তিন বাহিনীর গার্ড অব অনারে খালেদা জিয়ার রাষ্ট্রীয় দাফন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৯৩ বার
তিন বাহিনীর গার্ড অব অনারে খালেদা জিয়ার রাষ্ট্রীয় দাফন

প্রকাশ: ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটেছে। রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও গভীর শ্রদ্ধার মধ্য দিয়ে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। বুধবার বিকেলে রাজধানীর জিয়া উদ্যানে তিন বাহিনীর গার্ড অব অনার প্রদানের মাধ্যমে জাতি তাঁকে শেষ বিদায় জানায়। পরে তাঁর স্বামী, মুক্তিযুদ্ধের ঘোষক ও সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়। এই দাফনের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনীতিতে এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে।

বুধবার বিকেল সোয়া ৪টার দিকে জিয়া উদ্যানে সশস্ত্র বাহিনীর একটি সুসজ্জিত দল খালেদা জিয়াকে গার্ড অব অনার প্রদান করে। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর প্রতিনিধিরা রাষ্ট্রীয় প্রটোকল অনুযায়ী সম্মান প্রদর্শন করেন। জাতীয় পতাকায় মোড়ানো মরদেহের সামনে বিউগলের করুণ সুর, অস্ত্র উঁচিয়ে সালাম এবং নীরবতার মুহূর্তে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন উপস্থিত হাজারো মানুষ। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় এই গার্ড অব অনার ছিল দেশের একজন নির্বাচিত সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রতি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শনের প্রতীক।

এর আগে বিকেল ৩টার দিকে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে অনুষ্ঠিত হয় খালেদা জিয়ার জানাজা। মসজিদের খতিব আবদুল মালেকের ইমামতিতে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় অংশ নেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস, সরকারের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্যরা এবং তিন বাহিনীর প্রধান। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের এই উপস্থিতি প্রমাণ করে যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য অতিক্রম করে খালেদা জিয়া ছিলেন রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব।

জানাজার প্রথম সারিতে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির শীর্ষ নেতারা। একই সারিতে দাঁড়িয়ে জানাজা আদায় করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের এক কাতারে উপস্থিতি ছিল বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক বিরল দৃশ্য, যা প্রয়াত নেত্রীর প্রতি সর্বজনীন শ্রদ্ধা ও রাজনৈতিক সৌজন্যের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

খালেদা জিয়ার জানাজায় আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকেও ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। ৩২টি দেশের রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিকরা জানাজায় অংশ নেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, পাকিস্তান পার্লামেন্টের স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিক এবং ভুটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিয়নপো ডি এন ধুংগেলের উপস্থিতি। তাঁরা জানাজায় অংশ নিতে সকালেই ঢাকায় পৌঁছান। তাঁদের উপস্থিতি খালেদা জিয়ার আন্তর্জাতিক পরিচিতি ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকার গুরুত্বকে তুলে ধরে।

নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় জানাজার দিন সংসদ ভবনের উত্তর প্লাজা ও আশপাশের এলাকায় কড়া নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। অনুমোদন ছাড়া কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পুরো এলাকা ঘিরে রাখে, যাতে রাষ্ট্রীয় আয়োজনে কোনো ধরনের বিঘ্ন না ঘটে। বিপুলসংখ্যক মানুষ শৃঙ্খলার সঙ্গে জানাজা ও দাফন অনুষ্ঠান প্রত্যক্ষ করেন।

খালেদা জিয়া মঙ্গলবার ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি নানা জটিল রোগে ভুগছিলেন। তাঁর মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। বিএনপির নেতাকর্মী ছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ মানুষ গভীর শোক প্রকাশ করেন।

খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক ব্যতিক্রমী নাম। ১৯৯১ সালে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পর তিনি প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন। পরে আরও দুইবার দেশের সর্বোচ্চ নির্বাহী দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর শাসনামল ছিল সাফল্য ও বিতর্কে ভরা। কখনো তিনি প্রশংসিত হয়েছেন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া জোরদারের জন্য, আবার কখনো সমালোচিত হয়েছেন রাজনৈতিক সংঘাত ও অস্থিরতার জন্য। তবে সমর্থক ও সমালোচক—উভয় পক্ষই স্বীকার করেন, তিনি ছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতির এক প্রভাবশালী ও দৃঢ়চেতা নেত্রী।

একজন নারী হিসেবে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে তাঁর উত্থান ছিল বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বিএনপির নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং দলকে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করেছেন। রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, কারাবাস ও অসুস্থতার মধ্যেও তিনি দলের নেতৃত্বে থেকেছেন, যা তাঁর দৃঢ় মানসিকতার পরিচয় বহন করে।

দাফনের সময় জিয়া উদ্যানে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। অনেকেই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। বিএনপির নেতাকর্মীরা নীরবে দাঁড়িয়ে প্রিয় নেত্রীর কফিন শেষবারের মতো দেখেন। সাধারণ মানুষও দূর থেকে শ্রদ্ধা জানান। শহীদ জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে খালেদা জিয়ার চিরনিদ্রা যেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের দুই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে একই স্থানে মিলিয়ে দিল।

এই রাষ্ট্রীয় দাফন শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিদায় নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক যুগের সমাপ্তির প্রতীক। তাঁর জীবনের সাফল্য, ব্যর্থতা, সংগ্রাম ও বিতর্ক ভবিষ্যতেও আলোচনার বিষয় হয়ে থাকবে। তবে তাঁর মৃত্যুর দিনে রাজনৈতিক বিভাজন ছাপিয়ে যে জাতীয় ঐক্যের দৃশ্য দেখা গেছে, তা ইতিহাসে আলাদা গুরুত্ব পাবে।

রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফনের মধ্য দিয়ে বেগম খালেদা জিয়া চলে গেলেও তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, প্রভাব এবং বিতর্ক বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন আলোচিত থাকবে। ইতিহাসের পাতায় তিনি থাকবেন এক শক্তিশালী, সংগ্রামী ও প্রভাবশালী নেত্রী হিসেবে—যিনি সমর্থক ও সমালোচক উভয়ের কাছেই অনিবার্য এক নাম।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত