মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে ৪৪ বছর পর ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৭১ বার
মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি

প্রকাশ: ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ আবারও সাক্ষী থাকল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক আবেগঘন, স্মরণীয় ও তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়ের। দীর্ঘ ৪৪ বছরের ব্যবধানে একই স্থানে লাখো মানুষের ঢল, একই শোকের ভার, একই রাষ্ট্রীয় গুরুত্ব—কেবল পরিবর্তন হয়েছে সময় আর প্রজন্ম। ১৯৮১ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জানাজায় যেমন এই রাজপথ কানায় কানায় পূর্ণ হয়েছিল, তেমনি ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর বুধবার এই মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতেই শেষ বিদায় জানানো হলো তার সহধর্মিণী, বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে। ইতিহাস যেন নিজেকে আবারও ফিরে দেখাল, পুনরাবৃত্তির ভাষায়।

সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা ও মানিক মিয়া অ্যাভিনিউজুড়ে এদিন ছিল শোক আর আবেগের মিলনমেলা। লাখো মানুষের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হয় খালেদা জিয়ার নামাজে জানাজা। রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক জীবনের নানা বিতর্ক, টানাপোড়েন ও সংগ্রামের ঊর্ধ্বে উঠে সাধারণ মানুষ, দলীয় নেতাকর্মী, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, কূটনীতিক ও বিশিষ্টজনেরা এক কাতারে দাঁড়িয়ে তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানান। রাজধানীর আকাশ যেন ভারী হয়ে উঠেছিল মানুষের দীর্ঘশ্বাস আর চোখের জলে।

বিকেল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ঢল আরও বাড়তে থাকে। সকাল থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষ অবস্থান নেন মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে। অনেকের হাতে ছিল দলীয় পতাকা, অনেকের হাতে খালেদা জিয়া ও শহীদ জিয়াউর রহমানের ছবি, আবার অনেকেই নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে ছিলেন শুধুই শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা নিয়ে। এই দৃশ্য অনেকের মনে ফিরিয়ে এনেছে ১৯৮১ সালের ২ জুনের সেই দিনটির কথা, যখন একই জায়গায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় জানাজা হয়েছিল শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের।

জানাজার আগমুহূর্তে আবেগাপ্লুত বক্তব্য দেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান। তিনি নিজেকে পরিচয় করিয়ে বলেন, তিনি মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার বড় সন্তান। লাখো মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি মায়ের পক্ষ থেকে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তারেক রহমান বলেন, বেগম খালেদা জিয়া জীবিত থাকা অবস্থায় যদি কারও মনে কষ্ট দিয়ে থাকেন, কোনো কথায় বা আচরণে কেউ আঘাত পেয়ে থাকেন, তবে তিনি মায়ের পক্ষ থেকে ক্ষমা চান। একই সঙ্গে তিনি বলেন, যদি কেউ তার মায়ের কাছ থেকে কোনো ঋণ পেয়ে থাকেন, তবে যেন তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন, তিনি ইনশাআল্লাহ তা পরিশোধের ব্যবস্থা করবেন। এই বক্তব্য মুহূর্তেই আবেগের স্রোত বইয়ে দেয় জানাজাস্থলে উপস্থিত মানুষের মধ্যে।

তারেক রহমানের কণ্ঠে শোক, দায়বদ্ধতা ও নৈতিকতার এই উচ্চারণ অনেকের চোখে পানি এনে দেয়। রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের পাশাপাশি একজন সন্তানের দায়িত্ববোধ ও মানবিকতা যেন স্পষ্ট হয়ে ওঠে তার কথায়। জানাজার আগে এই বক্তব্য পুরো আয়োজনকে আরও গভীর মানবিক মাত্রা দেয়।

খালেদা জিয়ার জীবনের সঙ্গে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের সম্পর্ক গভীরভাবে জড়িয়ে আছে ইতিহাসের পাতায়। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সেনাবাহিনীর একদল অফিসারের ব্যর্থ অভ্যুত্থানে শহীদ হন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। সে সময় খালেদা জিয়া ছিলেন দেশের ফার্স্ট লেডি। স্বামীর মৃত্যুর পরদিন, ২ জুন, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতেই রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় অনুষ্ঠিত হয় তার জানাজা এবং সংসদ ভবনের উত্তর পাশে তাকে দাফন করা হয়। সেই শোকাবহ দিনে যেমন ঢাকার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় নেমে এসেছিল, তেমনি চার দশকেরও বেশি সময় পর আজ আবার সেই একই আবেগে মানুষ ছুটে এসেছে এই রাজপথে।

স্বামীকে হারানোর পর খালেদা জিয়ার জীবনে শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়। কোনো প্রাথমিক রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা না থাকলেও তিনি বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই দলকে সংগঠিত করে নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতায় পৌঁছে দেন। নিজের প্রজ্ঞা, দৃঢ়তা ও রাজনৈতিক বিচক্ষণতায় তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেন। একই সঙ্গে তিনি বেনজির ভুট্টোর পর মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পরিচিতি পান।

একসময় সংসারের গৃহবধূ, দুই সন্তান তারেক রহমান ও আরাফাত রহমানকে নিয়ে সাধারণ জীবনযাপন করা সেই নারীই হয়ে ওঠেন দেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তার শাসনামলে যেমন ছিল প্রশংসা, তেমনি ছিল সমালোচনা ও বিতর্ক। তবুও তার নেতৃত্ব, সংগ্রাম ও দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অনন্য অধ্যায় হয়ে থাকবে।

২০২৫ সালের এই দিনে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে খালেদা জিয়ার জানাজা যেন সেই ইতিহাসেরই ধারাবাহিকতা। স্বামী ও স্ত্রীর জানাজা, একই স্থান, দুই ভিন্ন সময়—কিন্তু মানুষের আবেগ ও উপস্থিতির ভাষা প্রায় অভিন্ন। অনেক প্রবীণ মানুষ জানাজায় দাঁড়িয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন ১৯৮১ সালের কথা, আবার তরুণ প্রজন্ম ইতিহাসের বইয়ে পড়া সেই ঘটনার সঙ্গে আজকের দৃশ্য মিলিয়ে দেখেছেন বাস্তবে।

জানাজা শেষে খালেদা জিয়ার মরদেহ সংসদ ভবনের পেছনে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে দাফনের জন্য নেওয়া হয়। গাড়িবহর যখন ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখনও রাস্তার দুপাশে দাঁড়িয়ে থাকা হাজারো মানুষ দুই হাত তুলে মোনাজাত করেন। কান্না, নীরবতা আর প্রার্থনার মধ্য দিয়ে শেষ বিদায় জানানো হয় একজন যুগান্তকারী নেত্রীকে।

মঙ্গলবার সকাল ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন বেগম খালেদা জিয়া। দীর্ঘদিন ধরে তিনি গুরুতর অসুস্থতায় ভুগছিলেন। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি বিশেষ অধ্যায়ের অবসান ঘটেছে। তবে তার রেখে যাওয়া রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, সংগ্রাম ও স্মৃতি বহুদিন ধরে আলোচনায় থাকবে।

মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে অনুষ্ঠিত এই জানাজা কেবল একটি বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক প্রতীকী মুহূর্ত। ৪৪ বছর আগে যে স্থানে একটি অধ্যায় শেষ হয়েছিল, আজ সেই একই স্থানে আরেকটি অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটল। সময় বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে, কিন্তু ইতিহাসের আবর্তনে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ আবারও হয়ে উঠল জাতির আবেগের কেন্দ্রবিন্দু।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com