সংকট ডেকে আনতে পারে।
মাদক কার্টেলের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবস্থান নতুন নয়। তবে এ ধরনের প্রাণঘাতী অভিযান, বিশেষ করে নিরস্ত্র মানুষ হত্যার ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বাড়তি নজরদারি এবং সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, মাদকবিরোধী অভিযান মানবাধিকার সম্মত না হলে তা আরও অস্থিতিশীল অবস্থা তৈরি করবে এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামোকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।
শেষ পর্যন্ত, এই ঘটনাটি শুধু একটি নৌকা বিধ্বস্ত ও দুই ব্যক্তির মৃত্যুর গল্প নয়; বরং এটি তুলে ধরেছে আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার এবং সামরিক অভিযানের নৈতিকতার বড় প্রশ্ন – যা আজ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও সংস্থাকে গভীরভাবে ভাবাচ্ছে।