দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে ফিরছেন তারেক রহমান, ঢাকাজুড়ে প্রস্তুতি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৪ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৮৮ বার
১৭ বছর পর দেশে ফিরছেন তারেক রহমান, বিএনপিতে উচ্ছ্বাস

প্রকাশ: ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে দেশের মাটিতে ফিরছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সব জল্পনা-কল্পনার পর্দা নামিয়ে আগামীকাল বৃহস্পতিবার তার এই প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে নতুন মাত্রার উত্তাপ ও আবেগ। একদিকে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে উচ্ছ্বাস ও প্রত্যাশার ঢেউ, অন্যদিকে রাজধানী ঢাকাজুড়ে অভ্যর্থনা ও নিরাপত্তা ঘিরে ব্যাপক প্রস্তুতি—সব মিলিয়ে তারেক রহমানের ফেরা এখন শুধু একটি ব্যক্তিগত প্রত্যাবর্তন নয়, বরং একটি বড় রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আগামীকাল দুপুরের মধ্যেই স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমান ও একমাত্র কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমানকে সঙ্গে নিয়ে দেশের মাটিতে পা রাখবেন তারেক রহমান। লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দর থেকে আজ বুধবার সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিটে বাংলাদেশ বিমানের বাণিজ্যিক ফ্লাইটে রওনা হয়ে প্রথমে সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রাবিরতি করবেন তিনি। সেখানে প্রায় এক ঘণ্টা অবস্থানের পর বেলা ১১টা ৫৫ মিনিটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে তার।

তারেক রহমানের আগমনকে কেন্দ্র করে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরাজ করছে বিপুল উদ্দীপনা। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে নেতাকর্মীরা নিজ উদ্যোগে বাস, ট্রাক, মাইক্রোবাস এমনকি ব্যক্তিগত যানবাহনে করে ঢাকার পথে রওনা হয়েছেন। দলের নেতারা বলছেন, ভোর থেকেই রাজধানীর চারপাশের প্রবেশপথগুলো দিয়ে ঢাকামুখী জনস্রোত শুরু হতে পারে।

এই ঐতিহাসিক দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে বিএনপি ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের ঢাকা মহানগরের নেতাদের সমন্বয়ে গঠন করা হয়েছে শৃঙ্খলা কমিটি, যারা সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও ভিড় নিয়ন্ত্রণে কাজ করবে। পাশাপাশি নেতাকর্মীদের যাতায়াত সহজ করতে ১০টি রুটে বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। রেলপথ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এসব স্পেশাল ট্রেন পরিচালনার জন্য কিছু কমিউটার ট্রেনের নিয়মিত যাত্রা সাময়িকভাবে স্থগিত থাকবে।

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও অভ্যর্থনা কমিটির সদস্য সচিব রুহুল কবির রিজভী আশা প্রকাশ করে বলেছেন, তারেক রহমানের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রায় ৫০ লাখ মানুষের সমাগম হতে পারে। মঙ্গলবার সংবর্ধনাস্থল পরিদর্শন শেষে তিনি বলেন, আজ থেকেই বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ ঢাকায় আসতে শুরু করেছে। ২৫ ডিসেম্বর এই এলাকা মানুষের মহামিলন ও মহামেলায় পরিণত হবে। তিনি নিরাপত্তার বিষয়ে বলেন, নিরাপত্তার প্রথম দায়িত্ব সরকারের, এরপর দলের পক্ষ থেকেও সর্বোচ্চ সতর্কতা নেওয়া হয়েছে।

বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যরা তারেক রহমানকে স্বাগত জানাবেন। সেখান থেকে সাড়ে ১২টার দিকে তিনি বিমানবন্দর ছাড়বেন এবং নেতাকর্মীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে করতে সংবর্ধনাস্থলের দিকে রওনা হবেন। বিকেল ৩টার পর তিনি চিকিৎসাধীন বিএনপি চেয়ারপারসন ও তার মা খালেদা জিয়াকে দেখতে এভারকেয়ার হাসপাতালে যাবেন। সেখান থেকে সন্ধ্যার পর গুলশানের বাসভবনের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে।

নিরাপত্তা নিয়ে নেওয়া হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। বিএনপির পক্ষ থেকে কেনা বুলেটপ্রুফ গাড়িটি ইতোমধ্যে ঢাকায় পৌঁছেছে। টয়োটা ল্যান্ডক্রুজার প্রাডো এলসি ২৫০ মডেলের এই গাড়িটির রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেস অনুমোদন দিয়েছে বিআরটিএ। পাশাপাশি তার নিরাপত্তার জন্য একাধিক আগ্নেয়াস্ত্রের অনুমোদনও দেওয়া হয়েছে। বিমানবন্দর থেকে গুলশান পর্যন্ত যাতায়াতের সময় তিনি পাবেন পুলিশ প্রোটেকশনসহ বিশেষ নিরাপত্তা। ইউনিফর্মধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকের পুলিশও দায়িত্ব পালন করবে।

সংবর্ধনার মূল আয়োজন হবে রাজধানীর পূর্বাচলের দিকে ৩০০ ফিট সড়কের একটি অংশজুড়ে। বিশাল এই এলাকায় মঞ্চ নির্মাণের কাজ চলছে, যা আজ বুধবার রাতের মধ্যেই শেষ হওয়ার কথা। পুরো অনুষ্ঠান নির্বিঘ্ন করতে প্রায় ৯০০টি মাইক স্থাপন করা হচ্ছে, যা বিমানবন্দর থেকে শুরু করে উত্তরা, আবদুল্লাহপুর, বনানী, মহাখালী হয়ে কাঞ্চন ব্রিজ পর্যন্ত বিস্তৃত থাকবে। পাশাপাশি পুরো এলাকা সিসিটিভির আওতায় রাখা হবে।

নেতাকর্মীদের ভিড় ৩০০ ফিট ছাড়িয়ে বিমানবন্দর ও বনানী পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ডিজিটাল এলইডি ডিসপ্লে স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব ডিসপ্লেতে সরাসরি সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের দৃশ্য সম্প্রচার করা হবে, যাতে দূরের মানুষও অনুষ্ঠান দেখতে পারেন।

মানুষের বিশাল সমাগমের কথা মাথায় রেখে জরুরি স্বাস্থ্যসেবার জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে মেডিকেল টিম। বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা. রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, ৩০টি মোবাইল মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। এছাড়া বিমানবন্দর ও সংবর্ধনাস্থলের আশপাশের হাসপাতালগুলোকে সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে। ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও শহরের বিভিন্ন প্রবেশপথে মেডিকেল টিম থাকবে এবং সংবর্ধনাস্থলে অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্প ও অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত থাকবে।

বিমানবন্দর এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সিভিল অ্যাভিয়েশন কর্তৃপক্ষ আজ সন্ধ্যা থেকে ২৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যা পর্যন্ত নির্ধারিত যাত্রী ছাড়া সব ধরনের ভিজিটর প্রবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। একই সঙ্গে গত ১৮ ডিসেম্বর থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিমানবন্দর এলাকায় ড্রোন উড্ডয়ন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিশেষ প্রয়োজনে ড্রোন ওড়াতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে আসন বণ্টন, রাজনৈতিক কৌশল ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার পাশাপাশি তারেক রহমানকে ঢাকা থেকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অনুরোধ জানান কিছু নেতা। বৈঠকে সংবর্ধনা মঞ্চে কারা উপস্থিত থাকবেন, সেটিও চূড়ান্ত করা হয়।

দীর্ঘ প্রবাসজীবন শেষে তারেক রহমানের এই প্রত্যাবর্তন বিএনপির জন্য যেমন আবেগের, তেমনি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অনেকের মতে, এটি শুধু একজন নেতার দেশে ফেরা নয়, বরং আগামী দিনের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিতও বহন করছে। ঢাকাজুড়ে প্রস্তুতি, নেতাকর্মীদের ঢল ও সমর্থকদের প্রত্যাশা—সব মিলিয়ে ২৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য দিন হয়ে থাকতে যাচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত