গাজায় গণহত্যায় বহু রাষ্ট্রের সহায়তার অভিযোগ তুললেন আলবানিজ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৪৭ বার
গাজায় গণহত্যায় বহু রাষ্ট্রের সহায়তার অভিযোগ আলবানিজের

প্রকাশ: ১০ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

গাজায় দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলমান ইসরাইলি আগ্রাসন নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার ঝড় তুলেছেন জাতিসংঘের ফিলিস্তিনবিষয়ক বিশেষ দূত ফ্রান্সেস্কা আলবানিজ। তার বক্তব্য অনুযায়ী, এই যুদ্ধ শুধুমাত্র ইসরাইলের একক সিদ্ধান্তের ফল নয়; বরং বিভিন্ন রাষ্ট্রের নানামুখী সহায়তা ও প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ ভূমিকা গাজায় গণহত্যাকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, গাজার মাটিতে যে ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ চলছে, তার দায় শুধু ইসরাইলের নয়, বরং সেই সব রাষ্ট্রেরও, যারা এই সহিংসতাকে সামরিক ও কূটনৈতিকভাবে সমর্থন দিচ্ছে।

সোমবার সামাজিকমাধ্যম এক্সে দেয়া জরুরি বার্তায় ফ্রান্সেস্কা আলবানিজ জানান, দোহা ফোরামে তিনি গাজার গণহত্যার বিরুদ্ধে জোরালো বক্তব্য দিয়েছেন। সেখানে তিনি বলেন, ইসরাইল বহু রাষ্ট্রের সহায়তায় ধারাবাহিকভাবে গাজায় গণহত্যা চালিয়েছে, এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ব্যর্থতা এই হত্যাযজ্ঞকে আরো দীর্ঘায়িত করেছে। তার ভাষায়, “ইসরাইলি গণহত্যা বহু রাষ্ট্রের সহযোগিতায় পরিচালিত হয়েছে—এটা আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন। যেসব রাষ্ট্র বহুপাক্ষিকতার শেষ সুতাটুকু আঁকড়ে ধরে আছে, তাদের এখনই নতুন জোট গড়ে তুলতে হবে।”

তিনি যে নতুন জোটের কথা বলেছেন, তা মূলত নিপীড়ন প্রতিরোধে বৈশ্বিকভাবে একটি ঐক্যবদ্ধ অবস্থান গঠনের আহ্বান হিসেবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। আলবানিজ মনে করেন, বিশ্বের বড় শক্তি ও কূটনৈতিক ক্ষমতার বাহক দেশগুলোর নীরবতা বা নির্লিপ্ততা গণহত্যাকে আরও দীর্ঘায়িত করছে। একইসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, নির্যাতিতদের পক্ষে দাঁড়ানোর বদলে অনেক রাষ্ট্র ইসরাইলকে বস্তুগত সহায়তা, অস্ত্র সরবরাহ, কূটনৈতিক নিরাপত্তা এমনকি কিছু ক্ষেত্রে সক্রিয় সমর্থন দিয়েছে।

গত অক্টোবর মাসে “গাজা গণহত্যা : একটি সম্মিলিত অপরাধ” শিরোনামে তিনি যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেন, তাতে উঠে আসে ভয়াবহ তথ্য। সেখানে বলা হয়, তৃতীয় রাষ্ট্রগুলো শুধু ইসরাইলি সামরিক কার্যক্রমকে সমর্থনই করেনি, বরং কিছু ক্ষেত্রে এই যুদ্ধে অংশগ্রহণও করেছে। ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গাজায় সংঘটিত হত্যাযজ্ঞ আন্তর্জাতিক আইনে ‘সম্মিলিত দায়বদ্ধতার অপরাধ’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। যেসব রাষ্ট্র ইসরাইলকে বৈধতা দিয়েছে, তাদের প্রতিও আন্তর্জাতিক আদালত ও আইনি ব্যবস্থার কঠোর নজর দেওয়া উচিত—এমন মন্তব্যও করেছেন তিনি।

ইসরাইলি হামলায় এখন পর্যন্ত নিহত হয়েছে প্রায় ৭০ হাজার ফিলিস্তিনি, যাদের মধ্যে অধিকাংশই নারী ও শিশু। গাজার অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে, হাসপাতাল, স্কুল, আশ্রয়কেন্দ্র ও বাজারে বোমাবর্ষণে জনপদ পরিণত হয়েছে ধ্বংসস্তূপে। লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, খাবার ও চিকিৎসা সংকটে মানবিক পরিস্থিতি পৌঁছেছে ভয়াবহতম স্তরে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘ ও ভয়াবহ অবরোধের শিকার হচ্ছে গাজা।

এই পরিস্থিতিতে দক্ষিণ আফ্রিকা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) ইসরাইলের বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলা করে, যেখানে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরাইলকে অভিযুক্ত করা হয়। তবে আইসিজের অন্তর্বর্তী আদেশে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানানো হলেও বাস্তব পরিস্থিতিতে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। চলতি বছরের ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও তা কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। ইসরাইল প্রতিদিনই হামলা চালাতে থাকে, ফলে যুদ্ধবিরতির প্রথম ৫০ দিনেই নিহত হয় আরও ৩৫৭ ফিলিস্তিনি।

গাজার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের দায়িত্বহীনতা এবং নীরব ভূমিকা আলবানিজকে ক্ষুব্ধ করেছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, মানবতার টিকে থাকাই যখন প্রশ্নের মুখে, তখন রাজনৈতিক কূটনীতির আশ্রয়ে বসে থাকার সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত এখনই গণহত্যা বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া এবং ইসরাইলকে যুদ্ধাপরাধের জবাবদিহির আওতায় আনা।

বিশ্লেষকদের মতে, আলবানিজের বক্তব্য শুধুমাত্র রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং যুদ্ধাপরাধ প্রতিরোধের বৈশ্বিক কাঠামোর ওপর নতুন করে আলো ফেলেছে। তার মন্তব্য প্রমাণ করে, গাজায় যে মানবিক বিপর্যয় চলছে তা সমাধানে বিশ্ব শক্তিগুলোর নিষ্ক্রিয়তা ভবিষ্যতে আরও গভীর সংকট ডেকে আনতে পারে।

গাজায় মানবিক পরিস্থিতির অবনতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা বারবার সতর্ক বার্তা দেওয়ার পরও কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। খাদ্য, পানি ও ওষুধের ঘাটতি প্রতিদিনই বাড়ছে, শিশুমৃত্যুর হার ভয়াবহভাবে বাড়ছে। হাসপাতালগুলো কার্যত বিপর্যস্ত অবস্থায়, রোগীরা চিকিৎসার অভাবে মারা যাচ্ছেন। এর মধ্যেই চলতে থাকা বোমাবর্ষণে মানুষ নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পাচ্ছে না।

এই পরিস্থিতিতে ফ্রান্সেস্কা আলবানিজের মতো কণ্ঠস্বরগুলো আন্তর্জাতিক মহলে নতুন চাপ তৈরি করছে। তিনি কেবল একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি নয়, বরং স্থায়ী শান্তি নিশ্চিতে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর প্রতি কঠোর আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, নীরবতা আর নিরপেক্ষতা এই পরিস্থিতিতে অপরাধের সমান। গাজার মানুষকে বাঁচাতে বিশ্বকে এখনই ঐক্যবদ্ধ হতে হবে—এটাই তার মূল বার্তা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত