দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সুষ্ঠু নির্বাচনের ওপর: সিইসি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৩ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৮৪ বার
দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সুষ্ঠু নির্বাচনের ওপর: সিইসি

প্রকাশ: ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশ এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে—এমন বাস্তবতায় দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের ব্যর্থতার সুযোগ নেই বলে স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। মঙ্গলবার সকালে জেলা প্রশাসক (ডিসি), পুলিশ সুপার (এসপি)সহ মাঠ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে তিনি এই মন্তব্য করেন।

সিইসি বলেন, দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ওপর। অতীতে নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচন ব্যবস্থাকে ঘিরে যে অবিশ্বাস, বিতর্ক ও অপবাদ তৈরি হয়েছে, সেখান থেকে বেরিয়ে আসাই বর্তমান কমিশনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, “আমরা চাই আগের সব অপবাদ থেকে মুক্ত হতে। জনগণের আস্থা ফেরাতে চাই। এটা সম্ভব একমাত্র আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে।”

বৈঠকে উপস্থিত প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের উদ্দেশে সিইসি স্পষ্ট করে বলেন, নির্বাচন কমিশন একা কিছু করতে পারবে না; মাঠ প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনীর নিরপেক্ষ, সাহসী ও পেশাদার ভূমিকা ছাড়া গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অসম্ভব। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “আমরা প্রমাণ করতে চাই—সঠিক, সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আমরা করতে পারি। এই প্রমাণ দেওয়ার দায়িত্ব শুধু কমিশনের নয়, আপনাদের সবার।”

সিইসি নাসির উদ্দিন বলেন, আইন সবার জন্য সমান—এই নীতিতে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কেউ অপরাধ করলে, সে যে পরিচয় বা প্রভাবশালীই হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। তিনি বলেন, “কোনো অপরাধীকে ছাড় দেবেন না। যদি আজ আমরা নিরপেক্ষভাবে আইন প্রয়োগে ব্যর্থ হই, তাহলে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না।”

তিনি আরও বলেন, দেশ এখন এক যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। এই সময়ের ভুল সিদ্ধান্ত বা দায়িত্বহীনতা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। “আমরা যদি সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হই, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে জবাবদিহি করতে হবে,”—বলেন সিইসি।

বৈঠকে নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা, ভোটারদের নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগ নিশ্চিত করা এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে মাঠ প্রশাসনের সঙ্গে এই ধরনের সমন্বয়মূলক বৈঠক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতে একদিকে যেমন প্রস্তুতির ঘাটতি চিহ্নিত করা যায়, অন্যদিকে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে বার্তা স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠার জন্য কমিশনের এই ধরনের কঠোর বার্তা তাৎপর্যপূর্ণ। অতীতে বিভিন্ন নির্বাচনে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠেছে। ফলে ভোটার উপস্থিতি কমেছে, বিরোধী দলগুলোর অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এবং আন্তর্জাতিক মহলেও বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে সমালোচনা হয়েছে।

সিইসি নাসির উদ্দিন দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বারবার আইনের শাসন, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং জবাবদিহির কথা বলে আসছেন। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট যে, বর্তমান কমিশন আগের চর্চা থেকে বেরিয়ে এসে একটি ভিন্ন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চায়। তবে বাস্তবায়নই হবে আসল পরীক্ষা। কারণ মাঠ পর্যায়ে অনেক সময় রাজনৈতিক চাপ, স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ এবং প্রশাসনিক সংস্কৃতির দুর্বলতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

বৈঠকে অংশ নেওয়া কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সিইসির বক্তব্য অত্যন্ত সরাসরি ও দায়িত্বশীল ছিল। তাঁদের মতে, এমন স্পষ্ট বার্তা মাঠ প্রশাসনের ওপর নৈতিক চাপ তৈরি করে এবং দায়িত্ব পালনে সাহস জোগায়। তবে তারা এটাও স্বীকার করেন যে, শুধু নির্দেশনা দিলেই সব সমস্যার সমাধান হয় না; প্রয়োজন ধারাবাহিক তদারকি ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

নির্বাচন বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই বৈঠক ও সিইসির বক্তব্য নির্বাচন কমিশনের একটি কৌশলগত অবস্থান স্পষ্ট করছে। কমিশন চাইছে, নির্বাচনের সময় কোনো অনিয়ম বা সহিংসতার দায় যেন সরাসরি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর বর্তায় এবং তারা যেন শুরু থেকেই সতর্ক থাকে। এতে একদিকে যেমন কমিশনের দায়বদ্ধতা প্রকাশ পায়, অন্যদিকে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার চাপও বাড়ে।

জনগণের দৃষ্টিতেও এই বক্তব্যের গুরুত্ব কম নয়। দীর্ঘদিন ধরে ভোটাধিকার প্রয়োগ নিয়ে যে হতাশা তৈরি হয়েছে, তা কাটাতে হলে নির্বাচন কমিশনের পাশাপাশি প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দৃশ্যমানভাবে নিরপেক্ষ হতে হবে। ভোটাররা দেখতে চান, আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ হচ্ছে এবং কেউ ক্ষমতার জোরে ছাড় পাচ্ছে না।

সব মিলিয়ে, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রধান নির্বাচন কমিশনারের এই বক্তব্য শুধু একটি প্রশাসনিক নির্দেশনা নয়; এটি একটি নৈতিক ও ঐতিহাসিক দায় স্মরণ করিয়ে দেওয়া। এখন দেখার বিষয়, মাঠ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এই বার্তাকে কতটা আন্তরিকভাবে গ্রহণ করে এবং বাস্তবে কতটা প্রতিফলন ঘটাতে পারে। কারণ একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই পারে দেশের গণতান্ত্রিক যাত্রাকে নতুন করে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত