প্রকাশ: ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ আগামী ৬ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এই তারিখ ঘোষণায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের জরুরি সিন্ডিকেট সভায় সর্বসম্মতিক্রমে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নির্বাচন আয়োজনের সব প্রস্তুতি নতুন তারিখ অনুযায়ী দ্রুত সম্পন্ন করার নির্দেশনা দিয়েছে।
এর আগে পূর্বঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী আজ মঙ্গলবার সকাল ৯টা থেকে জকসু ও হল সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ভোরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর খবরে দেশে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে শোকের প্রতি সম্মান জানিয়ে সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রেজাউল করিম তাৎক্ষণিকভাবে জকসু নির্বাচন স্থগিতের ঘোষণা দেন।
নির্বাচন স্থগিতের ঘোষণার খবর ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। ভোট দিতে আসা শিক্ষার্থী, প্রার্থী ও বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীরা সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানাতে শুরু করেন। সকাল থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ভবন ও খোলা জায়গায় বিক্ষোভ জমে ওঠে। অনেক শিক্ষার্থী অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিনের অপেক্ষা, প্রচারণা ও প্রস্তুতির পর ভোটের দিন সকালে নির্বাচন স্থগিত করা তাদের প্রতি অবিচার।
এক পর্যায়ে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী ও প্রার্থীরা উপাচার্য ভবন ঘেরাও করে বিক্ষোভ কর্মসূচি শুরু করেন। কয়েক ঘণ্টা ধরে স্লোগান, বক্তব্য ও অবস্থান কর্মসূচির মধ্য দিয়ে তারা দ্রুত নতুন তারিখ ঘোষণার দাবি জানান। শিক্ষার্থীদের ভাষ্য ছিল, রাষ্ট্রীয় শোক পালন অবশ্যই সম্মানের বিষয়, তবে ভোটের দিন হঠাৎ করে নির্বাচন স্থগিত করায় তাদের সময়, অর্থ ও শ্রম সবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের এই তীব্র আন্দোলনের মুখে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আবারও সিন্ডিকেট সভা আহ্বান করে। বিকেলে অনুষ্ঠিত জরুরি সিন্ডিকেট সভায় নির্বাচন পরিস্থিতি, আইনশৃঙ্খলা, শিক্ষার্থীদের আবেগ ও সামগ্রিক বাস্তবতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সভা শেষে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রেজাউল করিম শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন।
উপাচার্য বলেন, আমরা শিক্ষার্থীদের আবেগ ও দাবির প্রতি শ্রদ্ধাশীল। রাষ্ট্রীয় শোকের কারণে আজকের নির্বাচন স্থগিত করা হলেও শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবির প্রেক্ষিতে দ্রুত নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি জানান, আগামী ৬ জানুয়ারি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ ও হল সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং এ বিষয়ে আর কোনো অনিশ্চয়তা থাকবে না।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বদ্ধপরিকর। ভোটগ্রহণের দিন যাতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা নিরাপত্তাজনিত সমস্যা না হয়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শিক্ষার্থীদের প্রতি শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে উপাচার্য বলেন, শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণই এই নির্বাচনের প্রাণ, তাই সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।
জানা গেছে, নতুন তারিখ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন খুব শিগগিরই সংশোধিত নির্দেশনা ও প্রয়োজনীয় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করবে। ভোটকেন্দ্র, ব্যালট পেপার, নিরাপত্তা এবং পর্যবেক্ষক সংক্রান্ত বিষয়গুলো পুনরায় সমন্বয় করা হবে। প্রার্থীদের প্রচারণা ও অন্যান্য কার্যক্রমও নতুন সময়সূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিচালিত হবে।
জকসু নির্বাচনকে ঘিরে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই প্রবল আগ্রহ ছিল। অনেক বছর পর এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় শিক্ষার্থীরা এটিকে নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছেন। বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় ছিলেন, প্রচারণায় মুখর ছিল পুরো ক্যাম্পাস।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মনে করছেন, নতুন তারিখ ঘোষণার মাধ্যমে অন্তত অনিশ্চয়তার অবসান হয়েছে। আন্দোলনে অংশ নেওয়া এক শিক্ষার্থী বলেন, ভোটের দিন হঠাৎ নির্বাচন স্থগিত হওয়ায় আমরা হতাশ হয়েছিলাম। তবে দ্রুত নতুন তারিখ ঘোষণা করায় প্রশাসনের প্রতি আস্থা কিছুটা ফিরেছে। এখন আমরা চাই ৬ জানুয়ারি কোনো ধরনের বাধা ছাড়াই ভোট অনুষ্ঠিত হোক।
অন্যদিকে কয়েকজন প্রার্থী বলেন, প্রচারণা ও প্রস্তুতিতে যে সময় ও অর্থ ব্যয় হয়েছে, তা আর ফেরত পাওয়া যাবে না। তবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়াটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তারা আশা প্রকাশ করেন, প্রশাসন এবার আর কোনো অজুহাতে নির্বাচন পিছিয়ে দেবে না।
শিক্ষা বিশ্লেষকরা বলছেন, জকসু নির্বাচন শুধু একটি ছাত্রসংসদ নির্বাচন নয়, এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক চর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ও মত প্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য নির্বাচন সময়মতো ও সুষ্ঠুভাবে আয়োজন করা জরুরি। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ দেখিয়েছে, শিক্ষার্থীরা তাদের অধিকার বিষয়ে এখন অনেক বেশি সচেতন ও সংগঠিত।
সব মিলিয়ে, ৬ জানুয়ারি জকসু ও হল সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার ঘোষণার মাধ্যমে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে আপাতত উত্তেজনার অবসান ঘটেছে। এখন সবার দৃষ্টি ওই দিনের দিকে, যেদিন শিক্ষার্থীরা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে প্রতিনিধি নির্বাচন করবেন।