তারেক রহমানকে বুকে টেনে সান্ত্বনা দিলেন প্রধান উপদেষ্টা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৮৩ বার
তারেক রহমানকে বুকে টেনে সান্ত্বনা দিলেন প্রধান উপদেষ্টা

প্রকাশ: ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বেদনাবিধুর অধ্যায় বুধবার সমাপ্ত হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বিএনপির চেয়ারপারসন ও গণতন্ত্রের আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দাফন সম্পন্ন হয়েছে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায়। বিকেল ৫টার দিকে রাজধানীর জিয়া উদ্যানে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পাশে তাঁকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। এর আগে বেলা ৩টায় রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউতে অনুষ্ঠিত হয় তাঁর জানাজা। এই জানাজা শুধু একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং তা পরিণত হয় ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ জনসমাগমে, যেখানে শোক, শ্রদ্ধা ও আবেগ একাকার হয়ে যায়।

মানিক মিয়া এভিনিউ ঘিরে বুধবার দুপুর থেকেই মানুষের ঢল নামে। সংসদ ভবন এলাকা ছাড়িয়ে কয়েক কিলোমিটার জুড়ে মানুষের উপস্থিতি যেন এক বিশাল মানবসমুদ্রে রূপ নেয়। রাজধানীর প্রধান সড়ক, আশপাশের অলিগলি, ফুটপাত—সবখানেই মানুষের অবস্থান দেখা যায়। অনেকেই সকাল থেকেই অপেক্ষায় ছিলেন প্রিয় নেত্রীকে শেষ বিদায় জানানোর জন্য। বয়স, শ্রেণি বা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভেদাভেদ ভুলে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিশিষ্ট নাগরিকরা জানাজায় অংশ নেন।

এই স্মরণকালের বৃহৎ জানাজায় উপস্থিত ছিলেন দেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব। জানাজার সম্মুখসারিতে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তাঁর পাশে ছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা, তিন বাহিনীর প্রধান এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ। জানাজার সময় এক আবেগঘন মুহূর্তের সৃষ্টি হয়, যখন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস শোকাহত তারেক রহমানকে বুকে টেনে নিয়ে সান্ত্বনা দেন। এই দৃশ্য মুহূর্তেই উপস্থিত হাজারো মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে মানবিক সহমর্মিতার এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে আলোচিত হয়।

সম্মুখসারিতে আরও উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ও সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ, মির্জা আব্বাস, ড. আবদুল মঈন খানসহ দলের শীর্ষ নেতারা। একই কাতারে বিভিন্ন মত ও পথের রাজনৈতিক নেতাদের উপস্থিতি জানাজাকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে।

জানাজায় ইমামতি করেন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি আবদুল মালেক। তাঁর কণ্ঠে দোয়া ও মোনাজাতের প্রতিটি শব্দে শোকের গভীরতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নামাজ শেষে দেশ ও জাতির জন্য, প্রয়াত নেত্রীর রুহের মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। উপস্থিত মানুষের অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন, কেউ কেউ নীরবে চোখের পানি মুছতে থাকেন।

মানিক মিয়া এভিনিউতে জায়গার সংকুলান না হওয়ায় আশপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে মানুষ নামাজে অংশ নেন। অনেককে দেখা যায় মেট্রোরেল স্টেশন, আশপাশের ভবনের ছাদ ও বারান্দা থেকে জানাজায় শরিক হতে। রাজধানীতে এমন দৃশ্য খুব কমই দেখা গেছে, যেখানে একটি জানাজা পুরো এলাকা জুড়ে একযোগে পালিত হয়।

জানাজার আগে ও পরে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবকরা সমন্বিতভাবে কাজ করেন, যাতে বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতিতেও শৃঙ্খলা বজায় থাকে। যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো ঘিরে রাখা হয় বিশেষ নিরাপত্তায়। সার্বিক ব্যবস্থাপনায় কোনো বড় ধরনের বিশৃঙ্খলার খবর পাওয়া যায়নি।

জানাজা শেষে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার আগে খালেদা জিয়ার মরদেহ নেওয়া হয় জিয়া উদ্যানে। সেখানে তিন বাহিনীর একটি চৌকস দল তাঁকে গার্ড অব অনার প্রদান করে। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর পক্ষ থেকে রাষ্ট্রীয় সালাম প্রদানের মাধ্যমে জাতি তাঁর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানায়। এরপর শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়। স্বামী-স্ত্রীর পাশাপাশি শায়িত হওয়ার মধ্য দিয়ে যেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের দুই শক্তিশালী অধ্যায় একই বিন্দুতে মিলিত হলো।

বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি শুধু ক্ষমতার কেন্দ্রেই ছিলেন না, বরং রাজপথের আন্দোলন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রতীক হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি যেমন সমর্থকদের অকুণ্ঠ ভালোবাসা পেয়েছেন, তেমনি নানা বিতর্ক ও প্রতিকূলতার মুখোমুখিও হয়েছেন। তবে তাঁর মৃত্যুতে যে জাতীয় শোক ও সম্মিলিত শ্রদ্ধা প্রকাশ পেয়েছে, তা প্রমাণ করে তিনি ছিলেন সময়ের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

তারেক রহমানকে বুকে টেনে নেওয়ার দৃশ্যটি এদিনের সবচেয়ে আলোচিত ও মানবিক মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। রাজনৈতিক বাস্তবতায় যেখানে মতপার্থক্য ও বিভাজন প্রায়শই প্রধান হয়ে ওঠে, সেখানে প্রধান উপদেষ্টার এই সহমর্মিতা অনেকের কাছে নতুন বার্তার ইঙ্গিত দিয়েছে। শোকের মুহূর্তে মানবিকতা যে রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে আসতে পারে, সেই বার্তাই যেন স্পষ্ট হয়েছে এই ঘটনায়।

বেগম খালেদা জিয়ার দাফনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক যুগের অবসান ঘটলেও তাঁর প্রভাব, অবদান ও বিতর্ক আগামী দিনগুলোতেও আলোচনায় থাকবে। আর এই শোকসভা ও জানাজার দিনে যে মানবিক সংহতির দৃশ্য দেখা গেছে, তা হয়তো দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে জাতির ইতিহাসে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত