প্রকাশ: ০৯ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে চলমান অস্থিরতা, মতপার্থক্য এবং ক্ষমতার লড়াইয়ের মধ্যেই বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সতর্কতার সুর তুললেন চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানকে সামনে রেখে। সেই অভ্যুত্থানের প্রাণপাত সংগ্রাম—যার পটভূমিতে জন্ম নিয়েছে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা—তার ত্যাগ যেন কোনো অবস্থাতেই ভ্রান্ত পথে নষ্ট হয়ে না যায়, সেই আহ্বান জানালেন তিনি। শুধু রাজনৈতিক অবস্থান নয়, দেশের ভবিষ্যৎ ও গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার কথা মাথায় রেখে তিনি বললেন, মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক; কিন্তু সেটি যেন অর্জিত বিজয়কে বিপন্ন না করে।
মঙ্গলবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ এবং তার স্ত্রী সালমা আলো রচিত বইসমূহের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তিনি তাঁর বক্তব্যে বর্তমান রাজনৈতিক বিভাজন অতিক্রম করার প্রয়োজনীয়তা জোরালোভাবে তুলে ধরেন। সেই অনুষ্ঠানে তার বক্তব্য শুধু আনুষ্ঠানিক ছিল না; তাতে ছিল দেশের গণতান্ত্রিক आंदोलन এবং ভবিষ্যত রাজনৈতিক অগ্রযাত্রা নিয়ে গভীর উদ্বেগ ও প্রত্যাশা। ফখরুল জানান, যে ক্ষণজন্মা সংগ্রাম এবং জনগণের শক্তির বিস্ফোরণ ঘটেছিল চব্বিশের অভ্যুত্থানে, তার ভিত্তিকে শক্তিশালী করতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার ভুল বোঝাবুঝি ও মতপার্থক্য যেন বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।
তিনি বলেন, “রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকতেই পারে। এটি রাজনীতির স্বাভাবিক গতি। কিন্তু এই মতপার্থক্য যাতে অভ্যুত্থানের অর্জনকে ব্যর্থ করে না দেয়, সেটি নিশ্চিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব। দেশের মানুষ গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে বিজয় ছিনিয়ে এনেছে, সেটিকে সুসংহত করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।” তার কণ্ঠে ছিল সতর্কবার্তা, আবার একইসঙ্গে ছিল আশাবাদ—ঐক্যের মধ্য দিয়েই রাজনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে পাওয়া সম্ভব।
অনুষ্ঠানে ফখরুল বিশেষভাবে স্মরণ করেন লেখক, চিন্তাবিদ ও অর্থনীতিবিদ ড. মাহবুব উল্লাহকে। বিএনপির উন্নয়নভিত্তিক রাষ্ট্রকাঠামো গঠনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হিসেবে ঘোষিত ‘ভিশন ২০৩০’-এর মূল কাঠামো ও ধারণা প্রণয়নের পেছনে ড. মাহবুব উল্লাহর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তুলে ধরেন তিনি। ফখরুল জানান, জাতির সামনে বিএনপি যখন ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনার রূপরেখা উপস্থাপন করছিল, তখন সেই পরিকল্পনার মূল নির্যাস দাঁড় করানোর কাজটি অত্যন্ত দক্ষতা ও মনোযোগের সঙ্গে করেছেন মাহবুব উল্লাহ। তাই আজকের প্রজন্মের রাজনৈতিক ভিশন, দেশের ভবিষ্যৎ এবং গণতান্ত্রিক পথচলার সূত্রধর হিসেবে তাকে আলাদা করে মনে রাখার মতোই অবদান রয়েছে।
তাঁর মতে, মাহবুব উল্লাহ শুধু রাজনৈতিক চিন্তাবিদই নন—তিনি আধুনিক রাষ্ট্র গঠন, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার, শক্তিশালী গণতন্ত্র, সমতা এবং জনগণের ক্ষমতায়ন বিষয়ে এমন সব ভাবনা তুলে ধরেছিলেন, যা আজও বাংলাদেশের রাজনীতিকে পথ দেখায়। তাঁর স্ত্রী সালমা আলোও একইভাবে সাহিত্য, রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতির বিভিন্ন সত্য উচ্চারণের মধ্য দিয়ে দেশের বৌদ্ধিক সমাজে এক বিশেষ ইতিবাচক ভূমিকা রেখে চলেছেন। তাঁদের যৌথ সৃজনকে সম্মান জানানোই ছিল জাতীয় প্রেস ক্লাবের এই আয়োজন।
বিএনপি মহাসচিব তাঁর বক্তব্যে আরও বলেন, দেশের বর্তমান বাস্তবতায় গণঅভ্যুত্থানের বিজয়ের সুফল সর্বস্তরে নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। তিনি মনে করিয়ে দেন, গণঅভ্যুত্থান কখনো কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটায় না; এটি সামাজিক সচেতনতা, রাজনৈতিক অধিকার এবং গণমানুষের চেতনাকে মুক্ত করে দেয়। তাই এটি কোনো দলের একক সম্পদ নয়; বরং এটি গোটা জাতির বিজয়, যা রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টায় সুরক্ষিত রাখা প্রয়োজন।
মির্জা ফখরুল আরও ইঙ্গিত দেন বর্তমান রাজনৈতিক বিভাজনের দিকে, যা অল্প অল্প করে সমাজের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়ছে। তাঁর মতে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা বিদ্বেষ নয়, বরং সহিষ্ণুতাই রাজনৈতিক সংস্কৃতি গঠনে সহায়ক। তিনি মনে করেন, দেশের গণতন্ত্র রক্ষায় ও রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠায় দলমত-নির্বিশেষে সবারই দায়িত্ব রয়েছে। তাই তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানান, ব্যক্তিগত মতবিরোধ, কৌশলগত পার্থক্য বা আদর্শগত দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে একত্র হওয়া জরুরি।
ফখরুল বলেন, “গণঅভ্যুত্থান শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটায়নি, এটি সাধারণ মানুষের দুর্দমনীয় ইচ্ছাশক্তির প্রতীক। তাই আমরা যেন সেই শক্তিকে কখনো ভুলে না যাই। আমাদের ত্যাগ, আমাদের কষ্ট, জনগণের প্রত্যাশা—এসব যেন কোনো ভুল সিদ্ধান্তের কারণে বিপথে না যায় তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।”
তিনি দেশের গণতন্ত্র, রাজনৈতিক ন্যায্যতা ও জনগণের মৌলিক অধিকারের প্রশ্নটি নতুন করে সামনে নিয়ে আসেন। তাঁর মতে, গণঅভ্যুত্থানের সময় যে জনজোয়ার দেখা গিয়েছিল, তা দেশের মানুষকে এক হয়েছিল। আজ সেই একই ঐক্যের প্রয়োজন আগের চেয়ে আরও বেশি, যাতে রাষ্ট্র পরিচালনা, ন্যায়বিচার, শক্তিশালী সংসদীয় ব্যবস্থা এবং জনগণের অধিকার সুরক্ষিত থাকে।
অনুষ্ঠানে আগত শিক্ষাবিদ, গবেষক, লেখক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরাও ফখরুলের কথায় একাত্মতা প্রকাশ করেন। অনেকেই বলেন, মতপার্থক্য থাকলেও তা যদি গণতন্ত্রকে সুসংহত করে, তবে তাতে কোনো ক্ষতি নেই; বরং এটি গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করে। কিন্তু যখন ব্যক্তিগত বিদ্বেষ বা রাজনৈতিক স্বার্থ চেতনাকে বিভাজিত করে দেয়, তখনই বিপদ দেখা দেয়। তাই চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের সামনে যে পরিবর্তন এসেছে, তাকে স্থায়ী করতে রাজনৈতিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বের মধ্যে সমন্বিত প্রচেষ্টার বিকল্প নেই।
মির্জা ফখরুলের বক্তব্য শুধু রাজনৈতিক ডাক নয়, বরং এটি ছিল একটি সতর্ক বার্তা—গণঅভ্যুত্থানের চেতনা রক্ষা করতে হলে আগামী দিনে আরো দায়িত্বশীলতা, ঐক্য এবং পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা প্রয়োজন। আর এই পথেই হয়তো বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে পারবে একটি সহিষ্ণু, গণতান্ত্রিক ও অধিকারের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা রাষ্ট্রের দিকে।