নির্বাচনি প্রচারে শিথিল হচ্ছে আচরণবিধির বিধিনিষেধ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৩৮ বার
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন

প্রকাশ: ০৮ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নিবিড় প্রস্তুতির মধ্যেই নির্বাচন কমিশন (ইসি) আচরণবিধির বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিধিনিষেধ শিথিলের উদ্যোগ নিয়েছে। আসন্ন নির্বাচনে প্রার্থীদের প্রচারের সুযোগ বাড়াতে এবং দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত নিয়মের অসঙ্গতি দূর করতে কমিশন গত সপ্তাহে সংশোধিত প্রস্তাব আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। নির্বাচন কমিশন মনে করছে, এসব পরিবর্তন বাস্তবায়িত হলে প্রার্থীদের প্রচার কার্যক্রম হবে আরও সুসংগঠিত, বাস্তবমুখী ও প্রযুক্তিনির্ভর। একই সঙ্গে নির্বাচনি মাঠে প্রচারের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের ভৌগোলিক বৈষম্যও দূর হবে।

ইসির একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, আচরণবিধির দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—প্রচারযন্ত্র বা মাইক ব্যবহারে আরোপিত দৈনিক সীমা এবং ডিজিটাল ডিসপ্লে বোর্ড বা ডিজিটাল ব্যানার স্থাপনের সংখ্যা—সম্পর্কে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও প্রার্থী অভিযোগ জানিয়ে আসছিলেন। বিশেষ করে বড় আকারের সংসদীয় এলাকার ক্ষেত্রে এসব সীমাবদ্ধতা অনেক সময় প্রচারের গতি কমিয়ে দিত এবং সব ভোটার ইউনিটে বার্তা পৌঁছাতে চ্যালেঞ্জ তৈরি হতো। কমিশনের মূল্যায়নেও দেখা গেছে, বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে এসব বিধিনিষেধের বিরাট ব্যবধান তৈরি হয়েছে, যা সংশোধন করা জরুরি হয়ে পড়েছিল।

প্রচারযন্ত্র ব্যবহারের পূর্ববর্তী বিধানে একটি সংসদীয় আসনে দৈনিক সর্বোচ্চ তিনটি মাইক ব্যবহার করার অনুমতি ছিল। নির্বাচনের মৌসুমে প্রচারযন্ত্র হচ্ছে সবচেয়ে কার্যকর ও সহজ প্রচারমাধ্যম, তাই এ নিষেধাজ্ঞা অনেক প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলের কাছে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখা দিত। বিশেষ করে বড় আকারের গ্রামীণ আসনে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত স্বল্প সময়ে সব ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে প্রচারের বার্তা পৌঁছে দিতে তিনটি মাইকের সীমা ছিল কার্যত অচলাবস্থার সমতুল্য। ইসি সূত্র জানিয়েছে, সংশোধিত প্রস্তাবে এই সংখ্যাটি শিথিল করা হয়েছে। তবে সর্বোচ্চ কতটি মাইক ব্যবহার করা যাবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সংখ্যা না রাখার দিকেই কমিশন ঝুঁকেছে। কমিশনের মতে, নির্বাচনি এলাকার বিস্তৃতি, জনসংখ্যা এবং প্রচারের প্রয়োজন বিবেচনায় প্রার্থীরা যেন যৌক্তিকভাবে মাইক ব্যবহার করতে পারেন—সেই সুযোগ তৈরিই এই সংশোধনের মূল লক্ষ্য।

ডিজিটাল ডিসপ্লে বোর্ড বা ডিজিটাল ব্যানার ব্যবহারের বিধানটি নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক ছিল। আগে একটি সংসদীয় আসনে সর্বোচ্চ ২০টি ডিজিটাল ডিসপ্লে বোর্ড স্থাপনের নিয়ম ছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে অনেক আসন ২৪ থেকে ৩০টি ইউনিয়ন বা একাধিক পৌরসভাকে অন্তর্ভুক্ত করে। এতে প্রতিটি ইউনিটে একটি করে ডিসপ্লে বোর্ড স্থাপন করাও অসম্ভব হয়ে পড়ছিল। ফলে ডিজিটাল প্রচারের ক্ষেত্রে এক ধরনের ভৌগোলিক বৈষম্য তৈরি হতো এবং এটি নির্বাচনে সমতা নিশ্চিত করার পথে অন্তরায় হিসেবে দাঁড়াত। এ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো বারবার কমিশনের কাছে আপত্তি জানায়।

সংশোধিত প্রস্তাবে এই বৈষম্য দূর করা হয়েছে। এখন থেকে একটি সংসদীয় এলাকার অধীনে যত ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভা থাকবে, প্রতিটিতেই একটি করে ডিজিটাল ডিসপ্লে বোর্ড স্থাপন করা যাবে। এটি ডিজিটাল প্রচারের পরিধি বাড়িয়ে তুলবে এবং প্রার্থীদের বার্তা আরও বেশি ভোটারের কাছে পৌঁছাতে সাহায্য করবে। আর যদি কোনো সংসদীয় আসন সিটি করপোরেশন এলাকায় পড়ে, তবে সেখানে প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে ডিসপ্লে বোর্ড স্থাপনের অনুমোদন থাকবে। কমিশন মনে করছে, এতে প্রচারের ক্ষেত্রে নগর ও গ্রামীণ বৈষম্য দূর হবে এবং সব প্রার্থী সমান সুযোগ পাবেন।

ইসির সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আচরণবিধির বিভিন্ন ধারায় আগে যে করণিক বৈষম্য ছিল, সংশোধিত প্রস্তাবে সেগুলো যথাযথভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে নিয়মগুলো স্পষ্ট ছিল না বা বাস্তব প্রয়োগে দ্ব্যর্থতা তৈরি করত। বিভিন্ন নির্বাচন পর্যবেক্ষণ সংস্থা ও রাজনৈতিক দলের দেওয়া মতামতও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। কমিশনের আশা, সংশোধনীগুলো আইন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেলেই দ্রুত কার্যকর করা হবে এবং তফসিল ঘোষণার আগেই নতুন বিধি হাতে পাওয়া যাবে।

নির্বাচন কমিশনের একজন উপসচিব বলেছেন, প্রতিটি নির্বাচনে আচরণবিধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে বিধিনিষেধ আরোপের ক্ষেত্রে বাস্তবতার সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেওয়া না গেলে তা উল্টো জটিলতা তৈরি করে। তিনি আরও বলেন, এবার যে সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তা মূলত নির্বাচনের মাঠকে স্বচ্ছ, সুবিন্যস্ত এবং প্রযুক্তিবান্ধব করতে। একই সঙ্গে প্রার্থীদের প্রতি ইউনিয়ন বা ওয়ার্ডে সমান প্রচারের সুযোগ দিতে হবে—এটাই কমিশনের অভিন্ন অবস্থান।

দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন এখন নির্বাচনি উত্তাপে উষ্ণ হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর দাবি, নির্বাচনি আচরণবিধি যেন প্রার্থী ও ভোটারের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন না করে বরং সমান সুযোগ নিশ্চিত করে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল প্রচারে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর দাবি জানাতে থাকায় কমিশনও প্রযুক্তিনির্ভর প্রচারের সুযোগ বাড়ানোর দিকে নজর দিয়েছে। ডিজিটাল ডিসপ্লে বোর্ড বৃদ্ধির সিদ্ধান্তকে অনেকেই আধুনিক নির্বাচনি প্রচারের বাস্তবচিত্র হিসেবে দেখছেন। একইসঙ্গে মাইক ব্যবহারের শিথিলতা প্রার্থীদের প্রচারে গতি আনবে বলেও তারা আশা করছেন।

ইসি প্রস্তাব চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হলে মাঠপর্যায়ে নির্বাচন-সংক্রান্ত শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। প্রচারের স্বাধীনতা দেওয়া হলেও শৃঙ্খলা, শব্দদূষণ এবং জনদুর্ভোগ যাতে না বাড়ে—সেদিকে কমিশন কঠোর নজর দেবে বলেও জানা গেছে। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা মনে করেন, বিধিনিষেধ শিথিলের পাশাপাশি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য কঠোর নজরদারি বজায় রাখা হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, আচরণবিধির এই পরিবর্তন প্রার্থীদের প্রচারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তবে এর প্রয়োগে স্বচ্ছতা ও ন্যায়সংগত পরিবেশ বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা আরও বলেন, বাংলাদেশের জনসংখ্যা কাঠামো ও নির্বাচনি এলাকার ভৌগোলিক বিভাজন এতটাই বৈচিত্র্যময় যে আচরণবিধির সংশোধন সময়োপযোগী হতেই হতো। এবার কমিশন সেই দিকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে।

দেশের নাগরিকদের কাছে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে আচরণবিধি সংশোধন গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নির্বাচনের আগে কমিশনের এই উদ্যোগ ভোটারদের মধ্যেও আশাবাদ তৈরি করেছে যে প্রচার কার্যক্রম আরও সুষ্ঠু, স্বচ্ছ এবং সমতা ভিত্তিক হবে। এখন সবার দৃষ্টি আইন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন এবং সংশোধিত নিয়ম বাস্তবায়নের ওপর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত