বিজয় দিবসে সাতকানিয়ায় যুবকদের অংশগ্রহণে জামায়াতের র‍্যালি

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৫৬ বার
বিজয় দিবসে সাতকানিয়ায় যুবকদের অংশগ্রহণে জামায়াতের র‍্যালি

প্রকাশ: ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত যুব র‍্যালি স্থানীয় রাজনীতি ও সামাজিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে। জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে কয়েক হাজার নেতাকর্মীর অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এই কর্মসূচিকে ঘিরে এলাকায় সকাল থেকেই উৎসবমুখর পরিবেশ লক্ষ্য করা যায়। বিজয়ের ৫৪ বছরেরও বেশি সময় পর দাঁড়িয়ে এ ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচি একদিকে যেমন দলীয় অবস্থান ও বক্তব্য তুলে ধরছে, তেমনি অন্যদিকে তরুণ সমাজের রাজনৈতিক সচেতনতা ও অংশগ্রহণের দিকটিও সামনে আনছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মঙ্গলবার ১৬ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে ৯টায় সাতকানিয়ার কেরানীহাট এলাকার সী-ওয়ার্ল্ড রেস্টুরেন্টের সামনে থেকে র‍্যালিটি শুরু হয়। সকাল থেকেই বিভিন্ন উপজেলা ও আশপাশের এলাকা থেকে নেতাকর্মীরা সেখানে জড়ো হতে থাকেন। জাতীয় পতাকা, ব্যানার ও ফেস্টুনে সাজানো র‍্যালিতে দলীয় স্লোগানের পাশাপাশি বিজয় দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরা নানা বার্তা শোনা যায়। র‍্যালিটি চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়ক ধরে কয়েক কিলোমিটার অগ্রসর হয়ে ‘হাসমতের দোকান’ নামে পরিচিত এলাকায় গিয়ে শেষ হয়। কর্মসূচি চলাকালে সড়কের একটি অংশে যান চলাচল কিছুটা ধীর হলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তত্ত্বাবধানে পরিস্থিতি ছিল নিয়ন্ত্রিত এবং শান্তিপূর্ণ।

র‍্যালির আগে অনুষ্ঠিত সংক্ষিপ্ত সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য, জাতীয় সংসদের সাবেক প্যানেল স্পিকার ও হুইপ শাহজাহান চৌধুরী। তার বক্তব্যে বিজয় দিবসের ঐতিহাসিক গুরুত্বের পাশাপাশি বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থা, ন্যায়বিচার ও যুবসমাজের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়। তিনি বলেন, মহান বিজয় দিবস শুধু একটি ঐতিহাসিক দিন নয়, এটি বাঙালির জাতীয় আত্মপরিচয়ের ভিত্তি। এই দিন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, অন্যায়, জুলুম ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম ছাড়া কোনো জাতির প্রকৃত মুক্তি সম্ভব নয়।

শাহজাহান চৌধুরী তার বক্তব্যে স্বাধীনতার পরবর্তী দীর্ঘ সময়ের বাস্তবতার দিকেও ইঙ্গিত করেন। তিনি বলেন, স্বাধীনতার ৫৪ বছর অতিক্রান্ত হলেও সাধারণ মানুষ আজও ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও সুশাসনের অভাব অনুভব করছে। তার মতে, রাষ্ট্র পরিচালনায় যদি ন্যায়নীতি ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হয়, তাহলে বিজয়ের অর্থ কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থেকে যায়। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে জবাবদিহি ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা জরুরি বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

যুবসমাজের ভূমিকা প্রসঙ্গে শাহজাহান চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশই তরুণ। এই শক্তিকে সঠিক পথে পরিচালিত করা গেলে দেশ দ্রুত একটি কল্যাণরাষ্ট্রে রূপ নিতে পারে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, নৈতিকতা ও আদর্শ থেকে বিচ্যুতি ঘটলে এই শক্তিই সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। তাই তরুণদের সততা, শৃঙ্খলা, নৈতিকতা ও দেশপ্রেমে গড়ে তোলার ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন।

তিনি আরও বলেন, জামায়াতে ইসলামী এমন একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখে, যেখানে কোনো বৈষম্য থাকবে না, আইনের শাসন কার্যকর থাকবে এবং মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হবে। বিজয় দিবসের এই দিনে তার আহ্বান ছিল—একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ার সংগ্রামে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। তার বক্তব্যে রাজনৈতিক দর্শনের পাশাপাশি একটি আদর্শিক অবস্থান স্পষ্টভাবে উঠে আসে, যা উপস্থিত নেতাকর্মীদের মধ্যে সাড়া ফেলেছে।

সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা জামায়াতের আমীর অ্যাডভোকেট আনোয়ারুল আলম চৌধুরী। সভাপতির বক্তব্যে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের মূল লক্ষ্য ছিল একটি স্বাধীন, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। সেই লক্ষ্য অর্জনে রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষেরও দায়িত্ব রয়েছে। তিনি বলেন, বিজয় দিবস শুধু উদযাপনের দিন নয়, এটি আত্মসমালোচনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনারও দিন। তরুণ সমাজকে দায়িত্বশীল ও সচেতন ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।

র‍্যালিতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের জামায়াতে ইসলামী এবং ছাত্রশিবিরের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। অংশগ্রহণকারীদের বড় একটি অংশ ছিল তরুণ ও যুবক। অনেকেই জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে বিজয় দিবসের স্লোগান দেন এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেন। কয়েকজন অংশগ্রহণকারী বলেন, তারা বিজয় দিবসকে শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চান না; বরং এই দিনটি থেকে নিজেদের নাগরিক দায়িত্ব ও দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবতে চান।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও এই কর্মসূচি নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ এটিকে রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে দেখলেও অনেকেই মনে করছেন, বিজয় দিবসে তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ সমাজে একটি বার্তা দেয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলই তরুণ সমাজকে কেন্দ্র করে কর্মসূচি জোরদার করছে। কারণ ভবিষ্যৎ রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনায় এই প্রজন্মের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

বিজয় দিবসের মতো একটি ঐতিহাসিক দিনে সাতকানিয়ায় অনুষ্ঠিত এই যুব র‍্যালি তাই শুধু একটি দলীয় আয়োজন হিসেবে নয়, বরং বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটের অংশ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। স্বাধীনতার দীর্ঘ পথচলার পর বাংলাদেশ কোন পথে এগোবে, রাষ্ট্র ও সমাজে ন্যায়বিচার ও সুশাসনের প্রশ্ন কীভাবে সামনে আসবে—এই সব আলোচনার মধ্যেই কর্মসূচিটি সম্পন্ন হয়।

সব মিলিয়ে, বিজয় দিবসে সাতকানিয়ায় আয়োজিত জামায়াতে ইসলামের যুব র‍্যালি স্বাধীনতার চেতনা, তরুণ সমাজের ভূমিকা এবং ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের দাবিকে নতুন করে সামনে এনেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ধরনের কর্মসূচি জাতীয় রাজনীতি ও সামাজিক চিন্তাধারায় কী প্রভাব ফেলে, সেটিই এখন পর্যবেক্ষণের বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত