পিলখানায় ২০০৯ গোপন যোগাযোগের রহস্য উন্মোচিত

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৪৪ বার
পিলখানায় ২০০৯ মোবাইল কলের রহস্য ও অদৃশ্য নির্দেশনা

প্রকাশ: ০৯ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারির ২৫ ও ২৬ তারিখ। পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহের ঠিক আগে এবং ঘটনার সময় একটি রহস্যময় নীরব যুদ্ধ চলছিল। কিন্তু এই যুদ্ধের অস্ত্র ছিল না শারীরিক, বরং এটি ছিল সিগন্যালের যুদ্ধ—মোবাইল নেটওয়ার্ক, কল রেকর্ড, ডাটা মুছে ফেলা, ট্র্যাকিং এবং বিদেশ থেকে আসা অদৃশ্য নির্দেশনার মাধ্যমে।

জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন, যা পিলখানায় সংঘটিত বিদ্রোহের ঘটনাটি অনুসন্ধান করতে গঠিত হয়েছিল, গত ৩০ নভেম্বর তাদের প্রতিবেদন রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দিয়েছে। প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঘটে যাওয়া অদ্ভুত মোবাইল কলের তথ্য, যা বিস্ময়কর এবং ভয়ঙ্কর দিকনির্দেশনা প্রদান করে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, বিদ্রোহের অন্যতম ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে নাম আসে আওয়ামী লীগ নেতা তোরাব আলীর। তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরের কল রেকর্ড বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২৪ ফেব্রুয়ারি বিকালে সিঙ্গাপুরের একটি নম্বর থেকে তার কাছে একাধিক কল আসে। তাতে তিনি একবার প্রায় পাঁচ মিনিট কথা বলেন। পরের দিন ভারতের একটি নম্বর থেকে সকাল ১১টা থেকে ১১টা ৩৪ মিনিট পর্যন্ত একাধিকবার যোগাযোগ হয়। বিকাল ৪টা ১৭ মিনিটে একই ভারতীয় নম্বর থেকে আবার কল আসে, তখন তিনি প্রায় এক মিনিট কথা বলেন।

২৬ ফেব্রুয়ারি দুপুরে আবার সিঙ্গাপুরের নম্বর থেকে কল আসে। ২৭ ফেব্রুয়ারি দুপুরে একই নম্বর থেকে ফোন আসে, কথা হয় ৪৩ সেকেন্ড। সবচেয়ে অস্বাভাবিক বিষয় হলো, জানুয়ারি থেকে ৬ মার্চ পর্যন্ত তোরাব আলীর মোবাইলে শুধুমাত্র ২৪ থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে এই বিদেশি কলগুলো এসেছে, এর বাইরে কোনো কল আসেনি বা তিনি কোনো বিদেশি নম্বরে কল করেননি।

প্রতিবেদন আরও জানায়, মোবাইল কল রেকর্ডগুলো ওই সময় পুরোপুরি মুছে ফেলা হয়েছিল। বিশেষ করে রাজনৈতিক ও বিদেশি যোগাযোগ সংক্রান্ত কল রেকর্ড মুছে ফেলার কার্যক্রম সংঘটিত হয়। জাতীয় তদন্ত কমিটি ২০০৯ সালে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে কল রেকর্ড চেয়েছিল, কিন্তু সেনাসদর, ডিজিএফআই ও বিটিআরসি কেউই তা প্রদান করেনি, সবাই ‘প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা’ অজুহাত দেখিয়েছে। জুনিয়র কর্মকর্তারা ব্যক্তিগতভাবে কিছু সিডিআর সংরক্ষণ করেছিলেন, সেগুলো থেকে কমিশন ভয়ঙ্কর তথ্য উদ্ধার করেছে।

কল রেকর্ড বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভারতের কিছু ফোন নম্বরে বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল, সিঙ্গাপুর থেকেও যোগাযোগ হয়েছে। পিলখানার বিদ্রোহী ও কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তির মধ্যে মোবাইল যোগাযোগ ছিল, যার মধ্যে নাম পাওয়া যায় সাহারা খাতুন, ফজলে নূর তাপস, জাহাঙ্গীর কবির নানক এবং এটিএন বাংলার সাংবাদিক এস এম বাবু। বিদ্রোহীদের একজন ডিএডি তৌহিদ ও জাহাঙ্গীর কবির নানকের মধ্যে যোগাযোগের তথ্যও কমিশন পেয়েছে।

প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, সেই সময় বিদ্রোহীদের ভেতরে একটি অদৃশ্য কাঠামো কাজ করছিল—একটি সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। মোবাইল কল ট্র্যাক করে অফিসারদের অবস্থান শনাক্ত করা হচ্ছিল। কমান্ড সেন্টারের মতো কার্যক্রম চলছিল। ডিজিএফআই কার্যালয়ে স্থাপিত ন্যাশনাল মনিটরিং সেন্টারের প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খোরশেদ আলম মোবাইল নেটওয়ার্ক মনিটর করছিলেন। একই সময় লে. কর্নেল সুলতানুজ্জামান সালেহও মনিটরিং কার্যক্রমে অংশ নেন।

কমিশন প্রকাশ করেছে যে, সিটিসেলের টেকনিক্যাল হেড তানভীর রানা নেটওয়ার্ক বন্ধ করার এবং ডেটা মুছে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ধারণা করা হয়, অন্য কারো নির্দেশেই তিনি এটি করেছিলেন। যেহেতু তিনি দেশের বাইরে ছিলেন, তাই এ ব্যাপারে সাক্ষ্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

সবশেষে প্রতিবেদনে বলা হয়, সেনা তদন্ত আদালত এবং জাতীয় তদন্ত কমিটি কেউই মোবাইল কল রেকর্ড বা সিডিআর সংগ্রহ করেনি এবং এ বিষয়ে সচেতনভাবেই তদন্ত থেকে বিরত থেকেছে। ফলে, আজও এই ঘটনায় অদৃশ্য বিদেশি ও রাজনৈতিক যোগাযোগের রহস্য রয়ে গেছে।

এই প্রতিবেদনটি পিলখানায় ঘটেছিল এমন একটি ভয়ঙ্কর চক্রের চিত্র ফুটিয়ে তোলে, যেখানে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বিদেশি যোগাযোগ এবং দেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর ভেতরের অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সমন্বয় ছিল। এমন পরিস্থিতি প্রমাণ করে, শুধু অস্ত্র নয়, তথ্য ও যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত