প্রকাশ: ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আসন সমঝোতা ও রাজনৈতিক বোঝাপড়া নিয়ে যখন নানা আলোচনা ও জল্পনা চলছে, তখন নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি—এনসিপি। দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব সাফ জানিয়ে দিয়েছে, অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আসন সমঝোতা হলেও এনসিপির প্রার্থীরা দলীয় প্রতীক শাপলা কলি নিয়েই নির্বাচনে অংশ নেবেন। কোনো অবস্থাতেই ধানের শীষ বা অন্য কোনো প্রতীকে এনসিপির কেউ ভোটের মাঠে নামবেন না।
বুধবার দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এই অবস্থানের কথা জানান। তার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এনসিপি কেবল অংশগ্রহণ নয়, বরং নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় ও সাংগঠনিক স্বাতন্ত্র্য অটুট রাখার কৌশলেই এগোতে চায়।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, এনসিপির কেউ ধানের শীষ বা অন্য কোনো প্রতীকে নির্বাচন করবে না। যদি কারও সঙ্গে আসন সমঝোতা হয় কিংবা আলোচনা হয়, তবুও এনসিপির প্রার্থীরা শাপলা কলি প্রতীকেই নির্বাচন করবেন। তার ভাষায়, প্রতীক শুধু একটি চিহ্ন নয়, এটি দলের আদর্শ, দর্শন ও রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিফলন। এই প্রতীক দিয়েই জনগণের কাছে নিজেদের বার্তা পৌঁছে দিতে চায় এনসিপি।
এনসিপির এই কঠোর অবস্থান এমন এক সময়ে এলো, যখন রাজনৈতিক অঙ্গনে আসন সমঝোতা নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে জোট ও সমঝোতার পথ খুঁজছে। এই প্রেক্ষাপটে এনসিপির বক্তব্য ইঙ্গিত দিচ্ছে, দলটি আপসের রাজনীতিতে গেলেও পরিচয়ের প্রশ্নে কোনো ছাড় দিতে প্রস্তুত নয়।
একই সঙ্গে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে নিজেদের অবস্থানও পরিষ্কার করেছে এনসিপি। দলটি ভোটের তারিখ পেছানোর বিপক্ষে এবং ঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী আগামী ১২ ফেব্রুয়ারিতেই নির্বাচন চায়। তবে এই নির্বাচন ঘিরে শঙ্কা ও উদ্বেগের কথাও প্রকাশ করেছেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তার বক্তব্যে উঠে এসেছে দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, সার্বিক বিবেচনায় শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া এখনো সম্পূর্ণ হয়নি এবং খুনিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা যায়নি। দেশের বিভিন্ন জায়গায় যে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিরাজ করছে, সেটিও নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ। এসব বাস্তবতা সামনে রেখেই তারা নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে কথা বলেছেন। তবুও এনসিপির অবস্থান স্পষ্ট—নির্ধারিত তারিখ পেছানো যাবে না।
তিনি অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ ও ভারতের একটি পক্ষ দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ অস্থিতিশীল করে নির্বাচন পেছানোর চেষ্টা করছে। তার দাবি, এই ধরনের তৎপরতা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য হুমকি। সে কারণেই এনসিপি নির্বাচন কমিশনকে স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, ঘোষিত তারিখে নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি যেন অব্যাহত রাখা হয়।
নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে নিজেদের প্রার্থীদের প্রতিও নির্দেশনা দিয়েছে এনসিপি। নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী জানান, দলের সব প্রার্থীকে নির্বাচন কমিশনের বিধিমালা কঠোরভাবে মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের কাছেও দাবি জানানো হয়েছে, সব রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা নিয়েও সরাসরি সন্দেহ প্রকাশ করেন এনসিপির এই শীর্ষ নেতা। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের ওপর তাদের কিছুটা আস্থা থাকলেও পুরোপুরি আশ্বস্ত হওয়ার মতো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি। নিরাপত্তার প্রশ্নে তিন বাহিনীর সঙ্গে ইসির আলোচনা হয়েছে বলে তিনি জানান। বাহিনীগুলোর ভূমিকা নিয়ে এনসিপি আস্থা রাখতে চায় এবং এ বিষয়ে কিছুটা আশ্বস্ত হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তবে বাস্তব চিত্র তুলে ধরে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, মাঠপর্যায়ে এখনো নানা বিশৃঙ্খলা দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন জায়গায় প্রার্থীরা মনোনয়ন ফরম তুলতে গেলে বাধা, উত্তেজনা ও অরাজকতার খবর পাওয়া যাচ্ছে। এসব বিষয় নির্বাচন কমিশনকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তার মতে, শুধু নির্বাচন ভবন বা কমিশনের আশপাশে নিরাপত্তা জোরদার করলেই চলবে না; দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের রাজনৈতিক কার্যালয় ও প্রার্থীদের চলাচলের ক্ষেত্রেও সমানভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের চারপাশে নিরাপত্তা থাকলেও দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক দলগুলোর অফিসে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নেই। এই বিষয়টি ইসিকে জানানো হয়েছে এবং কমিশন তাদের আশ্বস্ত করেছে যে, নিরাপত্তার চাদর আরও বিস্তৃত করা হবে। এনসিপি আশা করছে, বাস্তব পর্যায়ে এই আশ্বাসের প্রতিফলন দেখা যাবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এনসিপির এই বক্তব্য একদিকে যেমন দলটির স্বতন্ত্র অবস্থানকে তুলে ধরছে, অন্যদিকে আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিদ্যমান উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার কথাও প্রকাশ করছে। শাপলা কলি প্রতীককে ঘিরে অনড় অবস্থান দলটির আদর্শিক দৃঢ়তার বার্তা দিচ্ছে, আবার নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা ভবিষ্যৎ নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই রাজনৈতিক অঙ্গনে বক্তব্য, পাল্টা বক্তব্য ও অবস্থান স্পষ্ট করার প্রবণতা বাড়ছে। এনসিপির সর্বশেষ এই অবস্থান সেই রাজনৈতিক বাস্তবতারই প্রতিফলন। শাপলা কলি প্রতীকে নির্বাচন, নির্ধারিত তারিখে ভোট আয়োজন এবং নিরাপত্তা ও সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি—সব মিলিয়ে এনসিপি নির্বাচনী মাঠে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিতে প্রস্তুত বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।