নির্বাচনী নিরাপত্তায় ব্যয় বৃদ্ধি, আইনশৃঙ্খলায় নতুন চাপ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৬৩ বার
নির্বাচন তফসিল

প্রকাশ: ০৯ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র অল্প সময় বাকি। প্রতিবারের মতো এবারও নির্বাচনকে সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে মাঠে রাখতে বিপুল অর্থ বরাদ্দ করেছে নির্বাচন কমিশন। তবে এবার ব্যয়ের অঙ্কটি আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে, ভোটের নিরাপত্তায় ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় এক হাজার ৫৫০ কোটি টাকা, যা গত সংসদ নির্বাচনের তুলনায় প্রায় ৪০০ কোটি টাকা বেশি। দেশের সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক আয়োজনকে সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ এবং নির্ভয় পরিবেশে সম্পন্ন করতে এই ব্যয়কে প্রয়োজনীয় বলেই মনে করছে EC।

সারা দেশে এ বছর ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ৪২ হাজার ৭৬৬টি। প্রত্যেক কেন্দ্র ও কেন্দ্রের কক্ষগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যদের সমন্বিতভাবে মোতায়েন করা হবে। নির্বাচনের আগে-পরে মোট পাঁচদিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঠে থাকার প্রচলিত নিয়ম এবারও অনুসরণ করা হচ্ছে। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় কিছু বাহিনীকে টানা আটদিন দায়িত্ব পালন করতে হতে পারে বলেও ইসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। বিশেষত আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যরা দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করবেন, কারণ মাঠপর্যায়ে তাদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি।

আসন্ন নির্বাচনে মোট আট ধরনের ফোর্স মোতায়েন করা হবে। সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ, র‌্যাব, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী, বিজিবি, বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড, ফায়ার সার্ভিস, গ্রামপুলিশ-চৌকিদার-দফাদার এবং ইউনিয়ন সচিবরাও নির্বাচনের বিভিন্ন ধাপের নিরাপত্তায় অংশ নেবেন। নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতিটি কেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এসব ফোর্সের সদস্যরা নিরলসভাবে কাজ করবেন। গত কয়েকটি নির্বাচনে নিরাপত্তা নিশ্চিতের অভিজ্ঞতা থাকায় এবারের প্রস্তুতিতে তারা আরও সুসংগঠিত।

ব্যয়ের হিসাব পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সবচেয়ে বড় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর জন্য। প্রায় ৪৭৩ কোটি ৩৫ লাখ টাকার এই বরাদ্দ গতবারের তুলনায় প্রায় ১০০ কোটি টাকা বেশি। ভোটকেন্দ্র পাহারা, ব্যালট রক্ষা এবং কেন্দ্রের ভেতরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আনসার সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন। অনেক ক্ষেত্রেই প্রাথমিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা তাদের হাতেই থাকে, যা তাদের দায়িত্ব ও বরাদ্দ বাড়ার যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করে।

দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেয়েছে পুলিশ বাহিনী। তাদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২৮৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা, যা গত নির্বাচনের ২৬৭ কোটি টাকার তুলনায় বেশি। ভোটের দিন পুলিশের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি বিস্তৃত হয়। কেন্দ্রের বাইরে নিরাপত্তা, টহল, আইনশৃঙ্খলার সার্বিক নিয়ন্ত্রণ এবং তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে তাদের দ্রুততার ওপরই নির্ভর করে পুরো প্রক্রিয়া।

নির্বাচনী নিরাপত্তায় তৃতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেয়েছে সেনাবাহিনী। সেনাবাহিনীর জন্য বরাদ্দ ২৬৯ কোটি টাকা, যা গত নির্বাচনে ছিল মাত্র ৮৭ কোটি। তিনগুণেরও বেশি এই বরাদ্দ বৃদ্ধির কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, নির্বাচনী পরিবেশকে সহনশীল রাখতে সশস্ত্র বাহিনীর উপস্থিতি কার্যকর ভূমিকা রাখে। সেনাবাহিনীকে সাধারণত স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে রাখা হয়, যাতে জটিল পরিস্থিতিতে দ্রুত হস্তক্ষেপ করা যায়।

বিজিবির বরাদ্দ ২৩৮ কোটি ২৮ লাখ টাকার বেশি, যা সীমান্তবর্তী এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালনে তাদের সক্ষমতা বাড়াবে। নির্বাচনের সময় দেশের সীমান্ত এলাকাগুলোতে অবৈধ অনুপ্রবেশ, অস্ত্র বা অবৈধ দ্রব্য প্রবেশ ঠেকাতে বিজিবিকে অধিকতর সতর্ক থাকতে হয়। তাই এই বাহিনী এবারও বিশেষ নজরদারির দায়িত্বে থাকবে।

র‌্যাব, কোস্ট গার্ড, নৌবাহিনী, বিমান বাহিনী, চৌকিদার-দফাদার-গ্রামপুলিশ, ইউনিয়ন সচিব ও ফায়ার সার্ভিসের জন্যও বরাদ্দ রাখা হয়েছে পর্যাপ্ত। র‌্যাবের বরাদ্দ ৬৮ কোটি ৬২ লাখ, কোস্ট গার্ড পেয়েছে ৬৬ কোটি ৬২ লাখ, নৌবাহিনীর বরাদ্দ ৭৭ লাখ, বিমান বাহিনীর বরাদ্দ ৩১ কোটি ৮ লাখ, গ্রামপুলিশ-চৌকিদার-দফাদারের বরাদ্দ ৪২ কোটি ৩৬ লাখ, ইউনিয়ন সচিবের জন্য ২৭ কোটি ৪০ লাখ এবং ফায়ার সার্ভিসের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৯ লাখ টাকা। এসব বরাদ্দ থেকেই বোঝা যায় যে নির্বাচনী নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা বিস্তৃত এবং সমন্বয়মূলক প্রচেষ্টা হিসেবে প্রস্তুত করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের বড় দুশ্চিন্তা ব্যাটিং

সশস্ত্র বাহিনীর জন্য অতিরিক্ত পাঁচ কোটি ৫৫ লাখ টাকা এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন্য বাড়তি ১১ লাখ টাকাসহ মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৫১২ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। দ্বাদশ সংসদের সময় ব্যয় ছিল এক হাজার ১৩৬ কোটি। ফলে এবারের অতিরিক্ত ব্যয়ের অঙ্ক দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। ব্যয়ের এই বৃদ্ধি বিভিন্ন মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশনের মতে, একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজন করতে বিনিয়োগ করাই সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের মোট ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা বাড়া, নির্বাচনী পরিবেশের জটিলতা এবং মাঠপর্যায়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সংখ্যাও বৃদ্ধির কারণে ব্যয় বৃদ্ধি স্বাভাবিক। নিরাপত্তা বাহিনীর আধুনিক সরঞ্জাম, যানবাহন, বাড়তি ভাতা ও মাঠপর্যায়ের টহলের ব্যয় বৃদ্ধিও এতে ভূমিকা রেখেছে।

নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, কেন্দ্রগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রস্তুতিও তত জোরদার করা হচ্ছে। বিভিন্ন বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো শনাক্ত করা হচ্ছে। বিগত নির্বাচনে সহিংসতার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার সতর্কতার মাত্রা আরও বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে ছোটখাটো উত্তেজনা সামাল দিতে অতিরিক্ত আনসার সদস্য মোতায়েনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। বড় শহর ও মহানগর এলাকায় পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাবও সার্বক্ষণিক তৎপর থাকবে।

নির্বাচনী নিরাপত্তা বাড়ার ফলে জনমনে আস্থা তৈরি হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। ভোটার বাড়াতে নিরাপত্তা অন্যতম প্রধান উপাদান। মানুষ নিরাপদ মনে করলে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হতে আগ্রহ বাড়ে। অতএব, এই ব্যয়কে শুধুমাত্র খরচ নয়; বরং দেশের গণতন্ত্রচর্চাকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ হিসেবেই দেখা উচিত।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত