ঋতুপর্ণা চাকমা পেলেন রোকেয়া পদক, ফুটবলে ইতিহাস গড়লেন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৩৬ বার
ঋতুপর্ণা চাকমা রোকেয়া পদক

প্রকাশ: ০৯ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশ নারী ফুটবলের এক উজ্জ্বল তারকা হিসেবে পরিচিত ঋতুপর্ণা চাকমা এবার শুধুই জয় বা ট্রফি নয় — পেয়েছেন দেশের অন্যতম সম্মান, রোকেয়া পদক। ২০২৫ সালের রোকেয়া দিবস উপলক্ষে মঙ্গলবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি “নারী জাগরণ (ক্রীড়া)” বিভাগে এই পুরস্কারে ভূষিত হন। পদকটি তাকে তুলে দেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস।

চারজন কৃতিসন্তান এই বছর রোকেয়া পদকের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন; তাঁদের মধ্যে একজন হিসেবে ফুটবল কোর্টে নিজের প্রতিভা, অধ্যবসায় ও সংগ্রামের দ্বারা সবার নজর কাড়েছেন ঋতুপর্ণা। তবে এই পদকে ভূষিত হওয়া শুধু ব্যক্তিগত সম্মান নয় — বাংলাদেশের নারী ফুটবল জগতের জন্য এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। কারণ, কোনো ফুটবলার এখন পর্যন্ত এই পদক পায়নি; আর সবচেয়ে তরুণ হিসেবে এই পুরস্কার পাওয়া পদকপ্রাপ্তদের মধ্যে তিনি সর্বকনিষ্ঠ।

রোকেয়া পদক হাতে পাওয়া প্রসঙ্গে ঋতুপর্ণা বলেছিলেন, “এটা আমার নয় — পুরো নারী ফুটবল, বিশেষ করে যারা সংগ্রাম করে এগিয়ে আসছে, তাঁরাও প্রাপ্য। এই পদক হয়তো আমার জন্য, তবে এর গুরুত্ব পুরোটাই বাংলাদেশের নারী ক্রীড়াজগতের।” তাঁর চোখে ছিল গর্ব, কৃতজ্ঞতা ও নতুন দায়িত্বের অনুভূতি।

গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের নারী ফুটবল অভূতপূর্ব সাফল্যের মুখ দেখেছে। সম্প্রতি, নারীদের প্রতি ভ্যাকুয়াম ধারণা ভেঙে, প্রথমবারের মতো এশিয়া সেরার আসরে — এশিয়ান কাপ — খেলতে যাচ্ছে তারা। এর আগে, নারী সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে টানা দ্বিতীয়বার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে বাংলাদেশ নারী দল। এই সব অর্জনে ঋতুপর্ণার ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। রোকেয়া পদক দিয়ে সেই অবদানকে দৃষ্টিগোচর করা হলো।

দেশের প্রধান ফুটবল নির্বাহী সংস্থা, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) তাঁর এই অর্জনকে গ্রহণ করেছে আনন্দ ও গর্বের সঙ্গে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে বাফুফে জানায়, “ঋতুপর্ণা চাকমা শুধু একমাত্র নারী ফুটবলার নন — তিনি হয়েছেন ইতিহাস গড়েছেন। রোকেয়া পদক পেয়ে আমরা গর্বিত। আগামী দিনে তার মতো আরো অনেক মেয়ে ফুটবল হবে, ঘর হবে।”

রোকেয়া পদক সাধারণত গঠনমূলক কাজ, সামাজিক উন্নয়ন, নারী স্বাধীনতা ও নারী ক্ষমতায়ন ক্ষেত্রে বিশিষ্ট অবদানের জন্য প্রদান করা হয়। এবার, ক্রীড়াবিভাগেও এই স্বীকৃতি এসেছে — যা দেশের ক্রীড়া ও সমাজ উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। এর মাধ্যমে পরিষ্কার হয়ে গেল, খেলাধুলা শুধু পুরুষের জন্য নয় — নারীরাও তাদের প্রতিভা, অধ্যবসায় ও মনোবল দিয়ে জায়গা করে নিতে পারে, এবং জাতির শ্রেষ্ঠ পুরস্কার অর্জন করতে পারে।

অনেকে বলছেন, ঋতুপর্ণার রোকেয়া পদক পেয়ে ফেলায় ভবিষ্যতে বাংলাদেশি নারী ক্রীড়াবৃন্দের আত্মবিশ্বাস ও স্বীকৃতি আরও বাড়বে। বিশেষ করে যেসব মেয়ে হয়তো পরিবার বা সমাজের মানসিক বাধা-বিপথ, আর্থিক সংকট কিংবা সুযোগের অভাবে খেলাধুলা থেকে সরে গিয়েছিলেন — তাঁরা নতুন উদ্ভুদ্ধ হবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করছেন অনেকে।

ঋতুপর্ণার কাহিনি রয়েছে সংগ্রাম, আবেগ, আত্মবিশ্বাস ও প্রতিভার। ছোটবেলা থেকে ফুটবল খেলার প্রতি আকর্ষণ ছিল। দেশীয় শর্ত, সীমিত সুযোগ, সামাজিক মানসিকতা—সব বাধা সত্ত্বেও কঠোর পরিশ্রম, দৃঢ়নিষ্ঠা ও গভীর ভালোবাসা তাকে এখানে নিয়ে এসেছে। আজ অকপটভাবে বলা যায় — রূপকথার মতো সেই গল্প বাস্তবে রূপ পেয়েছে।

রোকেয়া পদক প্রাপ্তির পর তাঁর মানসিক লাগাম, গর্ব আর প্রত্যাশা এখন আরও গুঙিয়ে উঠেছে। আগামী দিনে তিনি চান শুধু নিজের জন্য নয় — আরও অনেক তরুণীকে ফুটবলে আনতে, নারী ফুটবলকে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার দিকে নিয়ে যেতে। তিনি জানাচ্ছেন, “এই পদক রাজকীয় পুরস্কার নয়; এটি প্রতীক — প্রতীক একটি নতুন বাংলাদেশ, যেখানে মেয়েরাও সম্পূর্ণ সুযোগ পাবে, তাদের প্রতিভা বিকাশ পাবে।”

বাংলাদেশে ফুটবলকে সাধারণত পুরুষদের জগত বলা হয়। কিন্তু ঋতুপর্ণা প্রমাণ করলেন, মেয়েরা পুরুষদের সঙ্গে সমান হতে পারে, নিজেদের পরিচয় তৈরি করতে পারে। এই রোকেয়া পদক শুধু তাঁর জন্য নহে — বাংলাদেশ নারী ফুটবলের জন্য, প্রগতিশীল সমাজের জন্য, এবং ন্যায্য সুযোগের আকাঙ্ক্ষা রাখআদের জন্য।

অনুষ্ঠানে রোকেয়া পদক প্রাপ্তির পর উপস্থিত অতিথিরা, সমাজকর্মী, ক্রীড়াপ্রেমী ও নারী অধিকারকর্মীরা সবাই এক হয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। তাঁদের মতে, এই পদক পুরস্কার জেন্ডার-নিরপেক্ষতা, ক্রীড়া ও সমাজ একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার প্রতীক।

এই পদকের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি বার্তা দিয়েছে — নারী, ক্রীড়া ও সমাজ পরিবর্তনের শক্তি একসঙ্গে মিশে নতুন ইতিহাস লিখতে পারে। আর ঋতুপর্ণা চাকমা সেই বার্তার জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

আশা করা যায়, রোকেয়া পদক প্রাপ্তির এই ঘটনা শুধু বর্তমান প্রজন্মের জন্য নয়, আগামী প্রজন্মের মেয়েদের জন্য প্রেরণা হয়ে দাঁড়াবে। তাদের স্বপ্ন, তাদের খেলাধুলা, তাঁদের মর্যাদা — সব কিছুই কেবলই সম্ভব।

ঋতুপর্ণা বললেও হয়তো ছোট এক পরিবারে জন্মেছেন, তবে আজ তার অর্জন পুরোটাই জাতীয়। তাঁর সংগ্রাম, ধৈর্য ও প্রতিভা আজকে পেয়েছে জাতির সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা। রোকেয়া পদকের মাধ্যমে বাংলাদেশ নারী ক্রীড়াকে দিয়েছে নতুন সন্মান; আর রোকেয়া পদকপ্রাপ্তি যাত্রা হয়ে উঠেছে একটি নতুন ফুটবলের, নতুন স্বপ্নের সূচনা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত