রাজনীতির সামন্ততন্ত্র ভাঙার স্বপ্ন শহীদ ওসমান হাদি

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২২ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৫০ বার
রাজনীতির সামন্ততন্ত্র ভাঙার স্বপ্ন শহীদ ওসমান হাদি

প্রকাশ: ২২ ডিসেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

শহীদ ওসমান হাদির জানাজায় মানুষের ঢল শুধু একটি বিদায়ের দৃশ্য ছিল না, ছিল বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ, আশা ও স্বপ্নের এক নীরব কিন্তু গভীর প্রকাশ। প্রত্যক্ষদর্শী ও বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এই জানাজায় অংশ নিয়েছেন কয়েক লক্ষ মানুষ, কেউ কেউ বলছেন সংখ্যাটি দশ লক্ষ ছাড়িয়ে গেছে। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে এত বড় জনসমাগম খুব কম ক্ষেত্রেই দেখা গেছে। প্রবীণ অনেকেই বলছেন, সংখ্যার দিক থেকে এই জনসমুদ্রের সঙ্গে তুলনা করা যায় কেবল শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জানাজার সঙ্গে। এই তুলনা যেমন আবেগঘন, তেমনি তাৎপর্যপূর্ণও।

এই প্রেক্ষাপটে একটি বেদনাদায়ক বৈপরীত্য সামনে আসে। শহীদ জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপির অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট পরিচয়ধারী বহু আইডি থেকে জীবদ্দশায় এবং শাহাদতের পরও ওসমান হাদিকে নিয়ে কটূক্তি করা হয়েছে। ‘পথশিশু’, ‘মব সৃষ্টিকারী’, ‘ডেভিল’—এ ধরনের শব্দ ব্যবহার করে তাকে আক্রমণ করা হয়েছে। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর সাময়িক সহানুভূতি দেখালেও দাফনের পরপরই আবার অনেকেই পুরোনো বিদ্রূপে ফিরে যান। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক বিএনপিপন্থি অ্যাকটিভিস্ট মন্তব্য করেন, জনি সিন্স যেমন জনপ্রিয়, হাদির জনপ্রিয়তাও তেমন—একটি তুলনা, যা একজন তরুণ রাজনৈতিক নেতাকে উদ্দেশ্য করে করা হলে তা নিছক রুচিহীনই নয়, বরং গভীর বিদ্বেষের ইঙ্গিত বহন করে।

প্রশ্ন ওঠে, কেন এই ক্ষোভ? ওসমান হাদি কি কোনো দল বা গোষ্ঠীকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করেছিলেন? তার বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ছাড়া তিনি আর কোনো রাজনৈতিক দলকে কটূক্তি করেননি। এমনকি আওয়ামী লীগের মধ্যেও যারা অপরাধে জড়িত নন, তাদের জন্য ইনসাফের কথাও বলেছেন। ফলে এই বিদ্বেষকে কেবল দলীয় প্রতিহিংসা বলে ব্যাখ্যা করা যায় না। এর শিকড় অনেক গভীরে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামোর ভেতরেই প্রোথিত।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশ কার্যত আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দ্বিদলীয় বন্দোবস্তের মধ্যেই আবদ্ধ ছিল। এই দুই দলই দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার পালাবদলে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে এবং উভয়ের মধ্যেই পরিবারতন্ত্র ছিল প্রবল। রাজনীতির শীর্ষ ও মধ্যস্তরের নেতৃত্ব গড়ে উঠেছে একটি সীমিত অভিজাত গোষ্ঠীর হাতে। সাধারণ মানুষের জন্য সেখানে প্রবেশের দরজা প্রায় বন্ধই ছিল।

এই বাস্তবতাকে বোঝাতে অনেক বিশ্লেষক বাংলাদেশের রাজনীতিকে ইউরোপের মধ্যযুগীয় সামন্ততন্ত্রের সঙ্গে তুলনা করেন। তখন সমাজ কয়েকটি স্তরে বিভক্ত ছিল—রাজপরিবার, অভিজাত শ্রেণি এবং সাধারণ প্রজা। বাংলাদেশের রাজনীতিতেও দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ ছিল এক ধরনের অভিজাত শ্রেণির হাতে কেন্দ্রীভূত। দলীয় প্রধান থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বের জায়গাগুলোতে সাধারণ মানুষের উঠে আসা ছিল প্রায় অকল্পনীয়।

এই অসম্ভব কাজটিই করতে চেয়েছিলেন শহীদ ওসমান হাদি। তিনি এমন এক রাজনীতির স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে সাধারণ মানুষ তার মেধা, সাহস ও সততার জোরে নেতৃত্বে আসতে পারে। নিজের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ও প্রতিষ্ঠিত প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে নির্বাচনে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত ছিল সেই স্বপ্নেরই প্রকাশ। তিনি নির্বাচনি এলাকায় হেঁটে হেঁটে গণসংযোগ করেছেন, মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন, তাদের দুঃখ-কষ্ট শুনেছেন। কালো টাকা বা পেশিশক্তির ওপর নির্ভর না করে তিনি ভরসা রেখেছিলেন ক্রাউড ফান্ডিং ও সাধারণ মানুষের ভালোবাসার ওপর।

তিনি জিততে পারতেন কি না, সেই প্রশ্ন এখন তর্কসাপেক্ষ। কিন্তু এটুকু অস্বীকার করার উপায় নেই যে, তিনি মানুষের মনে সাড়া ফেলতে পেরেছিলেন। কোটি কোটি টাকা ছাড়া যে নির্বাচন করা সম্ভব, সেই ধারণাকে তিনি বাস্তবে দেখাতে চেয়েছিলেন। এই চেষ্টাই হয়ে উঠেছিল প্রচলিত রাজনীতির জন্য বড় হুমকি। কারণ, যদি এই ধারা সফল হতো, তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘদিনের সামন্ততান্ত্রিক কাঠামো ভেঙে পড়তে পারত।

হাদির রাজনীতি তরুণ, শিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে নতুন আগ্রহ তৈরি করেছিল। তার কর্মকাণ্ড দেখে যদি এই শ্রেণির মানুষ রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হতো, তাহলে চিরাচরিত লাঠিয়ালনির্ভর রাজনীতি টিকে থাকাই কঠিন হয়ে যেত। এই সম্ভাবনাই পুরোনো অভিজাতদের ভয় পাইয়ে দিয়েছিল। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাদির বিরুদ্ধে যে বুলিং ও বিদ্রূপ চলেছে, তার পেছনে এই ভয়ই বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন অনেকে।

যারা তাকে নিয়ে বিদ্রূপ করেছেন, তাদের বড় একটি অংশ আসলে দলীয় লাঠিয়াল সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত। ছাত্র সংগঠনসহ বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনে দীর্ঘদিন ধরে একই মুখ, একই বয়সের নেতারা নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। ৩৮ বছর বয়সেও কেউ যখন নিজেকে ছাত্রনেতা পরিচয় দেন, তখন সেটি নিজেই রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি করুণ চিত্র তুলে ধরে।

শহীদ ওসমান হাদি একজন সাধারণ মানুষ থেকে জননেতা হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সামন্ততান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে জননেতার জায়গাটি বরাবরই অভিজাতদের জন্য সংরক্ষিত ছিল। এই সীমারেখা অতিক্রম করার সাহস দেখিয়েছিলেন বলেই তাকে ‘ধৃষ্ট’ মনে করা হয়েছে। তাকে উপহাস করা হয়েছে, তার জনপ্রিয়তাকে তুচ্ছ করার চেষ্টা করা হয়েছে। অথচ বাস্তবে তিনি লড়াই করেছিলেন সেই সাধারণ মানুষের পক্ষেই, যারা আজও রাজনৈতিক অভিজাতদের ছায়ায় পড়ে আছে।

এখন প্রশ্ন, ওসমান হাদি কি ব্যর্থ? তার শাহাদতের পর ‘আমরা সবাই হাদি হব’—এই স্লোগানটি কেন ভাইরাল হলো? মানুষ কেন হাদি হতে চায়? এর উত্তর লুকিয়ে আছে রাজনৈতিক সামন্ততন্ত্র ভাঙার আকাঙ্ক্ষায়। প্রজা থেকে নাগরিক হয়ে ওঠার যে স্বপ্ন, হাদি তার প্রতীক হয়ে উঠেছেন।

আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে এই বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। ধারণা করা হচ্ছে, বিপুলসংখ্যক তরুণ ভোটার জীবনে প্রথমবারের মতো একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবেন। এই তরুণদের বড় অংশ কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রতি অন্ধ আনুগত্যে আবদ্ধ নয়। তারা স্বাধীনভাবে চিন্তা করে, প্রশ্ন তোলে, পরিবর্তন চায়। চব্বিশের বিপ্লব বা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পেছনেও এই তরুণদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

শহীদ ওসমান হাদির জানাজায় লাখো মানুষের উপস্থিতি তাই নিছক আবেগ নয়। এটি একটি বার্তা। এটি জানান দিচ্ছে, বাংলাদেশের মানুষ রাজনৈতিক সামন্ততন্ত্রের বাইরে একটি নতুন পথ খুঁজছে। প্রশ্ন একটাই—বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভিজাতরা কি এই পরিবর্তনের গণধ্বনি শুনতে পাচ্ছেন, নাকি তারা আবারও ইতিহাসের এই সতর্ক সংকেত উপেক্ষা করবেন?

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত