শোকের ছায়ায় নজিপুর, জান্নাত আরা রুমীর দাফন সম্পন্ন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৭০ বার
এনসিপি নেত্রী জান্নাত আরা রুমীর দাফন সম্পন্ন
এনসিপি নেত্রী জান্নাত আরা রুমী

প্রকাশ: ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নেত্রী ও ‘জুলাই কন্যা’ হিসেবে পরিচিত জান্নাত আরা রুমীর দাফন সম্পন্ন হয়েছে। শুক্রবার নওগাঁর পত্নীতলা উপজেলা সদর নজিপুর সরকারি কবরস্থানে জানাজা শেষে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। শোকভারাক্রান্ত এই জানাজায় রুমীর পরিবার-পরিজন, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, স্থানীয় এলাকাবাসী এবং ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সহযোদ্ধারা অংশ নেন। অশ্রুসিক্ত পরিবেশে শেষ বিদায়ে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়, যেখানে স্লোগান আর নীরব কান্না মিলেমিশে একাকার হয়ে ওঠে।

এর আগে রাজধানী ঢাকা থেকে রুমীর মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত পৌনে ১২টার দিকে নজিপুর বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছায়। মরদেহ পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই এলাকায় শোকের আবহ নেমে আসে। শত শত মানুষ রাতেই সেখানে জড়ো হয়ে প্রিয় নেত্রীকে শেষবারের মতো এক নজর দেখার চেষ্টা করেন। রাতভর শোকাহত মানুষের ভিড় আর স্তব্ধ নীরবতা যেন পুরো নজিপুরকে আচ্ছন্ন করে রাখে।

জান্নাত আরা রুমী ছিলেন ২০২৪ সালের গণ-আন্দোলনের এক সাহসী মুখ। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনে তিনি ছিলেন প্রথম সারির একজন সংগঠক ও নেতৃত্বদানকারী কর্মী। নওগাঁর পত্নীতলা উপজেলা সদর নজিপুর পৌর এলাকায় স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যে সাহসী মিছিলগুলো প্রথম আলোড়ন তুলেছিল, সেখানে অগ্রভাগে ছিলেন ‘জুলাই কন্যা’ খ্যাত জান্নাত রুমী। জীবনবাজি রেখে রাজপথে নামা এই তরুণী অল্প সময়ের মধ্যেই স্থানীয় থেকে জাতীয় রাজনীতিতে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন।

রাজনৈতিক সচেতনতা ও দেশপ্রেমের জায়গা থেকেই পরবর্তী সময়ে তিনি জাতীয় নাগরিক পার্টিতে যুক্ত হন। এনসিপিতে যোগ দিয়ে তিনি ঢাকায় অবস্থান করছিলেন এবং দলীয় সাংগঠনিক কাজে সক্রিয় ছিলেন। জানা গেছে, তিনি এনসিপির ঢাকা মহানগর দক্ষিণের ধানমন্ডি থানার সমন্বয় কমিটির যুগ্ম সমন্বয়কারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। দলের ভেতরে তাকে একজন পরিশ্রমী, স্পষ্টভাষী ও সাহসী সংগঠক হিসেবে বিবেচনা করা হতো।

কিন্তু হঠাৎ করেই এক মর্মান্তিক ও রহস্যময় ঘটনায় তার জীবনের ইতি ঘটে। বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর হাজারীবাগের জিগাতলা এলাকায় একটি ছাত্রী হোস্টেল থেকে জান্নাত আরা রুমীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পুরোনো গণ-আন্দোলনপথ হিসেবে পরিচিত ওই এলাকায় তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ‘জান্নাত আরা রুমী আর নেই’—এই খবর মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়।

এই মৃত্যুর সংবাদ পৌঁছানোর পর নওগাঁ জেলা তথা রুমীর জন্মস্থান পত্নীতলা উপজেলায় শোকের মাতম শুরু হয়। অনেকেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না যে, যিনি রাজপথে নির্ভীকভাবে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন, তার জীবন এমন আকস্মিক ও রহস্যময় পরিণতির মুখে পড়তে পারে। এলাকাবাসী, সহযোদ্ধা ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা দ্রুতই তার মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্তের দাবি তোলেন।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, জান্নাত আরা রুমী নওগাঁ জেলার পত্নীতলা উপজেলা সদর নজিপুর পৌর এলাকার বাসস্ট্যান্ড পশ্চিম পাড়ার বাসিন্দা ছিলেন। তার বাবার নাম জাকির হোসেন এবং মায়ের নাম নুরজাহান বেগম। পরিবারে তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রিয় ও দায়িত্বশীল একজন সদস্য। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি সমাজ ও মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ ছিল তার মধ্যে।

সহপাঠী ও ঘনিষ্ঠজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, জান্নাত রুমী ২০১২ সালে এসএসসি এবং ২০১৪ সালে নজিপুর সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। এরপর তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নার্সিং ডিপ্লোমায় ভর্তি হন। পেশাগত জীবনে তিনি একজন সেবামূলক মানসিকতার মানুষ ছিলেন এবং নজিপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নার্স হিসেবে কাজ করেছেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে এক পুত্র সন্তানের মা হন। বর্তমানে তার সন্তানের বয়স প্রায় চার বছর। তবে কয়েক মাস আগে তিনি স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদে যান। এরপর তিনি পুরোপুরি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়ে ঢাকায় অবস্থান শুরু করেন।

পত্নীতলা উপজেলা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তৎকালীন নেতা মারুফ মোস্তফা, আন্দোলনের অন্যতম সদস্য রুহুল আমীন, মাসুদ রানা, সুমাইয়া জান্নাতসহ অনেক সহযোদ্ধা জানান, জান্নাত আরা রুমীর মৃত্যু তাদের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। তাদের ভাষায়, “জান্নাত আরা আর নেই—ভাবতেই অবাক লাগে। স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগের পতনের দাবিতে যে প্রথম সারির মিছিলগুলো হয়েছিল, সেখানে জান্নাত রুমী ছিলেন নেতৃত্বে। এমন অকাল মৃত্যু আমাদের গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে।”

সহযোদ্ধারা আরও বলেন, এই মৃত্যু শুধু একজন নেত্রীর হারানো নয়, এটি একটি সাহসী তরুণ নেতৃত্বের অপমৃত্যু। তারা রুমীর মৃত্যুর রহস্য উদঘাটনের জোর দাবি জানান এবং বলেন, যদি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকে, তবে তদন্ত সাপেক্ষে প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তাদের মতে, ত্যাগী ও সংগ্রামী তরুণ প্রজন্মের একজন নেতৃত্বদানকারী নেত্রীকে হারানো মানে আন্দোলনের জন্য বড় এক শূন্যতা সৃষ্টি হওয়া।

দাফন শেষে স্থানীয় কবরস্থানে দাঁড়িয়ে অনেকেই আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। কেউ কেউ কবরের পাশে দাঁড়িয়ে নীরবে কেঁদেছেন, কেউ আবার রুমীর আদর্শ ধরে রাখার অঙ্গীকার করেছেন। জান্নাত আরা রুমীর জীবন ও মৃত্যু নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় তরুণদের নিরাপত্তা, নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং আন্দোলনকেন্দ্রিক রাজনীতির ঝুঁকি নিয়ে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জান্নাত আরা রুমীর মৃত্যু কেবল একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তরুণ ও নারীনেতৃত্বের জন্য এক বড় সতর্কবার্তা। তার মৃত্যু নিয়ে সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ তদন্ত না হলে সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে বলেও তারা মনে করছেন।

নজিপুর আজ নিঃশব্দ এক শোকের শহর। যে মেয়েটি একদিন সাহসী কণ্ঠে স্লোগান তুলেছিলেন, আজ তিনি নীরব কবরের বাসিন্দা। কিন্তু জান্নাত আরা রুমীর জীবন, তার সংগ্রাম আর তার অকাল মৃত্যু হয়তো দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলনকামী মানুষের স্মৃতিতে প্রশ্ন ও অনুপ্রেরণা হয়ে বেঁচে থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত