প্রকাশ: ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আবারও গভীর অস্থিরতা ও উত্তেজনার ছায়া নেমে এসেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখভাগের যোদ্ধা ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এই পরিস্থিতিতে সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত সহিংসতার দায় সরকারকেই নিতে হবে।
শুক্রবার ভোরে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শহীদ হাদির মৃত্যুতে শোক প্রকাশের পাশাপাশি সাম্প্রতিক সহিংস ঘটনাগুলোর তীব্র প্রতিবাদ জানান। তার বক্তব্যে উঠে আসে রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব, নাগরিক নিরাপত্তা, গণতন্ত্র এবং রাজনৈতিক সহনশীলতার প্রশ্ন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র, আর এই দেশের প্রতিটি নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বর্তমান সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, সেই দায়িত্ব পালনে সরকার বারবার ব্যর্থ হচ্ছে।
শহীদ হাদির মৃত্যুতে শোকাহত জাতি যখন তার আত্মার মাগফিরাত কামনায় প্রার্থনায় ব্যস্ত, ঠিক তখনই দেশের বিভিন্ন স্থানে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান, সাংবাদিক ও নাগরিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ ওঠে। ফখরুল তার পোস্টে উল্লেখ করেন, ডেইলি স্টার, প্রথম আলোসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং বরেণ্য সাংবাদিক নূরুল কবীরসহ আরও অনেকের ওপর ‘হীন হামলা’ সংঘটিত হয়েছে, যা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও লজ্জাজনক।
বিএনপি মহাসচিব তার লেখায় বলেন, যারা দেশের সংকটময় মুহূর্তকে কাজে লাগিয়ে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়, তারা এই দেশের শত্রু। তাদের লক্ষ্য কখনোই জনগণের কল্যাণ নয়; বরং অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করা। তিনি মন্তব্য করেন, আজকের এই দুঃখভারাক্রান্ত মুহূর্তকে যারা সন্ত্রাস ও সহিংসতায় রূপান্তর করেছে, তারা জাতির শত্রু হিসেবে চিহ্নিত হবে। এই সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তিনি তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং সরকারকে হুঁশিয়ার করে বলেন, এর পুরো দায় সরকারকেই নিতে হবে।
ফখরুল আরও বলেন, গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশে যে ধরনের ‘মব সন্ত্রাস’ চলমান রয়েছে, তা পুরো জাতিকে বিভক্ত করে ফেলেছে। সামাজিক বিভাজন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে একটি গোষ্ঠী বারবার সহিংসতা ছড়াচ্ছে। এর ফলে সাধারণ মানুষ আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে, গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়ছে, আর রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।
শহীদ শরিফ ওসমান হাদি ছিলেন শুধু একজন রাজনৈতিক কর্মী নন, বরং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক ও সম্মুখসারির যোদ্ধা। তিনি নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন এবং সাধারণ মানুষের কাছে গিয়ে তাদের কথা শুনছিলেন, তাদের সমস্যা ও প্রত্যাশার কথা জানছিলেন। বিএনপি মহাসচিবের ভাষায়, হাদি জনগণের দরজায় দরজায় গিয়েছিলেন, একটি গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেছিলেন। তার এই রাজনৈতিক সক্রিয়তাই হয়তো তাকে আততায়ীর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে—এমন প্রশ্নও উঠছে জনমনে।
ফখরুল তার বক্তব্যে দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, নির্বাচন হবে এবং বাংলাদেশে একটি গণতান্ত্রিক জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে, ইনশাআল্লাহ। তবে তার আগে প্রয়োজন সন্ত্রাসের রাজনীতির অবসান এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভেঙে ফেলা। তিনি শহীদ হাদির আততায়ীসহ প্রতিটি মব সন্ত্রাসের বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান। তার মতে, বিচার না হলে সহিংসতার পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে এবং রাষ্ট্র আরও গভীর সংকটে পড়বে।
বিএনপি মহাসচিব আরও বলেন, স্বৈরাচারী আওয়ামী সরকারের পতনের পর নতুন সরকারের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত ছিল জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা এবং একটি গণতান্ত্রিক, স্থিতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠন করা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বিভাজন আরও গভীর হয়েছে, রাজনৈতিক সহনশীলতা কমেছে এবং সহিংসতার ঘটনা বেড়েছে। তিনি সব রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন ও নাগরিক সমাজকে দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার আহ্বান জানান এবং সরকারকে অনতিবিলম্বে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করেন।
উল্লেখ্য, জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক শরিফ ওসমান হাদি গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর বিজয়নগরে গণসংযোগকালে চলন্ত রিকশায় থাকা অবস্থায় আততায়ীর গুলিতে গুরুতর আহত হন। গুলিটি সরাসরি তার মাথায় লাগে। প্রথমে তাকে ঢাকার একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়, পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়। দীর্ঘ চিকিৎসা ও জীবন-মৃত্যুর লড়াই শেষে বৃহস্পতিবার রাতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শোক, ক্ষোভ ও উত্তেজনার মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
হাদির মৃত্যু শুধু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। অনেকেই মনে করছেন, এই হত্যাকাণ্ড ও পরবর্তী সহিংসতা দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, নির্বাচন এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকার যদি দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিচারের আওতায় না আনে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না নেয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বর্তমানে ঢাকা এক উত্তাল ও থমথমে সময় পার করছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানো হলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক কাটেনি। দোকানপাট, অফিস-আদালত ও গণপরিবহনে বিরূপ প্রভাব পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সরকার কীভাবে এই সংকট মোকাবিলা করবে, আদৌ কি সহিংসতার দায় স্বীকার করে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে—সেদিকেই এখন দেশের মানুষের দৃষ্টি।