ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধে শ্রমিক অসন্তোষ, চরম ভোগান্তি

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২১ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৭০ বার
ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধে শ্রমিক অসন্তোষ, চরম ভোগান্তি

প্রকাশ: ২১ ডিসেম্বর অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক দেশের অন্যতম ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ পথ। রাজধানীর সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের সরাসরি সংযোগ স্থাপনকারী এই সড়কে প্রতিদিন হাজারো মানুষ কর্মস্থল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়িক প্রয়োজনে যাতায়াত করেন। সেই ব্যস্ত মহাসড়কই রোববার সকাল থেকে প্রায় এক ঘণ্টা অবরোধ করে রাখেন গার্মেন্টস শ্রমিকরা। ভালুকা উপজেলায় দুটি বাসের মধ্যে সংঘর্ষ ও এক শ্রমিককে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট এই বিক্ষোভে চরম দুর্ভোগে পড়েন পথচারী, অফিসগামী মানুষ ও দূরপাল্লার যাত্রীরা।

স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য অনুযায়ী, রোববার সকালে গাজীপুর থেকে ভালুকা উপজেলার জামিরদিয়া এলাকায় অবস্থিত পিএ নিট কারখানায় যাওয়ার পথে একটি শ্রমিকবাহী বাসের সঙ্গে ময়মনসিংহগামী সৌখিন পরিবহনের একটি বাসের ধাক্কা লাগে। ঘটনাটি ঘটে জামিরদিয়া এলাকায়, যেখানে সকালবেলা শিল্পকারখানাগুলোতে কর্মীদের যাতায়াতের কারণে সড়কে স্বাভাবিকভাবেই চাপ বেশি থাকে। প্রাথমিকভাবে সংঘর্ষটি বড় ধরনের দুর্ঘটনা না হলেও দুই বাসের চালক ও যাত্রীদের মধ্যে কথা কাটাকাটি শুরু হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ধাক্কার পর উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে সৌখিন পরিবহনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু শ্রমিক পিএ নিট কারখানার শ্রমিকবাহী বাসের হেল্পার আমিনুলকে জোরপূর্বক বাস থেকে নামিয়ে নিয়ে যান বলে অভিযোগ ওঠে। এই ঘটনার খবর দ্রুত কারখানায় পৌঁছে গেলে শ্রমিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। তারা বিষয়টিকে শুধু একটি সড়ক দুর্ঘটনা নয়, বরং শ্রমিকের নিরাপত্তা ও সম্মানের ওপর আঘাত হিসেবে দেখেন।

কারখানার শ্রমিকরা জানান, সহকর্মীকে জোর করে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনার প্রতিবাদে তারা কাজে যোগ না দিয়ে একত্রিত হন এবং ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন। তাদের দাবি ছিল, অপহৃত শ্রমিকের নিরাপদ মুক্তি নিশ্চিত করা এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত। শ্রমিকদের একটি অংশ জানান, এর আগেও সড়কে চলাচলের সময় বিভিন্ন পরিবহনের সঙ্গে শ্রমিকদের ঝামেলার ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু প্রতিবারই বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়নি। তাই এবার তারা কঠোর অবস্থান নিতে বাধ্য হয়েছেন।

অবরোধ শুরু হওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই মহাসড়কের দুই পাশে যানজটের সৃষ্টি হয়। দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেলসহ সব ধরনের যানবাহন আটকে পড়ে। অনেক অফিসগামী মানুষ নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারেননি। শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা ও ক্লাসে দেরিতে পৌঁছান, আর অসুস্থ রোগীবাহী যানবাহন আটকে পড়ায় ভোগান্তি আরও বেড়ে যায়। পথচারীদের অনেকেই নেমে হেঁটে বিকল্প পথে যাওয়ার চেষ্টা করেন, কিন্তু তাতেও দুর্ভোগ কমেনি।

সড়কে আটকে পড়া যাত্রীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শ্রমিকদের দাবির বিষয়টি মানবিক হলেও মহাসড়ক অবরোধ সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়ে দেয়। কেউ কেউ বলেন, এই সড়ক অবরোধের ফলে তাদের গুরুত্বপূর্ণ কাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আবার অনেকেই মনে করেন, শ্রমিকরা তাদের নিরাপত্তা ও ন্যায্য দাবির কথা জানানোর জন্য বাধ্য হয়েই এমন কর্মসূচি নিয়েছেন।

খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। ভরাডোবা হাইওয়ে থানা পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলেন এবং পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন। পুলিশের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের আশ্বস্ত করা হয় যে, অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হবে এবং জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুলিশের দীর্ঘ আলোচনা ও বোঝানোর পর প্রায় এক ঘণ্টা পর শ্রমিকরা অবরোধ তুলে নেন।

ভরাডোবা হাইওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ এবিএম মেহেদী মাসুদ বলেন, শ্রমিক তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগে পিএ নিট কারখানার শ্রমিকরা মহাসড়ক অবরোধ করেছিলেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা করে পরিস্থিতি শান্ত করে এবং অবরোধ তুলে নিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক করা হয়। তিনি আরও জানান, ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত খোঁজ নেওয়া হচ্ছে এবং অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

অবরোধ তুলে নেওয়ার পর ধীরে ধীরে যান চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করে। তবে দীর্ঘ যানজটের কারণে পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে কিছুটা সময় লাগে। অনেক যাত্রী ক্ষোভ ও বিরক্তি নিয়ে গন্তব্যে পৌঁছান। স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও জানান, সড়ক বন্ধ থাকায় তাদের পণ্য পরিবহন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে।

এই ঘটনার পর শ্রমিক নিরাপত্তা ও সড়কে শৃঙ্খলা রক্ষার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। শ্রমিক নেতারা বলছেন, প্রতিদিন কর্মস্থলে যাতায়াতের সময় শ্রমিকরা নানা ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েন। পরিবহন সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বিরোধ, দুর্ঘটনা এবং কখনো কখনো শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে। তারা মনে করেন, শিল্পাঞ্চলগুলোতে শ্রমিকদের যাতায়াত নিরাপদ করতে আলাদা নজরদারি ও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

অন্যদিকে পরিবহন সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন, সড়কে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সব পক্ষের দায়িত্বশীল আচরণ জরুরি। একটি ছোট দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে যাতে বড় ধরনের সহিংসতা বা অবরোধ সৃষ্টি না হয়, সেজন্য দ্রুত সমাধানের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। তারা মনে করেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি শিল্প মালিক ও পরিবহন মালিকদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো গেলে এমন পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব।

বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের মতো গুরুত্বপূর্ণ সড়কে অবরোধ শুধু তাৎক্ষণিক ভোগান্তিই নয়, বরং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও প্রভাব ফেলে। শিল্পাঞ্চল অধ্যুষিত এই এলাকায় শ্রমিক অসন্তোষ বা সড়ক অচলাবস্থার ঘটনা বারবার ঘটলে তা সামগ্রিক উৎপাদন ও পরিবহন ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এসব ঘটনায় দ্রুত, মানবিক ও আইনি সমাধান নিশ্চিত করা জরুরি।

সার্বিকভাবে, ভালুকায় দুটি বাসের সংঘর্ষ থেকে শুরু হয়ে এক শ্রমিককে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধের এই ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল, শ্রমিক নিরাপত্তা ও সড়ক ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়ের ঘাটতি রয়ে গেছে। পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি আপাতত শান্ত হলেও ঘটনার মূল কারণ ও দায় নিরূপণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। সাধারণ মানুষ এখন প্রত্যাশা করছে, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখবে এবং শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি ও জনভোগান্তি—দুটোর মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান খুঁজে বের করা হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত