প্রকাশ: ০১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পুরোনো বছরের সব ক্লান্তি, শোক আর ব্যর্থতাকে পেছনে ফেলে নতুন আশা ও প্রত্যাশা নিয়ে বিশ্বজুড়ে বরণ করে নেওয়া হলো খ্রিষ্টীয় নতুন বছর ২০২৬। পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে, সময়ের ব্যবধান পেরিয়ে একে একে নতুন বছরে প্রবেশ করেছে বিভিন্ন দেশ। অন্ধকার রাত ভেদ করে আতশবাজির রঙিন আলোয় ঝলমলে হয়ে উঠেছে আকাশ, আনন্দ-উল্লাসে মুখরিত হয়েছে শহর, পর্যটনকেন্দ্র ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো। ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির ভিন্নতা সত্ত্বেও নতুন বছরের প্রথম প্রহরে মানুষের অনুভূতিতে ছিল একটাই মিল—নতুন শুরুর আশাবাদ।
বিশ্বে সবার আগে ২০২৬ সালে প্রবেশ করে প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপরাষ্ট্র কিরিবাতি। দেশটির কিরিটিমাতি দ্বীপে মধ্যরাত ঘড়ির কাঁটা ছোঁয়ার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় নববর্ষের উৎসব। সীমিত আয়োজন হলেও স্থানীয় মানুষ ও পর্যটকদের উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। এই দ্বীপ থেকেই কার্যত বিশ্বব্যাপী নতুন বছরের উদ্যাপনের যাত্রা শুরু হয়।
এরপর নতুন বছরে প্রবেশ করে নিউজিল্যান্ড। রাজধানী ওয়েলিংটন ও বন্দরনগরী অকল্যান্ডে হাজারো মানুষ জড়ো হন খোলা স্থানে। অকল্যান্ডের স্কাই টাওয়ার ঘিরে আতশবাজির আলোকচ্ছটা রাতের আকাশকে করে তোলে বর্ণিল। গান, নৃত্য ও কাউন্টডাউনের মধ্য দিয়ে মানুষ বিদায় জানায় ২০২৫-কে এবং স্বাগত জানায় ২০২৬-কে।
অস্ট্রেলিয়ায় নববর্ষ উদ্যাপন মানেই চোখ ধাঁধানো আয়োজন। সিডনিতে নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়া হয় বিশ্বের অন্যতম বড় আতশবাজি প্রদর্শনীর মাধ্যমে। সিডনি হারবার ব্রিজ ও অপেরা হাউসকে কেন্দ্র করে আয়োজন করা হয় আলোকসজ্জা ও আতশবাজির প্রদর্শনী। লাখো মানুষ সরাসরি এই আয়োজন উপভোগ করেন, আর কোটি কোটি মানুষ টেলিভিশন ও অনলাইনে তা দেখেন। রঙিন আলোয় ঝলমলে হয়ে ওঠা সিডনির আকাশ যেন নতুন বছরের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
এশিয়া মহাদেশে নববর্ষ উদ্যাপনে ছিল নানা রকম আয়োজন। থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে চাও ফ্রায়া নদীর তীর ঘেঁষে জড়ো হন হাজারো মানুষ। আধুনিক শহরের আকাশে একের পর এক আতশবাজির বিস্ফোরণে আলো-আঁধারির খেলায় মেতে ওঠে নগরবাসী। পর্যটকদের উপস্থিতিতে ব্যাংকক হয়ে ওঠে আন্তর্জাতিক উৎসব নগরী।
চীনেও নতুন বছর ২০২৬-কে স্বাগত জানানো হয়েছে নানা আয়োজনে। রাজধানী বেইজিংসহ বড় বড় শহরে মানুষ জড়ো হয়ে উদ্যাপন করেন বছরের প্রথম প্রহর। যদিও চীনা নববর্ষ আলাদা সময় ও ভিন্ন ক্যালেন্ডার অনুযায়ী পালিত হয়, তবুও খ্রিষ্টীয় নববর্ষ উপলক্ষে তরুণ প্রজন্ম ও পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে ছিল উৎসবের আমেজ। আলোকসজ্জা, সংগীতানুষ্ঠান ও আতশবাজিতে মুখরিত হয়ে ওঠে নগরের বিভিন্ন প্রান্ত।
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর সবচেয়ে বড় আয়োজন দেখা গেছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে। বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ভবন বুর্জ খলিফাকে কেন্দ্র করে আয়োজন করা হয় বিশাল আলোক ও আতশবাজির প্রদর্শনী। হাজারো মানুষ শহরের বিভিন্ন স্থানে জড়ো হয়ে এই দৃশ্য উপভোগ করেন। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে বুর্জ খলিফার গায়ে ফুটে ওঠে আলো ও অ্যানিমেশনের অনন্য প্রদর্শনী, যা নতুন বছরের বার্তাকে আরও জোরালো করে তোলে।
ইউরোপে নববর্ষ উদ্যাপন ছিল আনন্দ আর বাস্তবতার মিশেলে। যুদ্ধ ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও রাশিয়ার মানুষ নতুন আশায় নতুন বছরকে স্বাগত জানিয়েছেন। মস্কোসহ বড় শহরগুলোতে সীমিত পরিসরে আয়োজন হলেও মানুষের মধ্যে ছিল ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রত্যাশা। একইভাবে ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেনসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ঐতিহ্যবাহী নববর্ষ উদ্যাপন হয়েছে। প্যারিসে আইফেল টাওয়ারের আশপাশে, বার্লিনে ব্রান্ডেনবুর্গ গেটের কাছে এবং মাদ্রিদে শহরের কেন্দ্রস্থলে মানুষ জড়ো হয়ে কাউন্টডাউন করেন।
দক্ষিণ আমেরিকায় ব্রাজিলে নববর্ষ মানেই উৎসবের জোয়ার। রিও ডি জেনিরোর বিখ্যাত কোপাকাবানা সৈকতে লাখো মানুষ সাদা পোশাকে জড়ো হয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানান। আতশবাজির আলো, সঙ্গীত আর সমুদ্রের ঢেউ মিলিয়ে তৈরি হয় এক অনন্য আবহ। লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশেও নাচ, গান ও পারিবারিক মিলনমেলায় উদ্যাপিত হয় বছরের প্রথম রাত।
বিশ্বের নানা প্রান্তে নববর্ষ উদ্যাপনের ধরন ভিন্ন হলেও মানুষের অনুভূতিতে ছিল মিল। কোথাও ছিল জাঁকজমকপূর্ণ আতশবাজি, কোথাও শান্ত প্রার্থনা, কোথাও আবার পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর আয়োজন। করোনা পরবর্তী সময়, যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে অনেকেই নতুন বছরে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধের প্রত্যাশা করছেন।
নতুন বছরের এই বৈশ্বিক উদ্যাপন কেবল আনন্দের প্রকাশ নয়, বরং এটি মানুষের অদম্য আশাবাদের প্রতীক। সময়ের স্রোতে পুরোনো বছরের ব্যর্থতা ও কষ্ট পেছনে ফেলে মানুষ আবারও সামনে এগিয়ে যেতে চায়। ২০২৬ সালের প্রথম প্রহরে বিশ্বজুড়ে আতশবাজির আলোয় আলোকিত হওয়া আকাশ যেন সেই বার্তাই দেয়—আশা এখনো বেঁচে আছে, আর নতুন দিন মানেই নতুন সম্ভাবনা।