প্রকাশ: ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণের বিষয়টি নিয়ে দেশি-বিদেশি নানা মহলে আলোচনা ও জল্পনা চললেও এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান যে স্পষ্ট ও অপরিবর্তিত, তা আবারও পরিষ্কার করে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, বর্তমান বাস্তবতায় আওয়ামী লীগ আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবে না। সরকারের এই অবস্থানের পেছনে রয়েছে দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম স্থগিত থাকা এবং নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে দল হিসেবে নিবন্ধন বাতিল হওয়ার বাস্তবতা।
বুধবার ২৪ ডিসেম্বর রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক নিয়মিত ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রেস সচিব শফিকুল আলম এ বিষয়ে কথা বলেন। ব্রিফিং চলাকালে এক সাংবাদিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচ আইনপ্রণেতার পাঠানো একটি চিঠির প্রসঙ্গ তুলে ধরেন, যেখানে রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাখা ও নির্বাচনসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সেই প্রশ্নের উত্তরে প্রেস সচিব বলেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে ওই চিঠিটি এখনো দেখেননি এবং বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন। তবে আওয়ামী লীগের নির্বাচনে অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে সরকারের অবস্থান একেবারেই স্পষ্ট।
প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, “আওয়ামী লীগের বিষয়ে আমাদের সরকারের অবস্থান পরিষ্কার। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম বর্তমানে স্থগিত রয়েছে এবং নির্বাচন কমিশন আওয়ামী লীগের দলীয় নিবন্ধন বাতিল করেছে। সে কারণে আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবে না।” তাঁর এই বক্তব্যের মাধ্যমে সরকার যে বিষয়টি নিয়ে কোনো ধরনের দ্বিধা বা অনিশ্চয়তায় নেই, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে উদ্দেশ করে যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচজন প্রভাবশালী আইনপ্রণেতা একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। চিঠিতে তাঁরা বাংলাদেশে আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং সেই লক্ষ্যে সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের কাজ করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। চিঠিটি ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়—সরকার কি রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ পুনর্বিবেচনা করবে কি না।
মার্কিন আইনপ্রণেতাদের ওই চিঠিতে বলা হয়, দেশের চলমান রাজনৈতিক সংকটের সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কাজ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের মতে, এর মাধ্যমে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হবে এবং জনগণ ব্যালট বাক্সের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের মতামত প্রকাশের সুযোগ পাবে। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সততা ও দলনিরপেক্ষতার প্রতি জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রমও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
চিঠিতে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের কথা উল্লেখ করা হয়। সেখানে বলা হয়, সরকার যদি রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম স্থগিত রাখে অথবা ত্রুটিপূর্ণ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনরায় চালু করে, তাহলে তা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য নেতিবাচক হতে পারে। এই মন্তব্যগুলো আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের নির্বাচন ও রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে বিদ্যমান উদ্বেগের প্রতিফলন হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।
এই চিঠিতে স্বাক্ষর করেন মার্কিন পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের পাঁচ সদস্য—গ্রেগরি ডব্লিউ মিকস, বিল হুইজেনগা, সিডনি কমলাগার-ডোভ, জুলি জনসন ও টম আর সুওজ্জি। তাঁদের মধ্যে গ্রেগরি ডব্লিউ মিকস প্রতিনিধি পরিষদের ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির সদস্য হিসেবে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। বিল হুইজেনগা ও সিডনি কমলাগার-ডোভ যথাক্রমে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক উপকমিটির চেয়ারম্যান ও সদস্য। চিঠিটি শুধু অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছেই পাঠানো হয়নি, বরং ‘হাউস ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির’ ওয়েবসাইটেও প্রকাশ করা হয়েছে, যা এটিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রেস সচিবের বক্তব্য সরকারের অবস্থানকে নতুন করে পরিষ্কার করল বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাঁদের মতে, আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ ও পরামর্শ থাকা সত্ত্বেও অন্তর্বর্তী সরকার এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ও নির্বাচনী অংশগ্রহণের বিষয়ে কোনো নমনীয়তার ইঙ্গিত দেয়নি। বরং আইনি ও সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে থেকেই সরকার তাদের সিদ্ধান্তে অটল রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম স্থগিত ও দলীয় নিবন্ধন বাতিলের বিষয়টি শুধু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি একটি আইনি প্রক্রিয়ার ফল। নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত কার্যকর থাকা অবস্থায় সরকার চাইলেও এই অবস্থান থেকে সরে আসা সহজ নয়। আবার অন্য একটি অংশের মতে, আন্তর্জাতিক চাপ ও কূটনৈতিক বাস্তবতার কারণে ভবিষ্যতে সরকারকে আরও ব্যাখ্যামূলক অবস্থান নিতে হতে পারে।
এদিকে সাধারণ জনগণের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কেউ কেউ মনে করছেন, নির্বাচন যদি সত্যিকার অর্থে অবাধ ও সুষ্ঠু হতে হয়, তাহলে সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আবার অনেকে বলছেন, আইন ও সংবিধানের ঊর্ধ্বে কোনো দল হতে পারে না; নিবন্ধন বাতিল ও কার্যক্রম স্থগিত থাকা অবস্থায় নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রশ্নই ওঠে না।
অন্তর্বর্তী সরকার শুরু থেকেই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একটি নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য পরিবেশ তৈরির কথা বলে আসছে। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে তার দায়িত্ব পালন করবে এবং সরকার সেখানে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করবে না। প্রেস সচিবের সর্বশেষ বক্তব্য সেই ঘোষণারই ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, আওয়ামী লীগের আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রশ্নে সরকারের অবস্থান আপাতত চূড়ান্ত বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ, কূটনৈতিক বার্তা এবং দেশের ভেতরের রাজনৈতিক চাপ—সবকিছুর মাঝেও সরকার যে তার ঘোষিত অবস্থান থেকে সরে আসছে না, প্রেস সচিব শফিকুল আলমের বক্তব্যে তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এখন দেখার বিষয়, এই অবস্থান ভবিষ্যতে কীভাবে নির্বাচনী রাজনীতির সমীকরণকে প্রভাবিত করে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ নিয়ে আলোচনার গতিপথ কোন দিকে মোড় নেয়।