প্রকাশ: ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদির স্মৃতি, আদর্শ ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে সামনে রেখে ঢাকা-৮ আসনে নির্বাচনী লড়াইয়ে নামার ঘোষণা দিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দিন পাটওয়ারী। সোমবার বিকেলে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে জানান, হাদির প্রত্যাশিত আসন থেকেই তিনি জনগণের রায়ে পরীক্ষিত হতে চান। এনসিপির প্রতীক ‘শাপলা কলি’ নিয়ে নির্বাচন করবেন বলেও এদিন স্পষ্ট করেন তিনি।
ঢাকা-৮ আসন শুধু একটি ভৌগোলিক নির্বাচনী এলাকা নয়, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি এক গভীর আবেগ, প্রতিবাদ ও আত্মত্যাগের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই আসনেই ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদি রাজনৈতিক সংগ্রামের এক পর্যায়ে শহীদ হন। তার মৃত্যুর পর এই আসনকে কেন্দ্র করে যে রাজনৈতিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতার কথা উচ্চারিত হচ্ছে, নাসীরুদ্দিন পাটওয়ারীর প্রার্থিতা সেই দায়বদ্ধতাকেই নতুন করে সামনে এনেছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় নাসীরুদ্দিন পাটওয়ারী বলেন, তিনি কোনো ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে নয়, বরং হাদির দেখা স্বপ্ন ও অসমাপ্ত কাজ বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়েই এই আসনে দাঁড়িয়েছেন। তার ভাষায়, “হাদির প্রত্যাশিত আসনে আমি দাঁড়িয়েছি তার স্বপ্ন দেখা সকল কাজ করার জন্য।” এই বক্তব্যে রাজনৈতিক বার্তার পাশাপাশি এক ধরনের আত্মত্যাগী মানসিকতার প্রতিফলনও দেখা যায়।
তিনি আরও বলেন, ঢাকা-৮ আসনে প্রার্থী হতে অনেকেই সাহস পান না, কারণ এখানে রাজনৈতিক বাস্তবতা কঠিন এবং চ্যালেঞ্জ বহুমাত্রিক। তার মতে, এই আসনটি হাদির আসন, যেখানে তিনি জীবন দিয়েছেন। সেই বাস্তবতা স্মরণ করিয়ে দিয়ে নাসীরুদ্দিন বলেন, “আমি যদি শহীদ হই, তাহলে আপনারা বাংলাদেশটাকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন।” তার এই বক্তব্য সমর্থকদের মধ্যে আবেগের সঞ্চার করলেও রাজনৈতিক অঙ্গনে তা ভিন্ন মাত্রার আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতারা মনে করছেন, নাসীরুদ্দিন পাটওয়ারীর প্রার্থিতা শুধুই একটি নির্বাচনী কৌশল নয়, বরং এটি একটি রাজনৈতিক অবস্থান। ইনকিলাব মঞ্চের আন্দোলন, হাদির হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি এবং ‘ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র’ গড়ার যে বয়ান এনসিপি দীর্ঘদিন ধরে তুলে ধরছে, ঢাকা-৮ আসনে সেই বয়ানের বাস্তব পরীক্ষা হতে যাচ্ছে। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, শাপলা কলি প্রতীক নিয়ে এই আসনে গণসংযোগ, উঠান বৈঠক ও মতবিনিময়ের প্রস্তুতি ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকা-৮ আসনের নির্বাচন এবার শুধু দলীয় শক্তিমত্তার হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং এটি হয়ে উঠবে নৈতিকতা, স্মৃতি ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার প্রতিযোগিতা। হাদির মৃত্যুর পর এই এলাকায় যে সামাজিক সচেতনতা তৈরি হয়েছে, তা ভোটের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে হাদির নাম ও ইনকিলাব মঞ্চের আন্দোলনের প্রতি যে আবেগ কাজ করছে, নাসীরুদ্দিন পাটওয়ারী সেটিকে নিজের রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে চাইছেন।
নাসীরুদ্দিন পাটওয়ারী দীর্ঘদিন ধরেই ছাত্র ও নাগরিক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক হিসেবে তিনি বিভিন্ন সময়ে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে সরব ছিলেন। হাদির হত্যাকাণ্ডের পরও তিনি বিচার দাবিতে রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। সেই ধারাবাহিকতায় এবার সংসদীয় রাজনীতিতে অংশ নেওয়াকে অনেকেই তার রাজনৈতিক পথচলার একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবে দেখছেন।
ঢাকা-৮ আসনে এর আগে যারা প্রার্থী হয়েছেন বা হতে আগ্রহী ছিলেন, তাদের অনেকেই নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ঝুঁকির কথা বিবেচনায় রেখে পিছু হটেছেন—এমন কথাও শোনা যায়। সেই প্রেক্ষাপটে নাসীরুদ্দিনের প্রার্থিতা এক ধরনের বার্তা বহন করে যে, এনসিপি ভয় বা চাপের রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। বরং দলটি শহীদদের স্মৃতি ধারণ করেই সামনে এগোতে চায়।
তবে সমালোচকরাও রয়েছেন। তাদের মতে, আবেগ ও শহীদ স্মৃতির রাজনীতি দীর্ঘমেয়াদে কতটা কার্যকর হবে, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। তারা বলছেন, ভোটাররা শেষ পর্যন্ত উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও বাস্তব রাজনৈতিক পরিকল্পনার দিকেই বেশি নজর দেবেন। এই সমালোচনার জবাবে এনসিপির নেতারা বলছেন, হাদির স্বপ্নের বাংলাদেশ মানেই ছিল ন্যায়বিচার, ইনসাফ ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা—যা উন্নয়নের মৌলিক ভিত্তি।
মনোনয়নপত্র জমাদানের দিন রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ের সামনে দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। তারা শাপলা কলি প্রতীক ও হাদির ছবি সংবলিত প্ল্যাকার্ড হাতে ন্যায়বিচার ও ইনসাফের স্লোগান দেন। উপস্থিত অনেকেই বলেন, এই নির্বাচন শুধু একজন প্রার্থী জেতার লড়াই নয়, বরং একটি আদর্শকে প্রতিষ্ঠা করার সংগ্রাম।
সব মিলিয়ে, ঢাকা-৮ আসনে নাসীরুদ্দিন পাটওয়ারীর প্রার্থিতা আগামী নির্বাচনের রাজনীতিতে একটি আলাদা মাত্রা যোগ করেছে। এটি একদিকে যেমন এনসিপির জন্য বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা, অন্যদিকে হাদির স্মৃতি ও স্বপ্নকে সংসদীয় রাজনীতিতে কতটা রূপ দেওয়া যায়—তারও এক বাস্তব মূল্যায়ন। ভোটের মাঠে এই বার্তা কতটা গ্রহণযোগ্যতা পায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।