সিঙ্গাপুরে সংকটাপন্ন হাদি, উৎকণ্ঠায় দেশ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৮ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৪৪ বার
শরিফ ওসমান বিন হাদি

প্রকাশ: ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সকাল পেরোলেও মাথায় গুলিবিদ্ধ ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদির অবস্থা আশঙ্কাজনকই রয়ে গেছে। সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন হাদিকে ঘিরে তার পরিবার, সহকর্মী ও সমর্থকদের উৎকণ্ঠা দিন দিন বাড়ছে। বুধবার সকালে হাদির বড় ভাই ওমর বিন হাদি হাসপাতালের আইসিইউতে প্রবেশ করে তাকে শেষবারের মতো দেখার সুযোগ পান। পরে তিনি ফোনে ‘আমার দেশ’-কে জানান, চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, তবে পরিস্থিতি এখনও অত্যন্ত সংকটাপন্ন।

চিকিৎসকদের বরাতে জানা গেছে, হাদির শারীরিক জটিলতা একাধিক দিক থেকে গুরুতর রূপ নিয়েছে। ঢাকায় তার চিকিৎসার সঙ্গে সম্পৃক্ত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরোসার্জন ডা. আব্দুল আহাদ মঙ্গলবার রাতে জানান, হাদির শরীরে মারাত্মক হৃদ্‌যন্ত্রের জটিলতা দেখা দিয়েছে। এর পাশাপাশি সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। রাতের দিকে তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে এবং চিকিৎসকরা তাকে ‘অত্যন্ত সংকটাপন্ন’ হিসেবে মূল্যায়ন করেন।

এই অবস্থার মধ্যেই প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে হাদির বর্তমান শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন বলে জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, সরকার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজনীয় সব ধরনের কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক সহায়তা নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। রাতেই দায়িত্বশীল উপদেষ্টারা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং পরিস্থিতি মূল্যায়ন করেন।

সরকারি সূত্রে জানা গেছে, হাদির চিকিৎসা ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি তদারকির জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে সিঙ্গাপুর পাঠানো হয়েছে। তিনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, হাদির পরিবারের সদস্য এবং সিঙ্গাপুর সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে জরুরি সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা রাখবেন। বিশেষ করে চিকিৎসা সংক্রান্ত যেকোনো প্রশাসনিক বা কনস্যুলার জটিলতা দ্রুত সমাধান করাই তার মূল দায়িত্ব।

ঢাকায় বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় উপদেষ্টা পরিষদের নিয়মিত বৈঠকে অনির্ধারিতভাবে হাদির সর্বশেষ অবস্থা নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে উপস্থিত উপদেষ্টারা পরিস্থিতির সার্বিক দিক পর্যালোচনা করেন এবং বর্তমান বাস্তবতায় সরকারের করণীয় নিয়ে মতবিনিময় করেন। একই সঙ্গে হাদির ওপর হামলার ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের অগ্রগতি সম্পর্কেও উপদেষ্টাদের অবহিত করা হয়। বৈঠক সূত্র জানায়, তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে।

হাদির ওপর হামলার ঘটনার পর থেকেই দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। বিভিন্ন সংগঠন ও বিশিষ্ট নাগরিকরা এই ঘটনার নিন্দা জানিয়ে দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানান। একই সঙ্গে হাদির দ্রুত সুস্থতা কামনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য মানুষ বার্তা দিচ্ছেন। তার রাজনৈতিক সহকর্মীরা বলছেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক সক্রিয়তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব, আর এই ঘটনা সেই প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে।

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, হাদি দীর্ঘদিন ধরেই সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হিসেবে তিনি নানা ইস্যুতে কথা বলেছেন এবং তরুণদের মধ্যে তার একটি আলাদা পরিচিতি তৈরি হয়েছিল। এই কারণেই তার ওপর হামলার ঘটনা শুধু একজন ব্যক্তিকে নয়, একটি মতাদর্শ ও সামাজিক আন্দোলনকেও আঘাত করেছে বলে অনেকেই মনে করছেন।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের একটি টিম সার্বক্ষণিকভাবে হাদির অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছে। প্রয়োজন অনুযায়ী আন্তর্জাতিক মানের সব ধরনের চিকিৎসা ও প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে চিকিৎসকরা এখনই তার অবস্থা নিয়ে কোনো নিশ্চিত পূর্বাভাস দিতে পারছেন না। পরিস্থিতি ঘণ্টায় ঘণ্টায় পরিবর্তিত হচ্ছে, যা উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলছে।

এদিকে সিঙ্গাপুরে অবস্থানরত বাংলাদেশি কমিউনিটির সদস্যরাও হাদির পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তারা হাসপাতালের বাইরে জড়ো হয়ে নীরবে প্রার্থনা করছেন এবং পরিবারের সদস্যদের মানসিক সমর্থন দিচ্ছেন। অনেকেই বলছেন, এই কঠিন সময়ে মানবিক সংহতিই সবচেয়ে বড় শক্তি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ঘটনার পর দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক সহিংসতা রোধে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তারা বলছেন, তদন্তের স্বচ্ছতা ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা না গেলে জনমনে আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে। সরকার যদি দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে পারে, তবে তা সমাজে একটি ইতিবাচক বার্তা দেবে।

সব মিলিয়ে শরীফ ওসমান হাদির জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকা এই সময়টি শুধু তার পরিবার নয়, পুরো দেশের জন্যই এক গভীর উদ্বেগের মুহূর্ত। সিঙ্গাপুরের হাসপাতালের আইসিইউতে শুয়ে থাকা একজন মানুষের সঙ্গে যেন জড়িয়ে আছে অসংখ্য মানুষের আশা, প্রার্থনা ও প্রত্যাশা। চিকিৎসকরা লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন, পরিবার অপেক্ষায় আছে একটুখানি আশার খবরের, আর দেশবাসী তাকিয়ে আছে সেই মুহূর্তের দিকে, যখন সংকট কাটিয়ে হাদি আবার জীবনের পথে ফিরবেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত