প্রকাশ: ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দীর্ঘ ১৭ বছর পর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে প্রত্যাবর্তন ঘিরে রাজধানী ঢাকায় তৈরি হয়েছে এক ব্যতিক্রমী চিত্র। যেখানে প্রতিদিনের ঢাকা মানেই যানজট, মানুষের ভিড় আর ব্যস্ততার চেনা দৃশ্য, সেখানে আজ যেন এক নীরব, শান্ত নগরী। বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে—নেই চিরচেনা যানবাহনের চাপ, নেই মানুষের ভিড়, অনেক জায়গায় দোকানপাটও বন্ধ। পুরো শহর যেন হঠাৎ করেই দীর্ঘ ছুটির আবহে ঢুকে পড়েছে।
সকাল থেকে পুরান ঢাকা, সায়েন্সল্যাব, আজিমপুর, লালবাগ, কাঁটাবন, শাহবাগ ও পল্টন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সড়কে যান চলাচল অত্যন্ত সীমিত। যে সড়কগুলোতে সাধারণত সকাল থেকেই যানজটে নাকাল হতে হয়, সেগুলো আজ অনেকটাই ফাঁকা। কোথাও কোথাও দু–একটি বাস, রিকশা কিংবা ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচল করতে দেখা গেলেও তাতে কোনো চাপ নেই। সিগন্যালগুলোতে গাড়ির দীর্ঘ সারি বা হর্নের শব্দ আজ অনুপস্থিত।
এলাকাভিত্তিক দোকানপাটেও ছিল ভিন্ন চিত্র। আজিমপুর ও লালবাগের অনেক দোকানই সকাল থেকে বন্ধ। কাঁটাবন ও শাহবাগ এলাকায় যেসব দোকান খোলা ছিল, সেখানেও ক্রেতার উপস্থিতি ছিল খুবই কম। কয়েকজন পথচারীর সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, দীর্ঘদিন পর তারেক রহমান দেশে ফিরছেন—এই খবরেই বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা ভোর থেকেই সংবর্ধনাস্থলের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। ফলে সাধারণ মানুষের চলাচল কমে গেছে এবং অনেক ব্যবসায়ী দোকান খুলতে আগ্রহ দেখাননি।
একজন পথচারী বলেন, আজকের ঢাকাকে দেখে মনে হচ্ছে যেন ঈদের ছুটির দিন। সাধারণ কর্মদিবসে যেখানে মানুষের পা ফেলার জায়গা থাকে না, সেখানে আজ খোলা সড়ক দেখে অবাক লাগছে। তার মতে, রাজনৈতিক কোনো ঘটনার প্রভাব যে পুরো শহরের চিত্র বদলে দিতে পারে, আজ সেটিই চোখে পড়ছে।
শুধু পুরান ঢাকা নয়, রাজধানীর উত্তর অংশেও একই চিত্র দেখা গেছে। ঢাকা উত্তর সিটির মিরপুর, শেওড়াপাড়া, আগারগাঁও, ফার্মগেট ও মগবাজার এলাকাগুলোতে যান চলাচল ছিল খুবই সীমিত। রাস্তায় দেখা গেছে মূলত অফিসগামী কিছু চাকরিজীবী আর দু–একটি গণপরিবহন। সাধারণ যাত্রী বা ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো নয়।
একজন পাঠাও চালক মিরাজ বলেন, “আজ সকাল থেকে যাত্রী পাচ্ছি না। সবাই তো তারেক রহমানকে দেখার জন্য সংবর্ধনাস্থলে চলে গেছে। রাস্তায় মানুষই নেই, তাই কাজও নেই।” তার মতো আরও কয়েকজন রাইড শেয়ারিং চালক জানান, আজকের দিনটি তাদের জন্য একেবারেই ভিন্ন। সাধারণত সকালে যে পরিমাণ যাত্রী পাওয়া যায়, আজ তার অর্ধেকও পাওয়া যাচ্ছে না।
গণপরিবহনেও একই অবস্থা। শিলড় পরিবহনের হেলপার জাহেদুল বলেন, “সকালে বাস বের করলেও যাত্রী নেই। মানুষ আগে থেকেই সংবর্ধনাস্থলে চলে গেছে। আজ বাস প্রায় খালিই চলাচল করছে।” তার ভাষায়, এমন দৃশ্য সাধারণত বড় ছুটির দিন ছাড়া দেখা যায় না।
রাজধানীর এই ফাঁকা চিত্রের পেছনে মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে তারেক রহমানের দেশে ফেরা উপলক্ষে বিএনপির পক্ষ থেকে আয়োজিত বিশাল গণসংবর্ধনা। দলীয় সূত্র জানায়, প্রায় ৩০০ ফিট লম্বা সংবর্ধনা মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে নেতাকর্মীরা ঢাকায় এসেছেন এই আয়োজনকে ঘিরে। অনেকেই ভোর রাতেই বাস, ট্রাক কিংবা ব্যক্তিগত যানবাহনে করে সংবর্ধনাস্থলে পৌঁছেছেন।
তারেক রহমান স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমান ও কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমানকে সঙ্গে নিয়ে আজ দুপুর নাগাদ দেশে ফিরছেন। বিমানবন্দর থেকে সরাসরি তিনি এভারকেয়ার হাসপাতালে গিয়ে মায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। এরপর সেখান থেকে সংবর্ধনাস্থলে যাওয়ার কথা রয়েছে। এই কর্মসূচিকে ঘিরেই রাজধানীর বড় একটি অংশ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার যানজট মূলত মানুষের অতিরিক্ত চলাচল ও যানবাহনের চাপের ফল। আজকের চিত্র প্রমাণ করে, মানুষের চলাচল কমলে রাজধানী কতটা স্বস্তিদায়ক হতে পারে। তবে তারা এটাও বলছেন, এই স্বস্তি সাময়িক। রাজনৈতিক কর্মসূচি শেষ হলে আবারও ঢাকা ফিরবে তার চিরচেনা রূপে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকেও আজ সতর্ক অবস্থান দেখা গেছে। গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও সড়কে পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতি ছিল, তবে যানজট নিয়ন্ত্রণের মতো বাড়তি তৎপরতা প্রয়োজন হয়নি। একজন ট্রাফিক পুলিশ সদস্য বলেন, আজ ডিউটি তুলনামূলকভাবে সহজ। গাড়ির চাপ কম থাকায় সড়কে শৃঙ্খলা বজায় রাখা সহজ হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, তারেক রহমানের দীর্ঘদিন পর দেশে প্রত্যাবর্তন শুধু রাজনৈতিক অঙ্গনেই নয়, রাজধানীর দৈনন্দিন জীবনযাত্রাতেও স্পষ্ট প্রভাব ফেলেছে। একদিনের জন্য হলেও ঢাকা যেন তার চেনা ব্যস্ততা ভুলে গিয়ে শান্ত হয়ে উঠেছে। ফাঁকা সড়ক, বন্ধ দোকান আর যাত্রীহীন বাস—সবকিছু মিলিয়ে আজকের ঢাকা এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা দিচ্ছে নগরবাসীকে।