দুই ছাত্র উপদেষ্টার পদত্যাগে নির্বাচন আগে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৪৩ বার
দুই ছাত্র উপদেষ্টার পদত্যাগ

প্রকাশ: ১১ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

অন্তর্বর্তী সরকারের দুই গুরুত্বপূর্ণ ছাত্র উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং মাহফুজ আলম পদত্যাগ করেছেন। জাতীয় সংসদের ত্রয়োদশ নির্বাচনকে সামনে রেখে তারা রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন এবং তা গৃহীত হয়। আগামীকাল তফসিল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের পদত্যাগ কার্যকর হবে। এক সময় গণঅভ্যুত্থানের চেহারা বদলে দেওয়া ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব থেকে ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসা এই দুই তরুণের পদত্যাগ দেশের রাজনীতিতে নতুন প্রশ্ন এবং সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনীতি নতুন মোড় নেয়। দীর্ঘদিনের স্বৈরাচারী শাসন পতনের পর ৮ আগস্ট ড. ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। সেই সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে স্থান পান নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ এবং বিশেষ সহকারী হিসেবে যোগ দেন মাহফুজ আলম। পরে নাহিদ দলীয় রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার লক্ষ্যে ফেব্রুয়ারিতে পদত্যাগ করেন। এবার পদত্যাগ করলেন বাকি দুই ছাত্র উপদেষ্টা। এর ফলে উপদেষ্টা পরিষদে আর কোনো ছাত্র প্রতিনিধি থাকল না। সরকারের মোট উপদেষ্টার সংখ্যা কমে ২৩ জন থেকে দাঁড়াল ২১ জনে।

দুই তরুণ উপদেষ্টার পদত্যাগের সময়টিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন। কারণ পরবর্তী সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হওয়ার আগ মুহূর্তে তাদের এই সিদ্ধান্ত একদিকে সরকারে শূন্যস্থান তৈরি করেছে, অন্যদিকে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আসিফ এরই মধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন যে তিনি নির্বাচন করবেন। যদিও তিনি কোন দল থেকে প্রার্থী হবেন তা এখনো চূড়ান্ত করেননি। তিনি জানিয়েছেন, এখনো কিছু বলা সম্ভব নয় এবং সময়ের সঙ্গে সিদ্ধান্ত জানাবেন। তার সম্ভাব্য আসন হিসেবে আলোচনা হচ্ছে ঢাকা-১০, যেখানে সম্প্রতি তিনি তার ভোটার পরিচয় কুমিল্লা থেকে স্থানান্তর করেছেন।

অন্যদিকে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করা মাহফুজ আলমও নির্বাচন করতে ইচ্ছুক বলে ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে। তিনি লক্ষ্মীপুর-১ (রামগঞ্জ) আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চান। দুজনের পক্ষেই এখনো রাজনৈতিক দল নির্ধারিত হয়নি। তবে তাদের ছাত্র আন্দোলনের সময়কার সংগঠন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এখনো এই দুই আসনে কোনো মনোনয়ন ঘোষণা করেনি, যা রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা জল্পনা তৈরি করেছে। অন্যদিকে নাহিদ ইসলাম এনসিপির আহ্বায়ক হিসেবে ঢাকা-১১ আসনে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন।

এক বছরেরও বেশি সময় দায়িত্ব পালন করে আসিফ এবং মাহফুজ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ লাভ করেছেন। আসিফ প্রাথমিকভাবে শ্রম মন্ত্রণালয় এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। পরে তাকে দেওয়া হয় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। অন্যদিকে মাহফুজ প্রথমে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং গত ফেব্রুয়ারিতে নাহিদ পদত্যাগ করলে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। দুজনই দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় বেশ গুরুত্বের সঙ্গে দপ্তর পরিচালনা করেছেন বলে সরকারি সূত্র জানায়।

তাদের পদত্যাগ প্রসঙ্গে যমুনার সামনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, তারা বিকাল পাঁচটায় পদত্যাগপত্র জমা দেন এবং প্রধান উপদেষ্টা তা গ্রহণ করেন। তিনি বলেন, তফসিল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে এই পদত্যাগ কার্যকর হবে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার আগামীকাল সন্ধ্যা ছয়টায় জাতির উদ্দেশে ভাষণের মাধ্যমে তফসিল ঘোষণা করবেন বলেও তিনি জানান। তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের বিষয়ে কোনো বিভ্রান্তি ছড়ানোর প্রয়োজন নেই। নির্বাচন ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে অনুষ্ঠিত হবে এবং প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন।

পদত্যাগপত্র গ্রহণের সময় প্রধান উপদেষ্টা দুই তরুণ নেতাকে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী দেশের সবচেয়ে বড় গণ-আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি বলেন, তারা যে সাহসিকতার সঙ্গে স্বৈরাচারী শাসন থেকে দেশকে মুক্তির পথে ভূমিকা রেখেছেন, জাতি তা স্মরণ রাখবে। ভবিষ্যতেও তারা গণতান্ত্রিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখবেন বলে প্রধান উপদেষ্টা আশা প্রকাশ করেন।

একই সময়ে সমালোচনা ও বিতর্কও ঘনীভূত হচ্ছে। এনসিপি থেকে পদত্যাগ করা দক্ষিণাঞ্চলের সাবেক সমন্বয়ক মুহাম্মদ রাকিব দুই ছাত্র উপদেষ্টার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে তদন্ত দাবি করেছেন। তিনি জানান, পদত্যাগের সঙ্গে সঙ্গে দুদক যেন তদন্ত শুরু করে, না হলে তারা আন্দোলনে নামবেন। গত এপ্রিলে আসিফের একান্ত সচিব মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর তাকে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং দুদক তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে। এই প্রসঙ্গেও নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।

এদিকে গতকাল বিকেলে নিজ দপ্তরে সংবাদ সম্মেলনে আসিফ মন্ত্রণালয়ের দেড় বছরের উন্নয়ন কার্যক্রম তুলে ধরে বলেন, তিনি নির্বাচন করবেন এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা রাখেন। কোন দল থেকে করবেন—এ প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গিয়ে তিনি বলেন, এখনো নিশ্চিত নন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর বাকস্বাধীনতা ফিরে এসেছে এবং এই সময়কালে অর্জিত অভিজ্ঞতা তার ভবিষ্যৎ জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

মাহফুজ তবে এখনো জনসম্মুখে কিছু বলেননি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বে দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি নতুন রূপ পেতে পারে। তারা নির্বাচনে প্রার্থী হলে তরুণ ভোটারদের একটি বড় অংশ তাদের পাশে দাঁড়াতে পারে। তবে একই সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে চলমান অভিযোগ সমাধান না হলে তা বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

দুই ছাত্র উপদেষ্টার পদত্যাগে সরকারের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় উপদেষ্টাশূন্য হয়ে গেছে। এখন কার হাতে এসব দায়িত্ব যাবে তা নিয়ে সরকারের ভেতরে আলোচনা চলছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই প্রধান উপদেষ্টা নতুন উপদেষ্টার নাম ঘোষণা করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

দেশের রাজনীতিতে দ্রুত পাল্টে যাওয়া পরিস্থিতির এই মুহূর্তে আসিফ ও মাহফুজের পদত্যাগ নির্বাচনকে ঘিরে নতুন সমীকরণ তৈরি করবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তারা কি স্বতন্ত্র প্রার্থী হবেন নাকি কোনো বৃহৎ রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হবেন—সেটিই এখন পর্যবেক্ষকদের প্রধান আগ্রহের বিষয়। পুরো দেশ যখন নির্বাচনী আমেজে ভাসছে, তখন তরুণ নেতৃত্বের এই উদাহরণ নতুন প্রজন্মের রাজনীতিতে অংশগ্রহণের অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে বলেই অনেকের বিশ্বাস।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত