প্রকাশ: ০৯ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজনীতি, নির্বাচন ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পথনকশা নিয়ে বিএনপির ঘোষিত সাত দিনব্যাপী আয়োজনে মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর খামারবাড়ির কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে অনুষ্ঠিত হয় এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সভা। অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাষ্ট্র নির্মাণের পরিকল্পনাকে সামনে রেখে আয়োজিত এই আলোচনায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, সাম্প্রতিক একটি নির্বাচনী জরিপে বিএনপির ব্যাপক অগ্রগামিতা প্রকাশ পাওয়ার পর হতাশা থেকে কেউ কেউ ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নিতে পারে। তবে তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, জনগণের ঐক্য ও সচেতনতা যেকোনো ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় যথেষ্ট হবে।
সভা হলে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির শীর্ষ নেতা-কর্মীরা, যারা দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরবর্তী ধাপ সম্পর্কে দলের অভিমত শুনতে ভিড় করেছিলেন। আলোচনা সভায় বক্তৃতাকালে নজরুল ইসলাম খান বলেন, সাম্প্রতিক এক জরিপে প্রশ্ন করা হয়েছিল, আসন্ন নির্বাচনে কোন দল সর্বাধিক আসন পেতে পারে? উত্তরদাতাদের ৬৬ শতাংশ বিএনপির পক্ষে মত দেন। জামায়াতে ইসলামীকে এগিয়ে রেখেছেন ২৬ শতাংশ। বাকি রাজনৈতিক দলগুলো এক শতাংশও সমর্থন পায়নি। এই বিপুল ব্যবধান এবং বিএনপির উর্ধ্বমুখী জনপ্রিয়তা দেখে হতোদ্যম হয়ে কেউ কেউ ষড়যন্ত্রের চেষ্টা করতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, জনগণের মন একবার স্থির হলে তা পরিবর্তন করা কঠিন। আর এই জনগণই ষড়যন্ত্রকারীদের মোকাবিলা করবে। সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে বড় পরিবর্তন এসেছে—একটি ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন—এই পরিবর্তন ঘটেছে জনগণের বলিষ্ঠ অবস্থান ও ঐক্যের মাধ্যমে। নজরুল ইসলাম খান মনে করেন, জনগণ যাদের ঘাড় থেকে ১৫ বছরের বোঝা নামিয়েছে, তারা কোনো ষড়যন্ত্রের কাছে পরাজিত হবে না।
তার বক্তব্যে উঠে আসে ‘এক দফা আন্দোলন’-এর অর্জনের বিষয়টি। তিনি বলেন, নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের মধ্য দিয়েই গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথ শুরু হয়েছে। পূর্ববর্তী সরকারের দমন-পীড়ন, মানবাধিকার লঙ্ঘন, দুর্নীতি ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর রাজনীতি দেশের মানুষের ওপর দীর্ঘকাল যে শৃঙ্খল চাপিয়ে দিয়েছিল, সেই অবস্থার অবসান ঘটেছে। এখন প্রয়োজন কেবল অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তত্ত্বাবধানে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশকে নতুন পথে এগিয়ে নেওয়া।
নজরুল ইসলাম খান তার বক্তৃতায় দেশের অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়েও কথা বলেন। তিনি বলেন, দেশে উন্নয়ন হয়েছে—উঁচু দালানকোঠা, এক্সপ্রেসওয়ে, আধুনিক ট্রেনলাইন, সড়ক অবকাঠামো। কিন্তু উন্নয়নের কেন্দ্রে থাকা জনগণ তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, চিকিৎসা, খাদ্য নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষ বঞ্চিত। তিনি উদাহরণ টানেন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো থেকে, যেখানে দেখা গেছে বাংলাদেশে প্রতিবছর জনসংখ্যার অনুপাতে সর্বাধিক কোটিপতি তৈরি হচ্ছে। কিন্তু একই সময়ে লক্ষাধিক মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে। ফলে সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য দ্রুত বাড়ছে।
তার ভাষায়, “একদিকে কিছু মানুষ কোটিপতি, অন্যদিকে মানুষ দারিদ্রের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এটাকে উন্নয়ন বলে না।” তিনি আরও বলেন, একজন রাজনীতিবিদ একসময় তুলনা করেছিলেন—একটি দরিদ্র, উপার্জনহীন জনগোষ্ঠীর দেশে বড় বড় ভবন নির্মাণ করা মানে গোরস্থানে আলোকসজ্জা করা। বাইরের সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকে মানুষের অন্ধকার বাস্তবতা। এই তুলনা টেনে তিনি বলেন, এ ধরনের উন্নয়ন টেকসই নয়, মানবিকও নয়।
বক্তৃতার শেষাংশে নজরুল ইসলাম খান দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে বিএনপির ভিশন তুলে ধরেন। তিনি বলেন, কেবল উন্নয়নের কথা বললেই হবে না; গুরুত্ব দিতে হবে কীভাবে তা বাস্তবায়ন করা হবে সে বিষয়ে। শিক্ষা সংস্কার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নারীর ক্ষমতায়ন, স্বাস্থ্যসেবা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি—সব ক্ষেত্রেই সুস্পষ্ট নীতিগত পরিকল্পনা থাকা জরুরি। বিএনপি সেই বাস্তবসম্মত লক্ষ্য ও রোডম্যাপ জনগণের সামনে তুলে ধরবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
আলোচনা সভায় বিএনপির নেতারা মনে করেন, দেশের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠনের জন্য এখনই উপযুক্ত সময়। তবে এর জন্য প্রয়োজন সৎ নেতৃত্ব, সঠিক দিকনির্দেশনা এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা। বক্তাদের মতে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন মানুষের মধ্যে নতুন আশা তৈরি করেছে—একটি মুক্ত, সমতাভিত্তিক, জনকল্যাণমুখী ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের আকাঙ্ক্ষা নতুন করে জাগ্রত হয়েছে।
নজরুল ইসলাম খানের বক্তব্যে আরও উঠে আসে, দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে হলে সকল নাগরিকের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, মানবিক অধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, ‘‘আগামী দিনের বাংলাদেশ হবে এমন, যেখানে উন্নয়ন হবে মানুষের জীবনের উন্নয়নের সাথে সামঞ্জস্য রেখে। উন্নয়ন মানে কেবল ইট-পাথরের অবকাঠামো নয়—মানুষের জীবনে শান্তি, নিরাপত্তা, শিক্ষা, চিকিৎসা, এবং অর্থনৈতিক স্বস্তি ফিরিয়ে আনা।’’
দীর্ঘ বক্তৃতার শেষে তিনি বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার চেতনার আলোকে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার এবং জনকল্যাণভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের আহ্বান জানান। তিনি বিশ্বাস করেন, জনগণের শক্তিশালী অবস্থান এবং রাজনৈতিক সচেতনতা দেশের পরিবর্তনকে নিশ্চিত করবে। দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার ইতিহাস স্মরণ করে তিনি বলেন, এখনই সময় নতুন ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার।