মায়ের পক্ষ থেকে জাতির কাছে ক্ষমা চাইলেন তারেক রহমান

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৮০ বার
মায়ের পক্ষ থেকে জাতির কাছে ক্ষমা চাইলেন তারেক রহমান

প্রকাশ: ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের রাজনীতির এক দীর্ঘ, বর্ণিল ও ঘটনাবহুল অধ্যায়ের অবসান ঘটল সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালের মধ্য দিয়ে। তাঁর শেষ বিদায়ের ক্ষণটি শুধু একটি রাজনৈতিক দলের জন্য নয়, বরং সমগ্র জাতির জন্যই ছিল গভীর শোক, আবেগ ও স্মৃতিচারণে ভরপুর। সেই আবেগঘন মুহূর্তে মায়ের পক্ষ থেকে সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে যে বক্তব্য দিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, তা মুহূর্তেই দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়।

বুধবার ৩১ ডিসেম্বর বিকেলে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে, বেগম খালেদা জিয়ার জানাজার আগমুহূর্তে লাখো মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে তারেক রহমান নিজেকে পরিচয় করিয়ে দেন একজন সন্তান হিসেবে। তিনি বলেন, তিনি মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার বড় সন্তান। এই পরিচয় উচ্চারণের মধ্যেই ছিল গভীর দায়িত্ববোধ, শোক আর বিনয়ের প্রকাশ। রাজনীতির উত্তাপের বাইরে গিয়ে একজন সন্তান হিসেবে মায়ের দায়ভার নিজের কাঁধে তুলে নেওয়ার এই দৃশ্য অনেককেই আবেগাপ্লুত করে তোলে।

তারেক রহমান তার বক্তব্যে বলেন, বেগম খালেদা জিয়া জীবিত থাকা অবস্থায় যদি কারও কাছ থেকে কোনো ধরনের ঋণ নিয়ে থাকেন, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তার সঙ্গে যোগাযোগ করার আহ্বান জানান তিনি। তিনি আশ্বাস দেন, ইনশাআল্লাহ সেই ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা করা হবে। একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সন্তান হিসেবে নয়, বরং একজন দায়িত্বশীল উত্তরাধিকারী হিসেবে তার এই ঘোষণা অনেকের কাছে ব্যতিক্রমী ও মানবিক বলে প্রতীয়মান হয়।

এরপর আরও আবেগঘন কণ্ঠে তারেক রহমান বলেন, তার মা জীবিত থাকা অবস্থায় যদি তাঁর কোনো কথায়, আচরণে বা সিদ্ধান্তে কেউ কষ্ট পেয়ে থাকেন, তবে তিনি মায়ের পক্ষ থেকে সবার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছেন। এই ক্ষমা চাওয়ার মধ্যে কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য বা দলীয় অবস্থান ছিল না; ছিল নিখাদ মানবিকতা, বিনয় এবং আত্মসমালোচনার প্রকাশ। তিনি দেশবাসীর কাছে দোয়া চান, যেন আল্লাহ তায়ালা বেগম খালেদা জিয়াকে বেহেশত নসিব করেন।

এই বক্তব্যের সময় মানিক মিয়া অ্যাভিনিউজুড়ে নেমে আসে নীরবতা। লাখো মানুষের ভিড়ে তখন যেন সময় থমকে গিয়েছিল। অনেকের চোখে জল, অনেকের ঠোঁটে ফিসফিস করে দোয়া। রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতা সেদিন কিছু সময়ের জন্য হলেও আড়ালে চলে যায়, সামনে আসে একজন মায়ের বিদায় আর একজন সন্তানের দায়বদ্ধতা।

এরপর বিকেল ৩টা ৩ মিনিটে শুরু হয় বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা। মাত্র দুই মিনিটের মধ্যেই, ৩টা ৫ মিনিটে জানাজার নামাজ সম্পন্ন হয়। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি আবদুল মালেক জানাজায় ইমামতি করেন। জানাজায় অংশ নেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা। উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ, বিদেশি কূটনীতিক, বিশিষ্ট নাগরিক এবং সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ।

মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ সেদিন পরিণত হয়েছিল এক বিশাল শোকসভায়। কঠোর নিরাপত্তার মধ্যেও মানুষের ঢল থামেনি। রাজনৈতিক নেতা হিসেবে নয়, বরং একজন সাবেক রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে খালেদা জিয়ার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিলেন নানা মত ও পথের মানুষ। জানাজা শেষে যখন মরদেহবাহী গাড়িটি দাফনের উদ্দেশে রওনা হয়, তখনও রাস্তার দুপাশে দাঁড়িয়ে থাকা হাজারো মানুষ দুই হাত তুলে মোনাজাত করতে থাকেন। অনেকের চোখে তখনও অশ্রু, কারও মুখে নিঃশব্দ আহাজার।

বাংলাদেশের বড় দুশ্চিন্তা ব্যাটিং

বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু শুধু একটি ব্যক্তির প্রস্থান নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনীতির একটি যুগের সমাপ্তি। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ছিলেন দেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। সামরিক শাসন-পরবর্তী গণতান্ত্রিক উত্তরণের সময় থেকে শুরু করে পরবর্তী রাজনৈতিক সংঘাত, আন্দোলন ও নির্বাচনের ইতিহাসে তাঁর ভূমিকা ছিল কেন্দ্রীয়। সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন আপসহীন নেত্রী, আর সমালোচকদের কাছে বিতর্কিত হলেও অস্বীকার করার উপায় নেই যে তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী।

গত ২৩ নভেম্বর থেকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন খালেদা জিয়া। দীর্ঘদিন ধরে নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। অবস্থার অবনতি হলে তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, শেষ কয়েকদিন তিনি ছিলেন সংকটাপন্ন অবস্থায়। অবশেষে মঙ্গলবার ৩০ ডিসেম্বর ভোর ৬টায় চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।

তারেক রহমানের বক্তব্য ও জানাজার এই দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কেউ কেউ এটিকে দেখছেন রাজনৈতিক শিষ্টাচারের এক বিরল উদাহরণ হিসেবে, আবার কেউ কেউ দেখছেন একজন সন্তানের মানবিক দায়বদ্ধতার প্রকাশ হিসেবে। সমর্থকরা বলছেন, এই বক্তব্যের মাধ্যমে তারেক রহমান তার রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরেও একজন দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করেছেন।

এই জানাজার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির এক দীর্ঘ অধ্যায়ের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি হলেও, খালেদা জিয়ার প্রভাব, তাঁর নাম এবং তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে আলোচনা চলবে আরও বহুদিন। তাঁর জীবনের নানা অধ্যায় যেমন সমর্থকদের গর্বের স্মৃতি হয়ে থাকবে, তেমনি বিতর্ক ও সমালোচনাও ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে। তবে মৃত্যুর মুহূর্তে এসে, মায়ের পক্ষ থেকে সন্তানের ক্ষমা প্রার্থনার দৃশ্যটি হয়তো ইতিহাসে আলাদা এক মানবিক অধ্যায় হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যেখানে ভাষা প্রায়ই তীক্ষ্ণ ও বিভাজনমূলক, সেখানে এই বক্তব্য অনেকের কাছে এক ধরনের নীরব বার্তা বহন করে—ক্ষমা, বিনয় ও মানবিকতার গুরুত্বের কথা। শোকের এই দিনে, রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষ যেন এক মুহূর্তের জন্য হলেও এক কাতারে দাঁড়িয়েছিল।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত