প্রকাশ: ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের এক রাজনৈতিক নেতার বক্তব্য ঘিরে ভারত-বাংলাদেশ কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, যা ‘সেভেন সিস্টার্স’ নামে পরিচিত, তা নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহর মন্তব্যকে কেন্দ্র করে শুধু নয়াদিল্লিই নয়, সরাসরি প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। তার ভাষায়, এ ধরনের বক্তব্য দায়িত্বজ্ঞানহীন, বিপজ্জনক এবং শত্রুতামূলক। তিনি স্পষ্ট করে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন—বাংলাদেশের রাজনীতিকরা যদি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল নিয়ে এমন মন্তব্য অব্যাহত রাখেন, তাহলে ভারতও নীরব থাকবে না, প্রয়োজনে ‘উচিত শিক্ষা দেবে’।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাসনাত আবদুল্লাহর বক্তব্য প্রকাশের একদিনের মাথায় মঙ্গলবার (১৬ ডিসেম্বর) এই কঠোর প্রতিক্রিয়া জানান আসামের মুখ্যমন্ত্রী। বিষয়টি শুধু আঞ্চলিক রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে দ্রুতই কূটনৈতিক পর্যায়ে গড়ায়। এরই ধারাবাহিকতায় বুধবার (১৭ ডিসেম্বর) দুপুরে নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার মুহাম্মদ রিয়াজ হামিদুল্লাহকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করা হয়। এনডিটিভির প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনকে ঘিরে সাম্প্রতিক ‘হুমকি’ এবং কয়েকজন বাংলাদেশি রাজনৈতিক নেতার ভারতবিরোধী ও উস্কানিমূলক বক্তব্যের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানাতেই এই তলব।
ঘটনার সূত্রপাত সোমবার (১৫ ডিসেম্বর) ঢাকার শহীদ মিনারে। ইনকিলাব মঞ্চের উদ্যোগে ওসমান হাদিকে হত্যাচেষ্টার প্রতিবাদে আয়োজিত সর্বদলীয় প্রতিরোধ সমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহ ‘সেভেন সিস্টার্স’ প্রসঙ্গে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ভারত যদি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, ভোটাধিকার ও মানবাধিকারকে সম্মান না করে, তাহলে বাংলাদেশ ভারতবিরোধী শক্তি ও বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোকে আশ্রয় দিতে পারে। তার এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং ভারতের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়।
ভারতের পক্ষ থেকে শুরুতেই এই বক্তব্যকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, তারা আশা করে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেবে এবং শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করবে। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়েই দিল্লি বুঝিয়ে দেয়, বিষয়টিকে তারা নিছক রাজনৈতিক মন্তব্য হিসেবে দেখছে না, বরং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে।
আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বিষয়টিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে একীভূত করা বা আলাদা করার ধারণা সম্পূর্ণ অবাস্তব ও দায়িত্বজ্ঞানহীন। তার ভাষায়, গত এক বছরে একাধিকবার এমন বক্তব্য শোনা যাচ্ছে, যা ভারতের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “ভারত একটি বড় দেশ, একটি পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র এবং বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি। বাংলাদেশ কীভাবে এমন কথা ভাবতে পারে?”
এই বক্তব্যে শুধু রাজনৈতিক ক্ষোভ নয়, এক ধরনের কৌশলগত বার্তাও রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং সীমান্ত রাজনীতির কারণে দিল্লির কাছে অত্যন্ত সংবেদনশীল এলাকা। সেভেন সিস্টার্সের মধ্যে রয়েছে আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা, মণিপুর, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড ও অরুণাচল প্রদেশ। এই অঞ্চলকে ঘিরে অতীতে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন, সীমান্ত উত্তেজনা ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির নানা অধ্যায় রয়েছে। ফলে কোনো প্রতিবেশী দেশের রাজনীতিকের কাছ থেকে এমন মন্তব্য আসা দিল্লির কাছে স্বাভাবিকভাবেই অগ্রহণযোগ্য।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে বহুস্তরবিশিষ্ট। একদিকে মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের ভূমিকা, অন্যদিকে সীমান্ত, পানি বণ্টন, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা—সব মিলিয়ে এই সম্পর্ক কখনো উষ্ণ, কখনো টানাপোড়েনপূর্ণ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দিল্লি ও ঢাকার মধ্যে কৌশলগত সহযোগিতা বাড়লেও রাজনৈতিক বক্তব্য ও অভ্যন্তরীণ ইস্যু ঘিরে মাঝেমধ্যেই উত্তেজনা দেখা দেয়। হাসনাত আবদুল্লাহর মন্তব্য সেই উত্তেজনাকে আবার সামনে এনে দিয়েছে।
কূটনৈতিক মহলে ধারণা করা হচ্ছে, বাংলাদেশের হাইকমিশনারকে তলব করার মধ্য দিয়ে ভারত স্পষ্ট বার্তা দিতে চেয়েছে যে, এই ধরনের বক্তব্যকে তারা হালকাভাবে নিচ্ছে না। একই সঙ্গে এটি ঢাকার প্রতি একটি চাপও—যেন বাংলাদেশ সরকার নিজ দেশের রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্যের বিষয়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা নেয়। যদিও এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো পাল্টা কূটনৈতিক বিবৃতি আসেনি, তবে সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, বিষয়টি দুই দেশের সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
আসামের মুখ্যমন্ত্রীর ‘উচিত শিক্ষা’ দেওয়ার হুঁশিয়ারি রাজনৈতিক ভাষায় কঠোর হলেও বাস্তবে এর অর্থ কী—তা নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি সামরিক ইঙ্গিত নয়; বরং কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক কিংবা আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেই ভারত আরও কড়া অবস্থান নিতে পারে—এই বার্তাই দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে, একটি বক্তব্য থেকে শুরু হয়ে বিষয়টি এখন দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক ইস্যুতে রূপ নিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার এই সংবেদনশীল সময়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মতো দুই প্রতিবেশী দেশের জন্য দায়িত্বশীল বক্তব্য ও সংযত কূটনীতি যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, এই ঘটনা তারই নতুন স্মরণ করিয়ে দিল।