প্রকাশ: ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানী ঢাকায় ভোরের নীরবতা ভেঙে বুধবার ঘটেছে দুটি হৃদয়বিদারক সড়ক দুর্ঘটনা। তেজগাঁওয়ের সাতরাস্তা ও মহাখালী এলাকায় পৃথক ঘটনায় বাবা-মেয়েসহ তিনজন প্রাণ হারিয়েছেন। অল্প সময়ের ব্যবধানে ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনাগুলো আবারও রাজধানীর সড়ক নিরাপত্তা, ভারী যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ এবং পথচারী ও সাধারণ যাত্রীদের জীবনের ঝুঁকির বিষয়টি সামনে এনে দিয়েছে। বিশেষ করে সাতরাস্তার ঘটনায় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এক বাবা ও তার কিশোরী মেয়ের মৃত্যু নগরজীবনের নির্মম বাস্তবতাকে নতুন করে নাড়া দিয়েছে।
পুলিশ ও হাসপাতাল সূত্র জানায়, বুধবার ভোর আনুমানিক পাঁচটার দিকে গুরুতর আহত অবস্থায় চারজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক বাবা রফিকুল ইসলাম (৪০), তার মেয়ে তানজিলা (১২) এবং মহাখালী এলাকায় দুর্ঘটনায় আহত অজ্ঞাত এক যুবককে মৃত ঘোষণা করেন। রফিকুল ইসলামের ছেলে নুর ইসলাম (১৪) প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতাল ত্যাগ করে। ভোরের আলো ফোটার আগেই ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনাগুলোতে মুহূর্তেই বদলে যায় কয়েকটি পরিবারের ভাগ্য।
তেজগাঁওয়ের সাতরাস্তা এলাকায় ট্রাকচাপায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার যাত্রী ছিলেন রফিকুল ইসলাম ও তাঁর দুই সন্তান। পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, রাতে গ্রামের বাড়ি যাওয়ার উদ্দেশে তাঁরা মগবাজার ওয়্যারলেস রেলগেট এলাকা থেকে রওনা হন। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় করে মহাখালী বাসস্ট্যান্ডের দিকে যাচ্ছিলেন তাঁরা। ভোরের দিকে সাতরাস্তা এলাকায় পৌঁছালে একটি দ্রুতগতির ট্রাক অটোরিকশাটিকে চাপা দিয়ে পালিয়ে যায়। প্রচণ্ড আঘাতে অটোরিকশাটি দুমড়ে-মুচড়ে যায় এবং তিনজনই রাস্তায় ছিটকে পড়েন।
পথচারীরা দ্রুত এগিয়ে এসে আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠান। কিন্তু ততক্ষণে বাবা ও মেয়ের অবস্থা ছিল সংকটাপন্ন। চিকিৎসকেরা জানান, হাসপাতালে আনার আগেই তাঁদের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আহত নুর ইসলাম প্রাণে বেঁচে গেলেও মানসিকভাবে সে ভেঙে পড়েছে বলে স্বজনরা জানান। চোখের সামনে বাবার ও বোনের মৃত্যু—এই দৃশ্য তাকে আজীবন তাড়া করবে বলেই আশঙ্কা পরিবারের।
নিহত রফিকুল ইসলামের ভাতিজা আব্দুর রাকিব জানান, তাঁদের গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনা জেলার পূর্বধলা উপজেলার জটিয়াবো গ্রামে। জীবিকার তাগিদে পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরে ঢাকার মগবাজার ওয়্যারলেস রেলগেট এলাকায় বসবাস করছিল। রফিকুল ইসলাম দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ছিলেন এবং ওই এলাকায় ভিক্ষাবৃত্তি করেই সংসার চালাতেন। তাঁর দুই সন্তান স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করত। তানজিলা ছিল পরিবারের আশার আলো—ছোট হলেও পড়াশোনায় মনোযোগী ছিল বলে জানান স্বজনরা। হঠাৎ এমন মৃত্যুর খবরে পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
আব্দুর রাকিব আরও বলেন, রাতের বেলা গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল খরচ বাঁচানোর জন্য। কিন্তু সেই যাত্রাই যে শেষ যাত্রা হয়ে যাবে, তা কেউ কল্পনাও করেনি। তিনি অভিযোগ করেন, দুর্ঘটনার পর ট্রাকটি থামেনি, চালক দ্রুত পালিয়ে গেছে। এখনো ট্রাকটির কোনো সন্ধান মেলেনি। স্বজনদের দাবি, দ্রুত ট্রাকটি শনাক্ত করে চালকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
অন্যদিকে মহাখালী বাসস্ট্যান্ড এলাকায় একই ভোরে ঘটে আরেকটি দুর্ঘটনা। অজ্ঞাত যানবাহনের ধাক্কায় আনুমানিক ৩৫ বছর বয়সী এক ব্যক্তি গুরুতর আহত হন। তাঁকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। নিহত ব্যক্তির নাম-পরিচয় এখনো শনাক্ত করা যায়নি। পুলিশ জানিয়েছে, তাঁর পরনে থাকা পোশাক ও অন্যান্য আলামত দেখে পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে। লাশ ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে।
তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আব্দুল হামিদ জানান, বুধবার ভোরে পৃথক দুটি সড়ক দুর্ঘটনায় তিনজন নিহত হয়েছেন। সাতরাস্তা এলাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে একটি ট্রাক চাপা দেয়, এতে বাবা ও মেয়ে মারা যান এবং ছেলে আহত হয়। ট্রাকটি শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। মহাখালী বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অজ্ঞাত যানবাহনের ধাক্কায় এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। উভয় ঘটনায় আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং যানবাহন শনাক্তে তদন্ত জোরদার করা হয়েছে।
ঢাকার ব্যস্ত সড়কগুলোতে ভোরের সময় ভারী যানবাহনের বেপরোয়া চলাচল নতুন নয়। অনেক চালক এই সময় কম যানজটের সুযোগে দ্রুতগতিতে গাড়ি চালান, যা প্রায়ই প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার কারণ হয়। বিশেষ করে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও হালকা যানবাহনের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। ট্রাফিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাত ও ভোরে ভারী যানবাহনের চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ না করলে এমন দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব নয়।
মানবাধিকারকর্মীরা মনে করছেন, এই ধরনের দুর্ঘটনার পেছনে দায় শুধু চালকের নয়, ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতাও বড় কারণ। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী রফিকুল ইসলামের মতো মানুষদের জন্য নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থা না থাকা এক ধরনের সামাজিক ব্যর্থতা। তাঁর সন্তানদের নিয়ে নিরাপদে বাড়ি পৌঁছানোর স্বপ্ন সড়কে ভেঙে পড়েছে, যা নগর ব্যবস্থাপনার কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ঘটনাটি নিয়ে শোক ও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন অনেকেই। অনেকে লিখছেন, রাজধানীর সড়কে দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েন। আবার কেউ কেউ দাবি করছেন, হিট অ্যান্ড রান মামলায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় চালকদের মধ্যে ভয় কাজ করে না। ফলে দুর্ঘটনার পর পালিয়ে যাওয়ার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্র জানায়, নিহতদের লাশ ময়নাতদন্ত শেষে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে। আহত নুর ইসলামের মানসিক সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে বলে চিকিৎসকেরা মত দিয়েছেন। পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর জন্য স্থানীয়দের উদ্যোগের কথাও জানা গেছে।
রাজধানীর সড়কে আবারও ঝরে গেল তিনটি প্রাণ। বাবা-মেয়ের এই করুণ মৃত্যু ও অজ্ঞাত যুবকের প্রাণহানি শুধু একটি দিনের খবর নয়, বরং সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত দায় স্মরণ করিয়ে দেয়। তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের শনাক্ত ও বিচারের আওতায় আনা গেলে হয়তো এমন দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব হবে—এমনটাই প্রত্যাশা নগরবাসীর।