তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন ঘিরে বিএনপির প্রস্তুতির পূর্ণচিত্র

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৭ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৫৫ বার
তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন ঘিরে বিএনপির প্রস্তুতির পূর্ণচিত্র

প্রকাশ: ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দীর্ঘ ১৮ বছরের নির্বাসিত জীবন শেষে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা ও কৌতূহল তৈরি হয়েছে। দলীয় সূত্রগুলো বলছে, আগামী ২৫ ডিসেম্বর তিনি ঢাকায় ফিরবেন—এই সম্ভাব্য সময়কে সামনে রেখে বাসভবন, অফিস ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা এবং সাংগঠনিক কর্মসূচিসহ সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। একই সঙ্গে ঘোষিত হয়েছে নতুন রাজনৈতিক কর্মসূচি ‘আমার ভাবনায় বাংলাদেশ’, যা দলটির ভাষায় জনগণের ভাবনা ও অংশগ্রহণকে রাষ্ট্রচিন্তায় যুক্ত করার একটি উদ্যোগ।

বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঢাকায় ফিরলে তারেক রহমান গুলশান অ্যাভিনিউর ১৯৬ নম্বর বাসায় অবস্থান করবেন। এটি এমন একটি বাসভবন, যার ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে বিএনপি ও জিয়া পরিবারের রাজনৈতিক জীবনে। ওই বাসার পাশেই ভাড়া করা বাসা ‘ফিরোজা’-য় বর্তমানে বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া অবস্থান করছিলেন। দলীয় নেতারা বলছেন, এই নিকটবর্তী অবস্থান সাংগঠনিক সমন্বয় ও পারিবারিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও সহায়ক হবে।

শুধু বাসভবন নয়, দলীয় কার্যালয়গুলোতেও তারেক রহমানের জন্য আলাদা পরিসরে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। গুলশানে চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের জন্য পৃথক চেম্বার প্রস্তুত করা হয়েছে। একইভাবে নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়েও তার জন্য আলাদা চেম্বার তৈরি করা হয়েছে, যেখানে দলীয় নীতিনির্ধারণী বৈঠক ও সাংগঠনিক সমন্বয় কার্যক্রম পরিচালিত হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। পাশাপাশি আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গুলশানে আরেকটি বাসা ভাড়া নেওয়া হয়েছে, যেখান থেকে নির্বাচনি কৌশল ও সমন্বয় কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।

সরেজমিন পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, গুলশান অ্যাভিনিউর ১৯৬ নম্বর বাসার নিরাপত্তা ব্যবস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে জোরদার করা হয়েছে। বাড়ির সামনে স্থাপন করা হয়েছে নিরাপত্তা ছাউনি, আশপাশের সড়কে বসানো হয়েছে সিসিটিভি ক্যামেরা। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মীরা জানিয়েছেন, তারেক রহমান সেখানে অবস্থান করবেন বলেই আগাম সতর্কতার অংশ হিসেবে এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সম্ভাব্য জনসমাগম বিবেচনায় নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলেও তারা উল্লেখ করেন।

এই বাসভবনটি ঘিরে রয়েছে একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারের মন্ত্রিসভার সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে বাড়িটি খালেদা জিয়াকে বরাদ্দ দেওয়া হয়। সাম্প্রতিক সময়ে গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান এবং রাজউক চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলাম রিজু বাড়িটির দলিলপত্র বিএনপি চেয়ারপারসনের কাছে হস্তান্তর করেন। দলীয় নেতাদের মতে, এই আনুষ্ঠানিকতা ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে দলের ভেতরে যেমন সাংগঠনিক প্রস্তুতি চলছে, তেমনি রাজনৈতিক বার্তাও স্পষ্ট করার চেষ্টা করছে বিএনপি। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, দেশের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে তাদের প্রিয় নেতার অপেক্ষায় রয়েছে। তার ভাষায়, সেদিন দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মী তাকে অভ্যর্থনা জানাবেন। তিনি জানান, এই উপলক্ষে গত সোমবার গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের যৌথ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে সাংগঠনিক দিকনির্দেশনা ও শৃঙ্খলা রক্ষার বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়।

রাজনৈতিক প্রস্তুতির পাশাপাশি নতুন কর্মসূচির ঘোষণাও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে সামনে রেখে ‘আমার ভাবনায় বাংলাদেশ’ নামে একটি কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহাদী আমীন। তিনি জানান, এই কর্মসূচির আওতায় একটি জাতীয় রিল মেকিং প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হচ্ছে, যা শুরু হয়েছে এবং চলবে ২৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত। উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হচ্ছে, দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে সাধারণ মানুষের ভাবনা ও প্রত্যাশাকে একটি সৃজনশীল মাধ্যমে তুলে ধরা।

এই প্রতিযোগিতায় দেশে ও বিদেশে অবস্থানরত সব শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নিতে পারবেন। এক মিনিটের রিল ভিডিওর মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজেদের চিন্তা, পরিকল্পনা ও প্রত্যাশা তুলে ধরতে পারবেন। ভিডিওতে বক্তব্য, স্যাটায়ার, গান, সংলাপ, ডকুমেন্টারি, অ্যানিমেশন কিংবা ছবি ও শিল্পকর্মের সমন্বয় করা যাবে বলে জানানো হয়েছে। আয়োজকদের ভাষায়, এটি কেবল একটি প্রতিযোগিতা নয়, বরং একটি বৃহত্তর জাতীয় সংলাপের সূচনা।

মাহাদী আমীন বলেন, এই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য দেশ গড়ার মহাপরিকল্পনায় দেশের প্রতিটি মানুষকে সম্পৃক্ত করা। একটি গণমুখী রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি জনগণের ভাবনা ও পরিকল্পনাকে রাষ্ট্র পরিচালনার আলোচনায় যুক্ত করতে চায়। তিনি আরও জানান, প্রতিযোগিতায় মেধাভিত্তিকভাবে নির্বাচিত শীর্ষ ১০ জনকে তারেক রহমানের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতার সুযোগ দেওয়া হবে, যা তরুণ প্রজন্ম ও সৃজনশীল অংশগ্রহণকারীদের জন্য একটি বিশেষ প্রণোদনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন বিএনপির জন্য কেবল একটি ব্যক্তিগত বা সাংগঠনিক ঘটনা নয়; বরং এটি দেশের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে। দীর্ঘ সময় বিদেশে অবস্থান করলেও তিনি দলের নীতিনির্ধারণে সক্রিয় ছিলেন বলে বিএনপির দাবি। এখন সরাসরি মাঠের রাজনীতিতে তার উপস্থিতি দলটির সাংগঠনিক শক্তি ও রাজনৈতিক কৌশলে নতুন গতি আনতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।

অন্যদিকে, সমালোচকরা মনে করছেন, এই প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপও বাড়তে পারে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, জনসমাগম এবং রাজনৈতিক সহনশীলতার প্রশ্নগুলো সামনে আসতে পারে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। তবে বিএনপি নেতারা বলছেন, তারা শান্তিপূর্ণ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ কর্মসূচির মধ্য দিয়েই সব কার্যক্রম পরিচালনা করতে বদ্ধপরিকর।

সব মিলিয়ে, তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে বিএনপির প্রস্তুতি, নতুন কর্মসূচির ঘোষণা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার জোরদার প্রক্রিয়া দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করছে। আগামী দিনগুলোতে এই প্রত্যাবর্তন কীভাবে দেশের রাজনীতিতে প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে আপাতত, দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটাতে প্রস্তুত একটি রাজনৈতিক দল এবং কৌতূহলী এক জাতির দৃষ্টি এখন ২৫ ডিসেম্বরের দিকে নিবদ্ধ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত