শরীয়তপুর-১ আসনে বিএনপি প্রার্থী নিয়ে তৃণমূলে ক্ষোভ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৫ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৮০ বার
শরীয়তপুর-১ আসনে বিএনপি প্রার্থী নিয়ে তৃণমূলে ক্ষোভ

প্রকাশ: ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই শরীয়তপুর-১ (সদর ও জাজিরা) আসনে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়ছে। বিশেষ করে বিএনপির প্রার্থী ঘোষণা ঘিরে তৃণমূল পর্যায়ে যে বিভক্তি তৈরি হয়েছে, তা এখন প্রকাশ্য অসন্তোষে রূপ নিয়েছে। স্থানীয় রাজনীতিতে এই অন্তর্কোন্দল শুধু দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে সাধারণ ভোটারদের মনোভাবেও। অনেক ভোটারই এখন দোটানায়—কাকে সমর্থন করবেন, কোন পথে যাবেন।

বিএনপি কেন্দ্রীয়ভাবে এই আসনে দলের প্রার্থী হিসেবে সাঈদ আহমেদ আসলামের নাম ঘোষণা করার পর থেকেই শরীয়তপুরে শুরু হয় টানাপোড়েন। সাঈদ আহমেদ আসলাম জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক হলেও স্থানীয় নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশ তাকে ‘অ-স্থানীয়’ এবং ‘তৃণমূলের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন’ বলে অভিযোগ তুলেছেন। তাদের দাবি, তিনি দীর্ঘদিন ধরে এই আসনে সক্রিয় ছিলেন না এবং স্থানীয় রাজনৈতিক বাস্তবতা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণাও তার নেই।

এই মনোনয়নকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন কালু। দলীয় মনোনয়ন থেকে বঞ্চিত হওয়ার পর তার সমর্থকেরা রাজপথে নেমে পড়েছেন। কয়েক দিন ধরে শরীয়তপুর শহর ও আশপাশের এলাকায় মানববন্ধন, বিক্ষোভ সমাবেশ, মশাল মিছিল এমনকি সড়ক অবরোধের মতো কর্মসূচিও পালন করা হয়েছে। এসব কর্মসূচিতে একটাই দাবি জোরালোভাবে উচ্চারিত হয়েছে—কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে প্রার্থী পরিবর্তন করতে হবে।

বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীদের বক্তব্যে উঠে এসেছে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ। তারা বলছেন, যিনি বছরের পর বছর মাঠে কাজ করেছেন, আন্দোলন-সংগ্রামে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাকে বাদ দিয়ে অন্য এলাকা থেকে প্রার্থী চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের মতে, এটি শুধু একজন ব্যক্তিকে অবমূল্যায়ন নয়, বরং পুরো তৃণমূলকে উপেক্ষা করার শামিল।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বিক্ষোভের সময় একাধিক স্থানে টায়ার জ্বালিয়ে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে এবং দলীয় স্লোগানের পাশাপাশি মনোনয়ন বাতিলের দাবিতে স্লোগান দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, দলীয় অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে সাধারণ ভোটাররাও বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রবীণ ভোটার বলেন, বিএনপি যদি নিজেরাই এক থাকতে না পারে, তাহলে নির্বাচনে তারা কীভাবে শক্ত অবস্থান নেবে? আমরা সাধারণ মানুষ হিসেবে এখন বুঝতে পারছি না, কাকে সমর্থন দেওয়া উচিত।

শরীয়তপুর পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আলী আজম সরদার স্পষ্ট ভাষায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শরীয়তপুর-১ আসনে অন্য একটি নির্বাচনি এলাকা থেকে একজন নেতাকে এনে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকে বাদ দেওয়া হয়েছে, যা তৃণমূল সহজভাবে নিতে পারছে না। মনোনয়ন পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে বলেও তিনি জানান।

একই সুর শোনা গেছে সদর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক নাজমুল ছৈয়ালের কণ্ঠে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সাঈদ আহমেদ জেলা পর্যায়ের নেতা হলেও তিনি শরীয়তপুর-৩ নির্বাচনি এলাকার বাসিন্দা। এতে করে শরীয়তপুর-১ আসনের নেতাকর্মীরা নিজেদের অবহেলিত মনে করছেন।

বিএনপির এই অভ্যন্তরীণ সংকটের সুযোগ কাজে লাগাতে শুরু করেছে অন্যান্য রাজনৈতিক দল। জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ইতোমধ্যে মাঠে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। প্রতিদিনই তারা বিভিন্ন গ্রাম ও মহল্লায় গণসংযোগ করছেন, সভা করছেন এবং ভোটারদের কাছে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছেন।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে এ আসনে প্রার্থী করা হয়েছে ড. মোশাররফ হোসেন মাসুদকে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী হিসেবে মাঠে আছেন তোফায়েল আহমেদ কাসেমী। পাশাপাশি জাতীয় নাগরিক পার্টি, জাকের পার্টি ও খেলাফত মজলিসের প্রার্থীরাও ধীরে ধীরে প্রচার জোরদার করছেন।

জামায়াত নেতা ইঞ্জিনিয়ার লোকমান হোসাইন বলেন, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দুর্নীতির কারণে মানুষ বিকল্প খুঁজছে। সুষ্ঠু ভোট হলে জনগণ ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক রাজনীতিকেই বেছে নেবে। তার মতে, বিএনপির অন্তর্দ্বন্দ্ব তৃণমূল ভোটারদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।

স্থানীয় ভোটারদের কথাবার্তায়ও এই পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। শরীয়তপুর সদর উপজেলার পালং এলাকার মধ্যবয়সি ভোটার শহি মাদবর বলেন, আমরা দল দেখি না, মানুষ দেখি। যে এই এলাকার উন্নয়ন করবে, দেশের জন্য ভালো করবে, তাকেই ভোট দেব। কিন্তু দলগুলোর ভেতরের কোন্দল আমাদের বিভ্রান্ত করছে।

জাজিরা উপজেলার তরুণ ভোটার পলাশ খান বলেন, আগে মনে করতাম বিএনপিই একমাত্র বিকল্প। কিন্তু এখন যদি তারা নিজেরাই এক থাকতে না পারে, তাহলে অন্যদের কথাও ভাবতে হচ্ছে। যারা সুশাসন ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলবে, তাদের দিকেই ঝুঁকছি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই আসনে বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিভক্তি দীর্ঘস্থায়ী হলে তা নির্বাচনের ফলাফলে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। শরীয়তপুরের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তোয়াব হোসেন বলেন, বাংলাদেশের নির্বাচনি রাজনীতিতে তৃণমূলকে উপেক্ষা করলে তার প্রতিক্রিয়া অবশ্যম্ভাবী। শরীয়তপুর-১ আসনে যদি বিএনপি দ্রুত ঐক্যে ফিরতে না পারে, তাহলে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো স্পষ্টভাবে লাভবান হবে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) শরীয়তপুর জেলার সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম বলেন, তাদের অবস্থান দল-নিরপেক্ষ। তার মতে, ভোটারদের উচিত দলীয় আবেগের বাইরে এসে প্রার্থীর সততা, গ্রহণযোগ্যতা ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা বিবেচনা করা। তিনি বলেন, বিএনপি হোক বা অন্য কোনো দল—জনগণ এমন প্রতিনিধি চায়, যিনি সুশাসন, জবাবদিহি ও আইনের শাসন নিশ্চিত করবেন।

সব মিলিয়ে শরীয়তপুর-১ আসনে নির্বাচনি লড়াই ক্রমেই বহুমুখী ও জটিল হয়ে উঠছে। একদিকে বিএনপির অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ ও বিভক্তি, অন্যদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর সক্রিয় প্রচার—সবকিছু মিলিয়ে ভোটের মাঠ এখন উত্তপ্ত। শেষ পর্যন্ত এই দ্বন্দ্ব ও সমীকরণ ভোটারদের রায়কে কোন দিকে নিয়ে যায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত