প্রকাশ: ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও জুলাই বিপ্লবের অগ্রসেনানী শরিফ ওসমান হাদির মরদেহ আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় দেশে পৌঁছাচ্ছে। দীর্ঘ চিকিৎসা ও জীবন-মৃত্যুর লড়াই শেষে সিঙ্গাপুরে তার মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন ও সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর শোকের ছায়া ফেলেছে। আজ সন্ধ্যা ৬টা ৫ মিনিটে বাংলাদেশ বিমানের একটি বাণিজ্যিক ফ্লাইটে করে তার লাশ ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করার কথা রয়েছে। হাদির মরদেহ দেশে ফেরাকে কেন্দ্র করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শোক ও শ্রদ্ধার আবহ বিরাজ করছে।
ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শুক্রবার সকালে সিঙ্গাপুরের দ্য আঙ্গুলিয়া মসজিদে হাদির প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় সেখানে প্রবাসী বাংলাদেশি, শুভাকাঙ্ক্ষী এবং বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে। জানাজা শেষে তার মরদেহ বাংলাদেশে পাঠানোর আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। ইনকিলাব মঞ্চের ফেসবুক পেজে বৃহস্পতিবার দিবাগত মধ্যরাতে প্রকাশিত এক পোস্টে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়।
সংগঠনটি আরও জানায়, বাংলাদেশ বিমানের নির্ধারিত ফ্লাইটটি স্থানীয় সময় বিকেল ৩টা ৫০ মিনিটে সিঙ্গাপুর ত্যাগ করবে। সবকিছু ঠিক থাকলে সন্ধ্যা ৬টা ৫ মিনিটে ঢাকায় পৌঁছাবে হাদির মরদেহ। বিমানবন্দরে তাকে ঘিরে দলীয় নেতাকর্মী, সহযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের ভিড় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিশেষ প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
হাদির মরদেহ দেশে পৌঁছানোর পর তার জানাজা ও দাফনের আয়োজন ঘিরে বিস্তারিত কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ইনকিলাব মঞ্চ। সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শনিবার বাদ জোহর রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এই জানাজায় রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন, ছাত্র ও যুব সংগঠনের নেতাকর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে জানাজা আয়োজনের সিদ্ধান্তকে হাদির প্রতি রাষ্ট্রীয় ও জনসমর্থনের প্রতীক হিসেবেই দেখছেন অনেকেই।
হাদির মৃত্যু শুধু একটি ব্যক্তিগত শোকের ঘটনা নয়; এটি সাম্প্রতিক বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল অধ্যায় হয়ে উঠেছে। গত ১২ ডিসেম্বর নির্বাচনী প্রচারণা শেষে রিকশায় ফেরার পথে তিনি গুলিবিদ্ধ হন। ঘটনাটি ঘটে রাজধানীর বিজয়নগর এলাকায়, যেখানে তিনি গণসংযোগ শেষ করে ফিরছিলেন। গুলিটি সরাসরি তার মাথায় লাগে, যা তার অবস্থাকে আশঙ্কাজনক করে তোলে। সঙ্গে সঙ্গে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।
ঢাকা মেডিকেলে প্রাথমিক চিকিৎসার পর তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে সেদিনই তাকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে তাকে নিবিড় পরিচর্যায় রাখা হয়। তবে অবস্থার তেমন উন্নতি না হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য গত সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর, তাকে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়। সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে কয়েক দিন ধরে চিকিৎসাধীন থাকার পর বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
হাদির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশে ও প্রবাসে শোকের আবহ তৈরি হয়। রাজধানী ঢাকা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে তার সমর্থক ও সহযোদ্ধারা শোকসভা, দোয়া মাহফিল ও স্মরণ সভার আয়োজন করেন। একই সঙ্গে কিছু জায়গায় বিক্ষোভ ও উত্তেজনাও দেখা যায়, যা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। রাজনৈতিক নেতারা একে একে শোকবার্তা পাঠাচ্ছেন এবং তার হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করছেন।
ইনকিলাব মঞ্চের নেতারা বলছেন, হাদি ছিলেন একটি প্রজন্মের কণ্ঠস্বর। তিনি শুধু একজন সংগঠক বা মুখপাত্র নন, বরং একটি আন্দোলনের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। তার মৃত্যুতে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, হাদির আদর্শ ও রাজনৈতিক দর্শনকে সামনে রেখে তারা শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন অব্যাহত রাখবে।
হাদির পরিবারও শোকের মধ্যে সময় পার করছে। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, তারা তার হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান। একই সঙ্গে তারা সাধারণ মানুষের কাছে হাদির জন্য দোয়া কামনা করেছেন। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, হাদি শেষ পর্যন্ত দেশের মানুষের অধিকার ও ন্যায়ের প্রশ্নে আপসহীন ছিলেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, হাদির মরদেহ দেশে ফেরার এই মুহূর্তটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। একদিকে শোক ও শ্রদ্ধা, অন্যদিকে ক্ষোভ ও প্রতিবাদ—এই দুই আবেগের মিশ্রণে পরিস্থিতি যে কোনো দিকে মোড় নিতে পারে। তাই সরকার ও প্রশাসনের জন্য এটি একটি বড় পরীক্ষা বলেই মনে করছেন তারা। শোককে কেন্দ্র করে যেন নতুন করে সহিংসতা না ছড়ায়, সেদিকে নজর রাখার আহ্বান জানাচ্ছেন বিভিন্ন মহল।
আজ সন্ধ্যায় হাদির মরদেহ দেশে পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে তার জীবনের এক অধ্যায় শেষ হলেও, তার রাজনৈতিক ভূমিকা ও মৃত্যুকে ঘিরে প্রশ্ন, আলোচনা ও আন্দোলন যে আরও দীর্ঘ সময় ধরে চলবে—তা প্রায় নিশ্চিত। শোকাহত বাংলাদেশ আজ একজন তরুণ নেতাকে শেষ বিদায় জানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে, যার জীবন ও মৃত্যু দেশের রাজনীতিতে গভীর ছাপ রেখে গেল।