প্রকাশ: ২১ ডিসেম্বর অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ধর্মকে পুঁজি করে দেশে মবসন্ত্রাস উসকে দেওয়া হলে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল তা প্রতিহত করবে—এমন কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব। রাজধানীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এক বিক্ষোভ সমাবেশে তিনি বলেন, ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করে পরিকল্পিতভাবে দেশকে অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা চলছে, যা বাংলাদেশের সামাজিক সম্প্রীতি ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য মারাত্মক হুমকি।
রোববার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের উদ্যোগে দেশব্যাপী মবসন্ত্রাসের বিচার দাবিতে আয়োজিত বিক্ষোভ মিছিল শেষে ঐতিহাসিক রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বক্তব্য দেন ছাত্রদল সভাপতি। সেখানে তিনি বলেন, ৫ আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ‘বট বাহিনী’ তৈরি করছে। এই গোষ্ঠী দেশ-বিদেশে বসে অনলাইনে ঘৃণা ছড়াচ্ছে এবং মাঠপর্যায়ে মবসন্ত্রাসের পরিবেশ তৈরি করছে।

রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেন, বিএনপি একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল এবং ছাত্রদল সেই গণতান্ত্রিক চর্চার ধারক। তাই ছাত্রদল কখনোই পাল্টা মব তৈরি করে বা নিজের হাতে আইন তুলে নিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে চায় না। তিনি উল্লেখ করেন, ধৈর্য ও সহনশীলতার মাধ্যমে এতদিন ছাত্রদল পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, ধর্মের নামে সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ড চালানো হলে ছাত্রদল নিশ্চুপ থাকবে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, জনগণের নিরাপত্তা ও সামাজিক শান্তি রক্ষায় প্রয়োজনে সাংগঠনিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।
সমাবেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির কঠোর সমালোচনা করে ছাত্রদল সভাপতি বলেন, কে ভালো মুসলিম আর কে নয়—এই বিভাজন তৈরি করে একটি গোষ্ঠী সমাজে বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে। এই রাজনীতি শুধু ধর্মের অবমাননাই নয়, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও সামাজিক বন্ধনকে দুর্বল করার ষড়যন্ত্রের অংশ। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে ধর্ম সবসময় মানুষের মাঝে সহাবস্থানের শক্তি হিসেবে কাজ করেছে, বিভেদের হাতিয়ার হিসেবে নয়।
শহীদ শরীফ ওসমান হাদির কবর নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো গুজব প্রসঙ্গে রাকিব বলেন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ছাত্রদল ও বিএনপির বিরুদ্ধে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। এসব অপপ্রচারের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, হাদি হত্যাকাণ্ডসহ সাম্প্রতিক সব মবসন্ত্রাসের ঘটনায় দ্রুত, নিরপেক্ষ ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে হবে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি থাকলে এ ধরনের সহিংসতা আরও বাড়বে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস সমাবেশে বলেন, সারাদেশে মব সংস্কৃতির নামে যে অরাজকতা চলছে, তা রাষ্ট্রের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। তিনি বলেন, প্রশাসনের নীরবতা বা দুর্বলতা মবসন্ত্রাসীদের উৎসাহিত করছে। প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অপরাধীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে।
এই বিক্ষোভের আগে দুপুর পৌনে ১টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকা থেকে মিছিল শুরু হয়। মিছিলটি পুরো ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে এসে শেষ হয়। মিছিলে অংশগ্রহণকারী ছাত্রদল নেতাকর্মীরা বিভিন্ন স্লোগানে মুখর করে তোলেন বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা। ‘ছাত্রদলের অঙ্গীকার, নিরাপদ বাংলাদেশ’, ‘সম্প্রীতির বাংলাদেশ, আমাদের অঙ্গীকার’, ‘মবসন্ত্রাসের ঠিকানা, এই বাংলায় হবে না’—এমন স্লোগানের পাশাপাশি সাম্প্রতিক সহিংসতার ঘটনাগুলো তুলে ধরে প্রতিবাদ জানানো হয়।
বিশেষ করে ময়মনসিংহের ভালুকায় পোশাক শ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনা এবং লক্ষ্মীপুরের ভবানীগঞ্জ ইউনিয়নে বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক বেলাল হোসেনের বাড়িতে আগুন দিয়ে তার সাত বছরের কন্যা আয়েশা সানজুকে হত্যার ঘটনায় গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিক্ষোভকারীরা। এসব ঘটনার মাধ্যমে মবসন্ত্রাস যে কতটা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে, তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বলে বক্তারা মন্তব্য করেন।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, মবসন্ত্রাস কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি পরিকল্পিতভাবে সমাজে ভয় তৈরি করার কৌশল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের গুজব, উসকানিমূলক বক্তব্য এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে একটি চক্র এ ধরনের সহিংসতা চালাচ্ছে। তারা দাবি করেন, রাষ্ট্রযন্ত্র যদি সময়মতো কঠোর পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে ধর্মীয় আবেগকে কেন্দ্র করে সহিংসতার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য অশনিসংকেত। ছাত্রদলের এই অবস্থান মূলত নিজেদের গণতান্ত্রিক পরিচয় জোরালো করার পাশাপাশি সরকার ও প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করার কৌশল হিসেবেও দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে এটি তরুণ সমাজকে মবসন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সংগঠিত করার আহ্বান।

মানবাধিকারকর্মীরা মনে করছেন, মবসন্ত্রাস প্রতিরোধে রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সুশীল সমাজকে একযোগে কাজ করতে হবে। কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য বা কর্মসূচির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন কার্যকর আইন প্রয়োগ, দ্রুত বিচার এবং সামাজিক সচেতনতা।
ছাত্রদলের এই কর্মসূচির পর ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক অবস্থানে থাকলেও কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। তবে আন্দোলনকারীরা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, দাবি আদায় না হলে ভবিষ্যতে আরও বৃহত্তর কর্মসূচি ঘোষণা করা হতে পারে।
সব মিলিয়ে, ধর্মকে পুঁজি করে মবসন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ছাত্রদলের কঠোর অবস্থান রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এটি শুধু একটি ছাত্র সংগঠনের প্রতিবাদ নয়, বরং দেশের ক্রমবর্ধমান সহিংসতা ও অস্থিরতার বিরুদ্ধে একটি সতর্ক বার্তা হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, প্রশাসন ও সরকার এই বার্তাকে কীভাবে গ্রহণ করে এবং মবসন্ত্রাস রোধে কী ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ নেয়।