প্রকাশ: ০৯ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের জারি করা নতুন নির্দেশনায় রাজধানীর সুপ্রিম কোর্ট ও এর আশপাশের সংবেদনশীল এলাকা যে কোনো ধরনের সভা-সমাবেশ, মিছিল, মানববন্ধন এবং গণজমায়েত থেকে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ১১ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে। জনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে এবং সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ বা ডিএমপি। সুপ্রিম কোর্টকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা ও উত্তেজনা পরিস্থিতিকে অস্থির করে তুলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, আর তাই আগাম সতর্কতা হিসেবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী স্বাক্ষরিত গণবিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সুপ্রিম কোর্টের প্রধান প্রবেশদ্বার, বিচারপতি ভবন, জাজেস কমপ্লেক্স, প্রধান বিচারপতির সরকারি বাসভবন, জামে মসজিদ গেট, মাজার গেট, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ও ট্রাইব্যুনাল-২ এর গেটসহ বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের সামনে যে কোনো ধরনের আন্দোলন বা জনসমাবেশ নিষিদ্ধ থাকবে। বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়, এসব স্থানে কোনোভাবেই সমাবেশ বা রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করা যাবে না।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অর্ডিন্যান্স ১৯৭৬–এর ২৯ ধারার ক্ষমতাবলে এই নির্দেশনা কার্যকর করা হয়েছে, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশকে বিশেষ ক্ষমতা প্রদান করে। সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন দাবিদাওয়া ও প্রতিবাদ কর্মসূচির নামে যেভাবে ঢাকা শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো অবরোধ করা হচ্ছে, তা নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছিল। এসব কারণে সাধারণ মানুষের যাতায়াত বিঘ্নিত হওয়া ছাড়াও আদালত সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছিল।
গণবিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, কেউ যেন যখন-তখন সড়ক অবরোধ করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি না করেন। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি পুনরায় অনুরোধ জানানো হয়। ডিএমপি স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, যেকোনো ধরনের জনসমাগম বা সড়ক অবরোধ বন্ধে তারা কঠোর অবস্থানে থাকবে, কারণ জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, সুপ্রিম কোর্ট এলাকা দেশের বিচারব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু হওয়ায় এখানে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। তাঁরা বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন পক্ষের কর্মসূচি আদালত প্রাঙ্গণের আশপাশে উত্তেজনার সৃষ্টি করেছিল। কিছু সংগঠনের কর্মী সমাবেশ ও শ্লোগান দেওয়ার চেষ্টা করায় সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা দেখা দেয়। ফলে আশঙ্কা ছিল যে পরিস্থিতি আরো অবনতি হতে পারে। এই বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনায় পুলিশ আগাম ব্যবস্থা গ্রহণ করাকে জরুরি মনে করেছে।
সুপ্রিম কোর্টের আশপাশের এলাকা শুধু বিচারিক কার্যক্রমের জন্যই নয়, প্রতিদিন অসংখ্য আইনজীবী, বিচারপ্রার্থী এবং সাধারণ মানুষের সমাগম ঘটে এখানে। এই এলাকায় অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হলে তা দেশের বিচারব্যবস্থার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। এমন পরিবেশে জনসমাবেশ বা মিছিল হলে নিরাপত্তা পরিস্থিতি যে হুমকির মুখে পড়তে পারে, সেটিও গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করেছে ডিএমপি।
অনেকেই মনে করছেন, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও এই সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নানা দাবিতে রাজপথে কর্মসূচি ঘোষণা করছে, যার কারণে আদালত সংলগ্ন এলাকায় মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই পুলিশের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছিল। ফলে এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
ডিএমপি জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকা অবস্থায় কেউ নিয়ম ভঙ্গ করলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তারা স্পষ্ট জানায়, এই নিষেধাজ্ঞা জনস্বার্থে করা হয়েছে এবং জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাদের প্রধান অগ্রাধিকার। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতি নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখবে এবং প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে নিষেধাজ্ঞার ঘোষণার পর বিচারপতি ভবন ও সুপ্রিম কোর্ট এলাকা ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হচ্ছে। অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন, প্রবেশপথে তল্লাশি এবং নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। সাধারণ মানুষের চলাচলে কোনো সমস্যা হবে না, তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিশ্চিত করবে যাতে কেউ এ নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার চেষ্টা না করে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংবেদনশীল এলাকায় নিরাপত্তার স্বার্থে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নতুন নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই সর্বোচ্চ আদালতের আশপাশে সমাবেশ সীমিত রাখার নিয়ম রয়েছে। বাংলাদেশেও পূর্বে অনুরূপ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যদিও বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সমাবেশ-নিষেধাজ্ঞার এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা-সমালোচনা শুরু হতে পারে। কেউ কেউ এটিকে জনস্বার্থ রক্ষার সিদ্ধান্ত মনে করছেন, কেউ কেউ বলছেন রাজনৈতিক উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণের অংশ হিসেবে এটি নেওয়া হয়েছে। তবে ডিএমপি বারবারই বলছে, জনগণের নিরাপত্তা, বিচার কাজের স্বাভাবিকতা এবং জনস্বার্থ রক্ষাই এই সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য।
সব মিলিয়ে সুপ্রিম কোর্ট এলাকায় সব ধরনের সমাবেশ নিষিদ্ধ করার এই সিদ্ধান্ত রাজধানীজুড়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেভাবে আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছে, তাতে বোঝা যাচ্ছে যে তারা পরিস্থিতি কোনোভাবেই অস্থিতিশীল হতে দিতে চায় না। নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা সবসময় সতর্ক রয়েছে। আগামী দিনে এই নিষেধাজ্ঞা কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হয়, তা এখন দেখার বিষয়।