প্রকাশ: ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন ও আন্দোলনকেন্দ্রিক সমাজকে গভীর শোকের আবহে ঢেকে দিয়েছে। যাঁকে ঘিরে ‘জুলাই স্পিরিট’ শব্দবন্ধটি এক ধরনের প্রত্যয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছিল, তিনি আর নেই। আততায়ীর গুলিতে গুরুতর আহত হয়ে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন শরিফ ওসমান হাদি। তার বিদায়ে কেবল একজন রাজনৈতিক কর্মী নয়, বরং একটি সময়ের সাহসী উচ্চারণ, প্রতিবাদী কণ্ঠ এবং আত্মত্যাগের প্রতিচ্ছবি যেন স্তব্ধ হয়ে গেল।
হাদির নামের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল স্পষ্টভাষী বক্তব্য, আপসহীন অবস্থান এবং রাজপথে সক্রিয় উপস্থিতি। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হিসেবে তিনি পরিচিত ছিলেন এমন একজন মানুষ হিসেবে, যিনি কোনো প্রশ্নে পিছপা হতেন না। ক্ষমতা, অন্যায় কিংবা নিপীড়নের বিরুদ্ধে তার ভাষা ছিল তীক্ষ্ণ, কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন সংবেদনশীল ও আবেগপ্রবণ এক মানুষ। তার সেই মানবিক সত্তাই বারবার ফুটে উঠেছিল বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে, বিশেষ করে নিজের শিশুসন্তানকে নিয়ে আক্ষেপের কথায়।
হাদি বারবার বলেছেন, আন্দোলনের দায়বদ্ধতা তাকে ব্যক্তিগত জীবনের অনেক সুখ থেকে দূরে রেখেছে। একটি সাক্ষাৎকারে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেছিলেন, “আমার বাচ্চাটারে তিন মাসে ত্রিশ মিনিটও আমি কোলে নিতে পারি নাই।” এই একটি বাক্যই যেন তার জীবনের দ্বন্দ্বকে স্পষ্ট করে দেয়। একদিকে রাজপথের লড়াই, অন্যদিকে বাবার দায়িত্ব—এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষের অসহায় সত্য উচ্চারণ ছিল সেটি।
এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদকে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে হাদি আরও বলেছিলেন, তার স্ত্রী মাঝে মাঝে মজা করে সন্তানকে বলে, ‘ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র তোমার সঙ্গে দেখা করতে আসছে।’ কথাগুলো বলার সময় তার কণ্ঠে ছিল না কোনো হাসি, ছিল গভীর বেদনা আর আত্মসংযম। তিনি যেন জানতেন, এই লড়াই তাকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে। তাই সাক্ষাৎকারের একপর্যায়ে তিনি বলেছিলেন, “ভাইয়া, আল্লাহ যদি আমাকে নিয়ে যায়, আমার বাচ্চাটার দিকে একটু খেয়াল রাইখেন।”
হাদির এই কথাগুলো পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, বিশেষ করে তাকে গুলি করার ঘটনার পর। ফেসবুক, ইউটিউব এবং বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে তার ভিডিও ক্লিপগুলো নতুন করে আলোচনায় আসে। মানুষ তাকে স্মরণ করতে থাকে তার বক্তব্যের শক্তি দিয়ে নয়, বরং তার চোখের জল, কণ্ঠের ভাঙন আর একজন বাবার অসহায় আকুতি দিয়ে। অনেকেই লিখেছেন, হাদির এই কথাগুলো এখন আর শুধু একটি ব্যক্তিগত আক্ষেপ নয়, বরং একটি প্রজন্মের দায়বদ্ধতার প্রতিচ্ছবি।
হাদি নিজেকে কখনোই মহান হিসেবে তুলে ধরতে চাননি। বরং নিজের শক্তির উৎস হিসেবে বারবার বাবার কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছিলেন, “আমার সারা জীবনের যেটুকু সততা, সাহস, লড়াই—এটার সমস্ত শক্তি আমার আব্বা।” তার বিশ্বাস ছিল, সততার সঙ্গে লড়াই করলে আল্লাহই শেষ পর্যন্ত দেখভাল করবেন। সন্তান, পরিবার, সহযোদ্ধা—সবকিছুর দায়িত্ব তিনি সৃষ্টিকর্তার ওপর ছেড়ে দিয়েছিলেন। এই বিশ্বাসই হয়তো তাকে মৃত্যুর আশঙ্কার মুখেও নির্ভীক রেখেছিল।
১২ ডিসেম্বর রাজধানীর বিজয়নগর এলাকায় গণসংযোগের জন্য গেলে হাদির ওপর হামলা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, চলন্ত একটি মোটরসাইকেল থেকে তাকে লক্ষ্য করে গুলি করা হয়। গুলিটি সরাসরি তার মাথায় লাগে। মুহূর্তের মধ্যেই রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। ঘটনাস্থলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, আশপাশের মানুষ দ্রুত তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান।
ঢাকা মেডিকেলে জরুরি অস্ত্রোপচারের পর তার অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। চিকিৎসকদের মতে, গুলিটি অত্যন্ত জটিল স্থানে লেগেছিল এবং তার অবস্থা ছিল সংকটাপন্ন। পরিবারের সিদ্ধান্তে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সেখানকার একটি বিশেষায়িত হাসপাতালে তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। দেশজুড়ে তার সুস্থতার জন্য দোয়া ও প্রার্থনার ঢল নামে।
কিন্তু সব অপেক্ষা, সব প্রার্থনা ছাপিয়ে বৃহস্পতিবার, ১৮ ডিসেম্বর রাতে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শরিফ ওসমান হাদি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোকের বন্যা বইতে থাকে। সহযোদ্ধা, রাজনৈতিক কর্মী, সাধারণ মানুষ—সবাই তাকে স্মরণ করেন এক সাহসী কণ্ঠ হিসেবে, যিনি কথা বলেছিলেন ঝুঁকি জেনেও।
হাদির মৃত্যু নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে দেশের রাজনৈতিক সহিংসতা ও মতপ্রকাশের নিরাপত্তা নিয়ে। প্রকাশ্য দিবালোকে রাজধানীর ব্যস্ত এলাকায় একজন রাজনৈতিক কর্মীর ওপর গুলি চালানোর ঘটনা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। অনেকেই দ্রুত সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের বিচারের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে এই ঘটনাকে ‘জুলাই স্পিরিট’-এর ওপর আঘাত হিসেবে দেখছেন তার অনুসারীরা।